| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

বন রক্ষায় ধোঁয়াশা: ২০৩০ লক্ষ্য অর্জনে স্পষ্ট পথ দেখাতে ব্যর্থ ‘কপ৩০’

reporter
  • আপডেট টাইম: ডিসেম্বর ০৫, ২০২৫ ইং | ১৬:৫৪:২৯:অপরাহ্ন  |  ১০৮৭০৭০ বার পঠিত
বন রক্ষায় ধোঁয়াশা: ২০৩০ লক্ষ্য অর্জনে স্পষ্ট পথ দেখাতে ব্যর্থ ‘কপ৩০’
ছবির ক্যাপশন: আশিস গুপ্ত

আশিস গুপ্ত


ব্রাজিলের বেলেমে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন ‘কপ৩০’ শেষ হয়েছে কোনো আনুষ্ঠানিক বন–চুক্তি ছাড়াই। সম্মেলনটিকে অনেকেই ‘বন কপ’ বলে উল্লেখ করছিলেন, যার ফলে চূড়ান্তভাবে কোনো বন–সংক্রান্ত চুক্তি না হওয়াকে বড় ধরনের ব্যর্থতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বন ও ভূমি ব্যবহারের আলোচনাগুলো এবারের সম্মেলনে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি গুরুত্ব পেলেও ফলাফলহীন পরিসমাপ্তি খুব অপ্রত্যাশিত নয়। কারণ শুরু থেকেই বন–সংক্রান্ত চুক্তি বা সরকারি জলবায়ু অর্থায়নে দেশগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি, যদিও উন্নত ও উন্নয়নশীল উভয় ধরনের দেশই এ বিষয়ে সক্রিয় ছিল।

কপ৩০-এর চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে ন্যায্য রূপান্তরের জন্য ‘বেলেম অ্যাকশন মেকানিজম’ এবং অভিযোজন অর্থায়ন সংক্রান্ত কিছু সিদ্ধান্ত যুক্ত হয়েছে। তবে এগুলোকে বৈশ্বিক তাপমাত্রা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমিত রাখা বা জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ থেকে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে খুবই সীমিত অগ্রগতি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। কার্বন নিঃসরণ প্রশমন কর্মসূচির ফলাফল বন–সংক্রান্ত কিছু প্রতিফলন দিয়েছে এবং ‘জাস্ট ট্রানজিশন’-এর আলোচনায় কৃষকদের গুরুত্বও স্বীকৃতি পেয়েছে। কিন্তু ২০৩০ সালের মধ্যে কীভাবে বন উজাড় ও বনের ক্ষয় বন্ধ হবে, তা নিয়ে কোনো নির্দিষ্ট পরিকল্পনা বা পদক্ষেপ ঘোষণা করা হয়নি।

সম্মেলনের প্রেসিডেন্সির প্রস্তাবিত ‘রোডম্যাপ ইনিশিয়েটিভ’কে আলোচনার বাইরে একটি বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও এটি ভবিষ্যতে কীভাবে কাজ করবে তা স্পষ্ট নয় এবং এটি ইউএনএফসিসিসি প্রক্রিয়ায় আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতিও পায়নি।

বন–সংক্রান্ত আলোচনায় সবচেয়ে বড় ঘোষণা ছিল ‘ট্রপিক্যাল ফরেস্ট ফরএভার ফ্যাসিলিটি’ (টিএফএফএফ)। দাতারা জানিয়েছেন, প্রাথমিক পর্যায়ে তারা ৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ দেবেন। তবে এত অর্থের প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও পুরো উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় কাঠামো এখনও পূর্ণতা পায়নি। সিভিল সোসাইটি সংগঠন এবং ক্লাইমেট ল্যান্ড এম্বিশন অ্যান্ড রাইটস অ্যালায়েন্স (ক্লারা) সদস্যদের মধ্যেও এ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। সমর্থকদের দাবি,এই উদ্যোগ অফসেট ছাড়াই বিদ্যমান বনকে মূল্যায়ন করবে এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠী সরাসরি অর্থপ্রাপ্তির সুযোগ পাবে। কিন্তু সমালোচকদের মতে,যে বৈশ্বিক আর্থিক কাঠামো বন ধ্বংসের জন্য দায়ী, সেই কাঠামোর ভেতর থেকেই বন রক্ষা সম্ভব নয়। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, টিএফএফএফ–এর বর্জন তালিকা থাকা সত্ত্বেও এর বিনিয়োগ শাখা ভবিষ্যতে বন উজাড়কারী শিল্পে অর্থায়ন করতে পারে।

সম্মেলনে বারবার বায়োএনার্জি ও কার্বন অফসেটের মতো ‘মিথ্যা সমাধান’ প্রচারিত হয়েছে। কার্বন বাজার (প্যারিস চুক্তির অনুচ্ছেদ ৬.৪) সংক্রান্ত আলোচনায় বাজারের বড় অংশীদার ও জীবাশ্ম জ্বালানি লবিস্টরা নিয়ম শিথিল করার চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত তা বাতিল করা হয়েছে। এতে প্যারিস চুক্তির মান বজায় রাখা সম্ভব হয়েছে। তবে ক্লিন ডেভেলপমেন্ট মেকানিজম (সিডিএম)-এর মেয়াদ আরও ছয় মাস বাড়ানো হয়েছে, যা নতুন ৬.৪ ব্যবস্থায় নিম্নমানের সিডিএম ক্রেডিট প্রবেশের ঝুঁকি তৈরি করেছে।

প্যারিস চুক্তির অনুচ্ছেদ ৬.৮-এর অধীনে নন-মার্কেট অ্যাপ্রোচ নিয়ে আলোচনায় দেখা গেছে,ধনী উন্নত দেশগুলো এখনো চায় না যে এককভাবে কোনো দেশ নিজেদের প্রস্তাব নিবন্ধন করতে পারুক। অথচ বেশিরভাগ উন্নয়নশীল দেশ এই প্রক্রিয়াকে সমর্থন করছে। এই অবস্থান বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পদক্ষেপকে ধীর করছে এবং নির্গমন হ্রাস, বন রক্ষা ও ১.৫ ডিগ্রি লক্ষ্য অর্জনে উন্নত দেশগুলোর নৈতিক নেতৃত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

ক্লারা ওয়ার্কিং গ্রুপের প্রধান সৌপর্ণ লাহিড়ী বলেন, ধনী দেশগুলো অত্যন্ত আপসকৃত সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিয়ে অনুচ্ছেদ ৬.৮-এর অধীনে নন-মার্কেট অ্যাপ্রোচের অগ্রগতিতে বাধা দিচ্ছে। কার্বন বাজারের মাধ্যমে বিভ্রান্তিকর সমাধানের বিপরীতে এখানে বাস্তব রূপান্তরের সম্ভাবনা রয়েছে কিন্তু তা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

আর্জেন্টিনার জলবায়ু কর্মী ক্যাটালিনা গোন্ডা বলেন, আমরা বেলেম ছাড়ছি তিক্ত অনুভূতি নিয়ে। বন নিয়ে কোনো সিদ্ধান্তমূলক পদক্ষেপ ছাড়া জলবায়ু লক্ষ্য পূরণ অসম্ভব। ৯২টি দেশের জোরালো দাবি সত্ত্বেও সরকারগুলো বন–সম্প্রদায় ও জলবায়ুর জন্য জরুরি সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার ছাড়াই ফিরে গেল।

ক্লারা নেটওয়ার্ক কোঅর্ডিনেটর কেলি স্টোন মন্তব্য করেন, বন উজাড় বন্ধ করা কেবল ঘোষণার বিষয় নয়। মাঠ পর্যায়ে বাস্তব পদক্ষেপ প্রয়োজন। ধনী দেশগুলো নিজেদের বন রক্ষা না করলে এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সরকারি অনুদান না দিলে বিশ্ব কখনোই এ কাজ করতে পারবে না।

বিশ্বব্যাপী বন রক্ষায় অগ্রগতি আসবে না বিচ্ছিন্ন পদক্ষেপে; এর জন্য প্রয়োজন জন–অর্থায়ন এবং বন ধ্বংসকারী বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামোর গভীর সংস্কার। ‘বন কপ’ নামে পরিচিত এ সম্মেলন কোনো সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত বা পথনির্দেশ দিতে না পারায় এটিকে জলবায়ু সংকটের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এক বড় সুযোগ হারানোর ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

রিপোর্টার্স২৪/এসসি

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪