রিপোর্টার্স২৪ডেস্ক: দীর্ঘদিনের শাসক শেখ হাসিনাকে ছাত্রদের নেতৃত্বাধীন আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত করার পর নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করে আলোচনায় আসে তরুণদের নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি)। তবে রাস্তায় তাদের বিপুল জনসমর্থন এখনো ভোটে রূপ নিতে পারেনি।
দশকজুড়ে চলে আসা পরিবারতন্ত্র ও দুই দলের আধিপত্য ভাঙার অঙ্গীকার নিয়ে এগোতে থাকা এনসিপি সামনে পাচ্ছে বহু বছরের সংগঠন, বিস্তৃত নেটওয়ার্ক ও বিপুল সম্পদের মালিক বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীকে। আগামী ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে তাই সংগ্রাম বাড়ছে দলটির।
২৭ বছর বয়সী এনসিপি প্রধান নাহিদ ইসলাম বলেন, আমাদের সংগঠন এখনও দুর্বল, কারণ সময় পাইনি। তবুও চ্যালেঞ্জ নিচ্ছি। ঢাকার একটি ভবনের অফিসে দেয়ালজোড়া বিদ্রোহী ভাস্কর্যের সামনে বসে তিনি এসব কথা বলেন।
জরিপে তৃতীয় স্থানে এনসিপি
সব ৩০০ আসনেই প্রার্থী দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে এনসিপির। তবে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের সাম্প্রতিক জরিপে দলটির জনসমর্থন মাত্র ৬ শতাংশ, যেখানে বিএনপি রয়েছে ৩০ শতাংশ নিয়ে শীর্ষে। ২৬ শতাংশ সমর্থন নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে জামায়াতে ইসলামী।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে একটিও আসন না পাওয়া হতাশার বড় উদাহরণ। আন্দোলনের অন্যতম মুখ প্রাপ্তি তপশী বলেন, শুরুতে তাদের মধ্যে আশার আলো দেখেছিলাম। কিন্তু নারীর অধিকার, সংখ্যালঘু সুরক্ষার মতো ইস্যুতে তারা স্পষ্ট অবস্থান দেখাতে পারেনি।
এদিকে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিতে না পারলে অস্থিরতা সৃষ্টি হবে বলে হুমকি দিয়ে আসছে যা বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
জোট ভাবনায় এনসিপি
দুর্বল সংগঠন, অর্থসংকট এবং গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে অস্পষ্টতার কারণে এনসিপি বিএনপি ও জামায়াতের সঙ্গে জোট আলোচনা চালাচ্ছে বলে জানিয়েছে দলীয় সূত্র। দলের এক সিনিয়র নেতা বলেন, স্বতন্ত্রভাবে দাঁড়ালে একটিও আসন না পাওয়ার ঝুঁকি আছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, জোটে গেলে ‘বিপ্লবী’ ইমেজ নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা আছে।
অন্যদিকে ছাত্রবিদ্রোহের সময় একত্র হওয়া তরুণরা পরে আবার নিজ নিজ রাজনৈতিক গোষ্ঠীতে ফিরে যায়। ফলে এনসিপি সংগঠন গঠনে পিছিয়ে পড়ে।
অর্থসংকট ও নেতৃত্বের চ্যালেঞ্জ
দলের খরচ চলে সদস্যদের চাকরির বেতন, ছোট অনুদান ও ক্রাউডফান্ডিংয়ে। ভোটের মাঠে সমর্থন বাড়াতে কেউ কেউ বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচারণা করছেন। পূর্বাঞ্চলের একটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রস্তুতি নেওয়া হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, মানুষকে বলেছি, আমি গরিব। নেতা মানে টাকা দেওয়া নয়—সরকারি অর্থ ঠিকভাবে ব্যবহারের নিশ্চয়তা দেওয়াই কাজ।
তবে কিছু নেতার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ দলটির ভাবমূর্তিতে আঘাত হেনেছে; যদিও এনসিপি অভিযোগ অস্বীকার করে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বজায় রাখার কথা বলছে।
‘নতুন কিছু’ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি
তবুও অনেক তরুণ এনসিপিকে বিকল্প শক্তি হিসেবে দেখছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী মানজিলা রহমান বলেন, ওরা তরুণ, আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছে। আশা করি পরিবর্তন আনতে পারবে যদি নিজেরাই কর্তৃত্ববাদী হয়ে না ওঠে।
সাংসদ নির্বাচনে সাধারণ নাগরিকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে দলটি নভেম্বর মাসে দেশজুড়ে দুই দিন ধরে ১,০০০–এরও বেশি প্রার্থীর সাক্ষাৎকার নেয়। রিকশাচালক থেকে শুরু করে প্রতিবাদে চোখে গুলিবিদ্ধ ২৩ বছরের শিক্ষার্থী সবাই চেষ্টা করেন অংশ নেওয়ার।
এনসিপি নেতা মোহাম্মদ সুজন খান বলেন, একজন রিকশাচালকের সংসদে দেওয়ার কিছু নেই এমনটা অনেকে ভাবতে পারে। কিন্তু সুযোগ দিলে দেশের জন্য কী করতে পারি, সেটাই দেখাতে চাই।
ক্যামব্রিজে সফল ক্যারিয়ার ছেড়ে এনসিপিতে যোগ দেওয়া ডাক্তার তাসনিম জারা বলেন, আমরা রাজনীতি মানুষের কাছে ফিরিয়ে দিতে চাই, ক্ষমতাকে আর কজন প্রভাবশালী পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চাই না।
বিএনপি নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও বলেন, আগামী দিনে তরুণরাই রাজনীতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। তাই আমরা তাদের সংসদে দেখতে চাই।
এনসিপি নেতারা বলছেন, তারা শুধু আসন্ন নির্বাচন নয় দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের পথে এগোতে চান। দলের ভাষায়, জিতি বা হারি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেই আমরা রাজনীতিতে নতুন কিছু নিয়ে আসছি।
রিপোর্টার্স২৪/এসসি