| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

গাজীপুরে ৩০ বছর ধরে পাখিদের খাওয়ান দোকানি নুরুল ইসলাম

reporter
  • আপডেট টাইম: ডিসেম্বর ১৫, ২০২৫ ইং | ০৯:০৭:৩৫:পূর্বাহ্ন  |  ৩৭৩৫৪৬ বার পঠিত
গাজীপুরে ৩০ বছর ধরে পাখিদের খাওয়ান দোকানি নুরুল ইসলাম

এ এইচ সবুজ, গাজীপুর : গ্রামীণ সড়কের পাশে ছোট্ট এক টং দোকান ঘিরে গাছ-গাছালি ও বৈদ্যুতিক তারে শত শত পাখির বাস। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলেই শুরু হয় তাদের কিচিরমিচির।

সময় তখন বিকেল তিনটা। কিছুক্ষণ পরই এলেন এক বৃদ্ধ। তাঁকে দেখে পাখিদের কিচিরমিচির আরও বেড়ে গেল। বৃদ্ধ তাঁর দোকান খুলে পসরা সাজানোর আগেই খাবার ছিটিয়ে দিলেন। এ সময় আসা পাখিগুলো কিচিরমিচির থামিয়ে খাবার খেতে থাকে।

চোখে পড়ার মতো এই ঘটনাটি গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার ইকুরিয়া বাজারের। টং দোকানির নাম মো. নুরুল ইসলাম (৬৭)। পাশের কবিরের বাজারে তাঁর বসতবাড়ি।

তিনি ইকুরিয়া বাজারে ছোট্ট একটি টং দোকানে চানাচুর, নিমকি, মুড়িসহ নানা জিনিসপত্র বিক্রি করেন। এখানে তিনি প্রায় ৪০ বছর ধরে ব্যবসা করছেন। আর পাখিদের খাবার দিচ্ছেন ৩০ বছর ধরে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নুরুল ইসলামের টং দোকানের আশপাশে খাবার খেতে এসেছে বুলবুলি, ভাত শালিক, ঝুঁটি শালিক, কাঠ শালিক, ঘুঘু, গো-শালিক, বক, কাক, দোয়েল, কবুতরসহ নানা জাতের দেশি পাখি। যা এক বিরল দৃশ্য।

পাখিদের কেন খাবার খাওয়ান—এমন প্রশ্নে নুরুল ইসলাম জানান, ‘এখন পরিবেশে পাখা-পাখালির খাবার নাই। এরা খাবে কী—দয়া লাগে। ভালোবাসা জন্মেছে তাদের প্রতি, তাই খাওয়াই। এতে করে আল্লাহ খুশি হন। পাখিদের খাবার দিয়ে যে আনন্দ পাই, তা আপনারা বুঝবেন না। খাবার দিয়ে অভ্যাস করেছি। এখন এরা আসে। এদের তো আমি বিমুখ করতে পারি না।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি কোথাও বেড়াতে গেলেও বাড়িতে চলে আসি শুধু পাখিদের জন্য। কারণ আমি না থাকলে তাদের খাবার দেবে কে?’

তিনি বলেন, ‘আমার পরিবারের কোনো সদস্য বা আত্মীয়-স্বজনের মৃত্যু হলেও দাফন-কাফন শেষে আমি দোকানে চলে এসেছি পাখিদের মায়ায়। কারণ পাখিগুলো তো সময়মতো এখানে আসে। আমাকে না পেলে পেটে ক্ষুধা নিয়ে চলে যাবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এজন্যই তাদের মায়ায় আমি বাড়িতে থাকতে পারি না। আমি গরিব মানুষ হলেও এই সামান্য আয়ের কিছু অংশ পাখিগুলোর জন্য রেখে দিই। এতে করে আমি তৃপ্তি পাই।’

কথার একপর্যায়ে তিনি বলেন, ৪০ বছর আগে ইকুরিয়া বাজারের স্লুইসগেটসংলগ্ন এলাকায় তিনি কসমেটিকসের দোকান শুরু করেন। হঠাৎ একদিন দোকানের সামনে কয়েকটি শালিক পাখি আসে। তখন তাঁর কাছে থাকা কিছু মুড়ি ছিটিয়ে দেন। পাখিরাও সেগুলো খায়। পরদিন থেকেই পাখিরা তাঁর দোকানের সামনে আসতে থাকে। এভাবে তিনিও তাদের খাবার দেওয়া অব্যাহত রাখেন। দিনে দিনে পাখির সংখ্যা বাড়তে থাকে। এখন প্রায় ৪০০–৫০০ পাখি প্রতিদিন খাবার খেতে আসে বলে তাঁর ও স্থানীয়দের ভাষ্য।

নুরুল ইসলাম স্বল্প আয়ের মানুষ হলেও পাখিদের খাবার দেওয়া বন্ধ করেননি। তবে কখনো অসুস্থ হয়ে দোকান খুলতে না পারলে পাখিদের খাবার দেওয়া হয় না। তখন পাখিগুলোর জন্য তাঁর মন ভীষণ খারাপ হয়।

এ বিষয়ে আশপাশের কয়েকজন দোকানি জানান, নুরুল ইসলাম শুধু পাখিদেরই নয়, রাস্তাঘাটের মানসিক রোগী, অসুস্থ কুকুর-বিড়ালকেও খাবার দেন। পাখিদের পাশাপাশি নিয়মিত তাঁর দোকানের সামনে এসে কিছু কুকুর-বিড়ালও খাবার খায়।

চা-দোকানি আবুল কালাম বলেন, নুরুল ইসলামের এই অভ্যাস বহুদিনের। পাখিগুলো তাঁর বন্ধু হয়ে গেছে। সময়মতো সব পাখি চলে আসে। শুরুতে তাঁর এ কাজকে অনেকে পাগলামি বললেও এখন সবার কাছেই দৃশ্যটি পরিচিত হয়ে গেছে। এলাকায় সবাই তাঁকে পশু-পাখিপ্রেমী হিসেবে চেনে।

এ সময় স্থানীয়রা আরও জানান, প্রাণীদের জন্য নুরুল ইসলামের মায়ার ব্যাপারটা অন্যরকম। প্রতিদিন তিনি কিছু মুড়ি, চানাচুর ও নিমকি পাখিদের খাবার হিসেবে দেন। এটা দেখে অনেকের শেখার আছে।

একজন মানুষের ভেতরে মানবতাবোধ থাকলেই কেবল মানুষ পশু-পাখির প্রতি দয়া দেখাতে পারে। তিনি গরিব হতে পারেন, কিন্তু তাঁর ভেতরে মানবতাবোধ আছে। নুরুল ইসলাম যা করেন, তা নিঃসন্দেহে একটি পুণ্যের কাজ।

রিপোর্টার্স২৪/এসএন

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪