শেরপুর প্রতিনিধি: শেরপুর-৩ আসনের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণায় চেয়ারে বসা নিয়ে জামায়াত ও বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষে নিহত জামায়াত নেতা মাওলানা রেজাউল করিমের জানাজা কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় শ্রীবরদী সরকারি কলেজ মাঠে তার প্রথম জানাজা নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। এতে ইমামতি করেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ড. ছামিউল হক ফারুকী। পরে রাত সাড়ে আটটায় একই উপজেলার গড়জরিপা ইউনিয়নের গোপালখিলা এলাকায় দ্বিতীয় জানাজা শেষে বাড়ির পাশের পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
এদিকে রেজাউল করিম হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার দাবি করেছেন জামায়াতের নেতাকর্মীরা। নিহত মাওলানা রেজাউল করিম শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি এবং উপজেলার ফতেহপুর ফাজিল মাদ্রাসার আরবি বিভাগের প্রভাষক ছিলেন। তিনি এক ছেলে ও এক মেয়ের জনক। তার পরিবারের সার্বিক দায়িত্ব নিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। তবে এ ঘটনায় এখনও কোনো মামলা দায়ের হয়নি।
জানাজাপূর্ব সংক্ষিপ্ত আলোচনায় বক্তব্য রাখেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সেক্রেটারি ড. মো. ছামিউল হক ফারুকী, জেলা জামায়াতের আমির মাওলানা হাফিজুর রহমান, সেক্রেটারি ও শেরপুর-৩ আসনের জামায়াত প্রার্থী নুরুজ্জামান বাদল, ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ও শেরপুর-১ আসনের জামায়াত প্রার্থী হাফেজ রাশেদুল ইসলাম, জেলা জামায়াতের প্রচার সেক্রেটারি ও শেরপুর-৩ আসনের প্রার্থী মো. গোলাম কিবরিয়া ভিপি এবং জেলা এনসিপির আহ্বায়ক ইঞ্জিনিয়ার মো. লিখন প্রমুখ।
বক্তারা বলেন, সরকারিভাবে আয়োজিত নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানিয়ে সেখানে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারা প্রশাসনের ব্যর্থতা। সেখানে গিয়ে মাওলানা রেজাউল করিম সন্ত্রাসীদের হামলায় শাহাদাতবরণ করেন। প্রকাশ্যে হামলার ঘটনায় জড়িতদের এখনো গ্রেপ্তার না করায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তারা দ্রুত হত্যাকারীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।
অন্যদিকে বিএনপি দাবি করেছে, জামায়াত পূর্বপরিকল্পিতভাবে এ ঘটনা ঘটিয়েছে। ঝিনাইগাতী উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব মো. লুৎফর রহমান বলেন, বিএনপি নেতাকর্মীরা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন। বরং জামায়াতের হামলায় বিএনপির অর্ধশতাধিক নেতা-কর্মী আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে কয়েকজন ময়মনসিংহ ও ঢাকায় গুরুতর অবস্থায় চিকিৎসাধীন।
জানাজাকে ঘিরে শ্রীবরদী সরকারি কলেজ ও আশপাশের বাজার এলাকায় বিপুল সংখ্যক সেনাবাহিনী, বিজিবি, র্যাব ও পুলিশ মোতায়েন করা হয়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নিয়মিত টহল দিতে দেখা যায়। জানাজা শেষে জামায়াত নেতাকর্মীরা উপজেলা শহরে বিক্ষোভ মিছিল করে এবং হত্যার বিচার দাবি করেন।
জেলা জামায়াতের আমির মাওলানা হাফিজুর রহমান বলেন, হত্যাকাণ্ডের ভিডিও ফুটেজ রয়েছে। সেগুলো পর্যালোচনা করে হত্যা মামলা দায়ের করা হবে। প্রাথমিকভাবে থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে এবং কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের পরামর্শে পরবর্তী কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে।
নিহত রেজাউলের শ্বশুর কাকিলাকুড়ার বাসিন্দা হাফেজ মো. আবুবকর বলেন, আমি হত্যাকারীদের দ্রুত ফাঁসি চাই। রেজাউলের স্ত্রী ও দুই শিশু সন্তানকে এখন দেখবে কে?
জানাজা শেষে গোপালখিলা গ্রামের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, রেজাউলের বৃদ্ধ বাবা মাওলানা আব্দুল আজিজ নির্বাক হয়ে পড়েছেন। বাড়ির ভেতর থেকে নারীদের উচ্চস্বরে কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছে। পুরো গ্রামে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
এ ঘটনায় ঝিনাইগাতী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আশরাফুল আলম রাসেল এবং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নাজমুল হাসানকে প্রত্যাহার করেছে নির্বাচন কমিশন। বৃহস্পতিবার বিকেলে কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান।
শেরপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মিজানুর রহমান ভূঁঞা বলেন, এ ঘটনায় এখনো কোনো অভিযোগ দায়ের হয়নি। তবে পুলিশ তদন্ত কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক।
শেরপুরের পুলিশ সুপার মো. কামরুল ইসলাম বলেন, মাওলানা রেজাউল করিম হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যারা জড়িত, তদন্ত সাপেক্ষে তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে। এ ঘটনায় পুলিশের একটি বিশেষ দল কাজ করছে।
উল্লেখ্য, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে বুধবার শ্রীবরদী উপজেলা মিনি স্টেডিয়ামে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের নিয়ে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা অনুষ্ঠানে চেয়ারে বসাকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। দফায় দফায় সংঘর্ষে উভয় পক্ষের অন্তত শতাধিক নেতা-কর্মী আহত হন। সন্ধ্যার সংঘর্ষে গুরুতর আহত জামায়াত নেতা রেজাউল করিমকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে বুধবার রাত ১০টার দিকে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। সংঘর্ষ থামাতে গিয়ে একজন সেনাসদস্যও আহত হন।
রিপোর্টার্স২৪/এসএন