স্টাফ রিপোর্টার: বাবা-মেয়ের চোখাচোখি, নীরব অশ্রু আর না বলা কষ্ট—ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) এমনই এক আবেগঘন দৃশ্যের সাক্ষী হন উপস্থিত আইনজীবী ও দর্শনার্থীরা।
দুপুর ১২টা ২২ মিনিটে কাঠগড়ার পেছনে দাঁড়িয়ে আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক আবুল বারকাত। কিছু দূরে দাঁড়িয়ে তাঁকে একের পর একবার দেখছিলেন তাঁর মেয়ে অরণি বারকাত। প্রতিবারই চোখ ভিজে উঠছিল তাঁর। মুখ ফিরিয়ে অশ্রু লুকানোর চেষ্টা করছিলেন তিনি।
আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলার এক ফাঁকে আড়চোখে মেয়ের দিকে তাকান অধ্যাপক বারকাত। মেয়ের চোখে জল দেখে তাঁর চোখেও পানি চলে আসে। কথা থামিয়ে কিছুক্ষণ মেয়ের দিকেই তাকিয়ে থাকেন তিনি। বাবার অশ্রুসিক্ত চোখ আর সহ্য করতে না পেরে আদালতের এক কোণে নিজেকে আড়াল করে নেন অরণি বারকাত।
এক আত্মীয় জানান, অধ্যাপক আবুল বারকাত গত সাত মাস ধরে কারাগারে রয়েছেন। একই মামলার পাঁচজন আসামি জামিন পেলেও আর্থিক সংকটের কারণে ভালো আইনজীবী নিয়োগ করতে না পারায় তাঁর জামিন হয়নি। তিনি বলেন, উনি খুবই সাধারণ মানুষ। কোথায় গেলে, কীভাবে গেলে দ্রুত জামিন পাওয়া যায়—এসব বিষয়ে অভিজ্ঞ নন।
দুদকের একটি মামলায় অভিযোগপত্র গ্রহণের শুনানি থাকায় বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার দিকে অধ্যাপক আবুল বারকাতকে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে হাজতখানায় রাখা হয়। দেড় ঘণ্টা পর তাঁকে হাজতখানা থেকে আদালতে তোলা হয়। এ সময় তাঁর গায়ে ছিল বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট, মাথায় হেলমেট এবং দুই হাতে হাতকড়া।
পরে তাঁকে কাঠগড়ায় তোলা হলে তিনি পরিচিত কয়েকজন শিক্ষার্থী ও সহকর্মীর সঙ্গে সালাম বিনিময় করেন এবং বেঞ্চে বসে পড়েন। দুপুর ১২টার দিকে তাঁর মেয়ে, জামাতা ও কয়েকজন নিকটাত্মীয় আদালতে উপস্থিত হন। তাঁদের দেখে আবুল বারকাত উঠে এসে ইশারায় কুশল বিনিময় করেন।
দুপুর ১২টা ৩৫ মিনিটে দুদকের মামলায় অভিযোগপত্র গ্রহণের শুনানি শুরু হয়। অপর আসামিদের পক্ষে আইনজীবী মাসুদ আহমেদ তালুকদার জামিন আবেদন করলে আদালত তা নামঞ্জুর করেন। পরে আদালত অভিযোগপত্র গ্রহণ করে মামলার পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন।
শুনানি শেষে অধ্যাপক আবুল বারকাতকে পুনরায় হেলমেট, বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট ও হাতকড়া পরিয়ে হাজতখানায় নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁকে বের করে নেওয়ার সময় উপস্থিত এক আইনজীবী প্রশ্ন তুলে বলেন, তিনি একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক—তাঁকে জঙ্গিদের মতো করে নেওয়া হচ্ছে কেন?
এ বিষয়ে দুদকের আইনজীবী তরিকুল ইসলাম জানান, আবুল বারকাতসহ অন্যান্য আসামিরা যোগসাজশে প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে জনতা ব্যাংক থেকে ২৯৭ কোটি ৩৮ লাখ ৮৭ হাজার ২৯৬ টাকা আত্মসাৎ করেছেন, যা সুদে-আসলে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫৩১ কোটি টাকা। আদালত অভিযোগপত্র আমলে নিয়ে পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন এবং পরোয়ানা তামিলের প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ৪ মার্চ দিন ধার্য করেছেন।
মামলার অন্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আতিউর রহমান, সাবেক ডেপুটি গভর্নর আবু হেনা মোহাম্মদ রাজী হাসানসহ জনতা ব্যাংক ও এননটেক্স গ্রুপের একাধিক সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা।
রিপোর্টার্স২৪/বাবি