| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

রয়টার্স প্রতিবেদন

আড়াল থেকে উঠে এসে ক্ষমতার শীর্ষে চ্যালেঞ্জ ছুড়ছেন ইসলামী নেতা শফিকুর রহমান

reporter
  • আপডেট টাইম: ফেব্রুয়ারী ১০, ২০২৬ ইং | ১২:৫৬:০৬:অপরাহ্ন  |  ৬৩৭৯৬৭ বার পঠিত
আড়াল থেকে উঠে এসে ক্ষমতার শীর্ষে চ্যালেঞ্জ ছুড়ছেন ইসলামী নেতা শফিকুর রহমান
ছবির ক্যাপশন: সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: দীর্ঘদিন বাংলাদেশের রাজনীতির প্রান্তিক চরিত্র হিসেবে পরিচিত ছিলেন শফিকুর রহমান। কিন্তু এখন ঢাকার রাজপথজুড়ে পোস্টার ও বিলবোর্ডে শোভা পাচ্ছে তাঁর দাড়িওয়ালা মুখ, যেখানে ভোটারদের আহ্বান জানানো হচ্ছে দেশের ইতিহাসে প্রথম ইসলামপন্থী নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনের জন্য।

৬৭ বছর বয়সী এই চিকিৎসক ও জামায়াতে ইসলামীর আমির (সভাপতি) কয়েক দশক ধরে মূলত ইসলামপন্থী মহলেই পরিচিত ছিলেন। তবে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তিনি এখন প্রধানমন্ত্রিত্বের জন্য এক গুরুতর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ২০২৪ সালে জেন জি নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এটিই দেশের প্রথম জাতীয় নির্বাচন। এই নির্বাচনে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে সাবেক মিত্র ও বর্তমানে এগিয়ে থাকা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি)।

বাংলাদেশের প্রায় ১৭ কোটি ৫০ লাখ মানুষের মধ্যে আনুমানিক ৯১ শতাংশ মুসলমান, যা দেশটিকে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মুসলিম-অধ্যুষিত রাষ্ট্রে পরিণত করেছে। ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম হলেও সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার কথাও বলা রয়েছে, আর জনগণের অধিকাংশই সুন্নি মুসলমান।

মতামত জরিপগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, একসময় নিষিদ্ধ থাকা জামায়াতে ইসলামী এবার তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী নির্বাচনী ফলের দিকে এগোচ্ছে,যা মধ্যপন্থী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। উল্লেখ্য, দলটি ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের কাছ থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল।

হাসিনা পতনের পর বদলে যায় ভাগ্য

শেখ হাসিনার শাসনামলে ইসলামপন্থী দলগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয় সরকার। শীর্ষ জামায়াত নেতাদের কারাবন্দি করা হয়, কেউ কেউ ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধে মৃত্যুদণ্ড পান, দলটিকে নিষিদ্ধ করে কার্যত গোপনে চলে যেতে বাধ্য করা হয়। শফিকুর রহমানও ২০২২ সালে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের সদস্যদের সহায়তার অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়ে ১৫ মাস কারাবন্দি ছিলেন।

তবে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান জামায়াত ও শফিকুর রহমানের ভাগ্য বদলে দেয়। ওই বছরের আগস্টে শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দলটির ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ শিথিল করে। পরে ২০২৫ সালে আদালত জামায়াতের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে।

এরপর দ্রুত সংগঠিত হয় জামায়াত। তারা ত্রাণ কার্যক্রম, বন্যা সহায়তা ও সামাজিক উদ্যোগ শুরু করে। শফিকুর রহমানের সাদা দাড়ি ও সাদা পোশাক তাঁকে দ্রুত পরিচিত মুখে পরিণত করে।

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শফিকুর রহমান বলেন,আমরা আমাদের কথা বলতে চেয়েছি, কিন্তু বারবার তা দমন করা হয়েছে। অভ্যুত্থানের পর আবার প্রকাশ্যে আসার সুযোগ পেয়েছি।

চিকিৎসক পরিবার থেকে রাজনীতির শীর্ষে

১৯৫৮ সালে মৌলভীবাজার জেলায় জন্ম নেওয়া শফিকুর রহমান রাজনীতিতে হাতেখড়ি নেন একটি বামপন্থী ছাত্র সংগঠনের মাধ্যমে। পরে তিনি যোগ দেন ইসলামী ছাত্রশিবিরে। ১৯৮৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন তিনি।

১৯৯৬, ২০০১ ও ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিলেও তিনি সফল হননি। ২০২০ সালে জামায়াতের আমির নির্বাচিত হন।

তাঁর স্ত্রী আমিনা বেগমও একজন চিকিৎসক এবং ২০১৮ সালে সংসদ সদস্য ছিলেন। তাঁদের দুই কন্যা ও এক পুত্রসন্তানরাও সবাই চিকিৎসক। শফিকুর রহমান সিলেট অঞ্চলে একটি পারিবারিক মালিকানাধীন হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান।

শেখ হাসিনার শাসনামলে ঢাকায় অনেকেই শফিকুর রহমানের পুরো নামই জানতেন না। এটি তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী, বিএনপি নেতা তারেক রহমানের সঙ্গে স্পষ্ট বৈপরীত্য তৈরি করে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমান দীর্ঘদিন ধরেই জাতীয় রাজনীতিতে পরিচিত মুখ। উল্লেখ্য, এই দুই রহমানের মধ্যে কোনো পারিবারিক সম্পর্ক নেই। জামায়াত তাদের নেতাকে ‘সৎ, বিনয়ী ও শৃঙ্খলাপূর্ণ জীবনযাপনকারী’ হিসেবে বর্ণনা করে।

রাজনৈতিক শূন্যতার সুযোগ

বিশ্লেষকদের মতে, গণঅভ্যুত্থানের পর সৃষ্ট রাজনৈতিক শূন্যতার সুযোগ কাজে লাগিয়েছেন শফিকুর রহমান।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শফি মোস্তফা বলেন,অভ্যুত্থানের পর প্রথম এক মাসে বাংলাদেশে কোনো দৃশ্যমান নেতা ছিলেন না। তারেক রহমান তখন লন্ডনে নির্বাসনে ছিলেন।

তিনি বলেন,এই সময় শফিকুর রহমান সারা দেশে ঘুরেছেন, গণমাধ্যমে উপস্থিতি বাড়িয়েছেন এবং মাত্র দুই বছরের মধ্যেই তিনি শীর্ষ প্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত হয়েছেন।

নির্বাচনী প্রচারে তাঁর বক্তব্য অনেক ভোটারের কাছে সাড়া ফেলেছে। তিনি জামায়াতকে ইসলামি মূল্যবোধনির্ভর একটি পরিচ্ছন্ন ও নৈতিক বিকল্প হিসেবে তুলে ধরছেন। ডিসেম্বরে দলটি জেন জি–সমর্থিত ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির সঙ্গে জোট গড়ে, যার ফলে তরুণ ও তুলনামূলক কম রক্ষণশীল ভোটারদের মধ্যেও প্রভাব বাড়ে।দেশজুড়ে ‘গেম অব থ্রোনস’ অনুপ্রাণিত পোস্টারও দেখা গেছে, যেখানে লেখা‘দাদু আসছে’।

জামায়াতের তুলনামূলক সংযত মুখ হিসেবে পরিচিত শফিকুর রহমান দলটির ভাবমূর্তি নরম করার চেষ্টা করেছেন। তিনি সুশাসন, দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান ও সামাজিক ন্যায়বিচারের কথা বলছেন এবং সব ধর্মের মানুষের সমান অধিকারের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।

নারীবিষয়ে বিতর্ক

তবে নারীদের ভূমিকা নিয়ে তাঁর বক্তব্য বিতর্ক তৈরি করেছে। জামায়াত এবার কোনো নারী প্রার্থী দেয়নি। শফিকুর রহমান বলেছেন, নারীদের দিনে পাঁচ ঘণ্টার বেশি কাজ না করে পরিবারকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি দাবি করেন, আধুনিকতার নামে নারীদের ঘরের বাইরে ঠেলে দেওয়া ‘এক ধরনের পতিতাবৃত্তি’। এ মন্তব্যের পর কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবাদ হয়। পরে জামায়াত দাবি করে, ওই অ্যাকাউন্টটি হ্যাক করা হয়েছিল।

শফিকুর রহমান বলেন,আমরা মধ্যপন্থী, আমরা নমনীয়, আমরা যুক্তিসংগত।তিনি যোগ করেন,তবে আমাদের নীতির ভিত্তি ইসলামী মূল্যবোধ ও কোরআনের শিক্ষা। কোরআন শুধু মুসলমানদের জন্য নয়, সমগ্র সৃষ্টির জন্য।

রিপোর্টার্স২৪/এসসি

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪