| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

আল জাজিরা প্রতিবেদন

শেখ হাসিনার পরের বাংলাদেশ কি তারেক রহমানকেই খুঁজছে?

reporter
  • আপডেট টাইম: ফেব্রুয়ারী ১০, ২০২৬ ইং | ১৪:০২:৪৮:অপরাহ্ন  |  ৬৩৭০৯০ বার পঠিত
শেখ হাসিনার পরের বাংলাদেশ কি তারেক রহমানকেই খুঁজছে?
ছবির ক্যাপশন: সংগৃহীত

১৭ বছরের নির্বাসন শেষে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী শেখ হাসিনার পতনের পর দেশে ফিরে আসা বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বৃহস্পতিবারের নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী পদে এগিয়ে থাকা প্রার্থী হিসেবে উঠে এসেছেন।

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: রাত প্রায় বারোটা ছুঁইছুঁই, তবুও ঢাকার উত্তরে গাজীপুর দেশের অন্যতম পোশাকশিল্প কেন্দ্র এখনো হাজার হাজার মানুষ জড়ো হচ্ছেন একটি নির্বাচনী সমাবেশে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন তারা, শুধু একজন মানুষকে এক নজর দেখার জন্য, তারেক রহমান।

ডিসেম্বরে বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির দীর্ঘদিনের নেত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেওয়া তারেক রহমান এখন নির্বাচনী রাজনীতির কেন্দ্রে। বিএনপি নেতাদের মতে, এই জনসমাগম প্রমাণ করে, ১৫ বছর ধরে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে দমন-পীড়নের শিকার দলটি আবার সংগঠিত হচ্ছে এবং ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে ক্ষমতায় ফেরার মতো শক্তি অর্জন করেছে।

নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার গত বছর শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগকে রাজনীতি থেকে নিষিদ্ধ করায় বিএনপি এবারের নির্বাচনে স্পষ্টভাবেই এগিয়ে। তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামী,যারা ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া সাবেক ছাত্রনেতাদের গড়া ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির (এনসিপি) সঙ্গে জোট বেঁধেছে।

প্রত্যাবর্তনের প্রতীকী শক্তি

প্রায় ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন ৬০ বছর বয়সী তারেক রহমান। এরপর থেকেই তিনি বিএনপির নির্বাচনী প্রচারণার কেন্দ্রবিন্দুতে। মঙ্গলবার প্রচারণা শেষ হওয়া পর্যন্ত তাঁর সমাবেশগুলোতে বিপুল জনসমাগম দেখা গেছে।

দীর্ঘদিন গ্রেপ্তার, দলীয় বিভক্তি এবং ভোটারদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার পর তারেক রহমানের সরাসরি মাঠে নামা বিএনপি সমর্থকদের কাছে দল পুনরুজ্জীবনের এক শক্ত প্রতীক হয়ে উঠেছে।

তার এই প্রত্যাবর্তন শুধু রাজনৈতিক নয়, ঐতিহাসিকও। কারণ, তারেক রহমানের রাজনৈতিক ভিত্তি গড়ে উঠেছে তাঁর পিতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উত্তরাধিকার থেকে যিনি ১৯৮১ সালে হত্যার আগ পর্যন্ত বিএনপির আদর্শ ও কাঠামো গড়ে তুলেছিলেন।

উচ্ছ্বাসের সঙ্গে সংশয়

তবে এই উচ্ছ্বাসের পাশাপাশি বাড়ছে সংশয়ও। এবারের নির্বাচন ঘিরে প্রত্যাশার পাশাপাশি অনিশ্চয়তাও স্পষ্ট।

প্রায় ১৭ বছর ধরে লন্ডনে থেকে কার্যত বিএনপির নেতৃত্ব দিয়েছেন তারেক রহমান। এ সময় দল পরিচালিত হয়েছে দূত ও ভার্চুয়াল যোগাযোগের মাধ্যমে। দেশে ফেরার পর তাঁর নেতৃত্ব সরাসরি দৃশ্যমান হলেও প্রতীকী কর্তৃত্বকে সংগঠনিক নিয়ন্ত্রণে রূপ দেওয়াটা সহজ হয়নি।

এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ, দলীয় শৃঙ্খলার সংকট। ৩০০ আসনের মধ্যে ৭৯টি আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থীর বিপরীতে ৯২ জন বিদ্রোহী প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান অধ্যাপক আল মাসুদ হাসানুজ্জামান বলেন,আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় এবারে এই সংখ্যা বেশি।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সংঘটিত রাজনৈতিক সহিংসতার ৯১ শতাংশের সঙ্গে বিএনপি কর্মীদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে,যা দলটির অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক দিলারা চৌধুরী বলেন,দলীয় শৃঙ্খলার অভাব এখন খুব দৃশ্যমান। বিদ্রোহী প্রার্থীরা প্রকাশ্যেই কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করছেন।

তিনি বলেন,এই নির্বাচন তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রথম বড় পরীক্ষা।সব বাধা সত্ত্বেও যদি তিনি দলকে জেতাতে পারেন, সেটিই হবে তাঁর প্রথম প্রকৃত সাফল্য।

প্রস্তুতির ঘাটতি ও বক্তব্যের বিতর্ক

তারেক রহমানের বক্তব্যও সমালোচনার মুখে পড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, উচ্চাভিলাষী প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তবভিত্তিক তথ্যের ঘাটতি অনিশ্চিত ভোটারদের আস্থা নষ্ট করছে।

ফরিদপুরের এক সমাবেশে তিনি দাবি করেন, ওই জেলায় বিপুল পরিমাণ সয়াবিন উৎপাদিত হয়,যা দ্রুতই ভুল প্রমাণিত হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক গ্রাফিকে তাঁর কিছু প্রতিশ্রুতি আগের বিএনপি-জামায়াত সরকারের পুনরাবৃত্তি বলেও সমালোচিত হয়েছে।

এক বিএনপি নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,হ্যাঁ, বক্তৃতায় ভুল হয়। কিন্তু তিনি দীর্ঘদিন দেশের বাইরে ছিলেন। আমরা বিশ্বাস করি, সময়ের সঙ্গে তিনি উন্নতি করবেন।

বিশ্লেষক দিলারা চৌধুরী বলেন,তিনি ৫০ কোটি গাছ লাগানোর মতো প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, যা বাস্তবসম্মত নয়।তিনি ‘ফ্যামিলি কার্ড’সহ সামাজিক ভাতা কর্মসূচির অর্থায়ন নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।

দুর্নীতি ও ভাবমূর্তির দ্বন্দ্ব

তারেক রহমান দুর্নীতিবিরোধী কঠোর অবস্থানের কথা বললেও বিএনপি মনোনীত প্রার্থীদের মধ্যে ২৩ জন ঋণখেলাপি থাকায় সেই বক্তব্য নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে ।সোমবার জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তারেক রহমান অতীতের ভুল স্বীকার করে বলেন,রাষ্ট্র ও সরকারকে জনগণের কাছে জবাবদিহির আওতায় আনার বিকল্প নেই।

আনুগত্য বনাম যোগ্যতা

দলীয় সূত্র বলছে, তারেক রহমান লন্ডন থেকে সঙ্গে আনা উপদেষ্টাদের ওপর বেশি নির্ভর করছেন, যারা দীর্ঘদিন দেশের বাইরে থাকায় বাস্তব পরিস্থিতি পুরোপুরি বুঝতে পারছেন না।

এক বিএনপি নেতা বলেন,তিনি দেশ ঘুরছেন, কিন্তু বাস্তবতার সঙ্গে তাঁর সরাসরি সংযোগ সীমিত।এই নেতা অভিযোগ করেন,তিনি যোগ্যতার চেয়ে আনুগত্যকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। দল চালানো যায় এতে, সরকার নয়।

রাজনীতিতে বংশগতির প্রশ্ন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আসিফ মোহাম্মদ শাহান বলেন,তিনি কঠিন অবস্থানে আছেন। বড় জয় না পেলে দায় তার, আর বড় জয় পেলেও বলা হবে,এটাই স্বাভাবিক।

তারেক রহমানের রাজনৈতিক শক্তি ও সমালোচনা,দুটোর কেন্দ্রেই রয়েছে তাঁর পারিবারিক পরিচয়। অনেক তরুণ ভোটার বংশগত রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে চান, যদিও সেই উত্তরাধিকারই আবার তাঁকে জনসমর্থনও এনে দিচ্ছে।

তারেক রহমান বলেন,অতীতে যদি কোনো অনিচ্ছাকৃত ভুল হয়ে থাকে, আমি আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাই। সেই ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে চাই।

রিপোর্টার্স২৪/এসসি

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪