তাওহীদাহ্ রহমান নূভ
সভ্যতার ইতিহাস আমরা সাধারণত লিখি রাজা, যুদ্ধ, সাম্রাজ্য আর প্রযুক্তির আবিষ্কার দিয়ে। কিন্তু এই ইতিহাসের ভেতরে আরেকটি দীর্ঘ, নীরব ইতিহাসও প্রবাহিত—নারীর ইতিহাস। যে ইতিহাসে দেখা যায়, এক সময়ের স্বাধীন মানুষ নারী ধীরে ধীরে “গৃহিণী” নামের এক সামাজিক অভিধানে বন্দি হয়েছে, এবং অনেক ক্ষেত্রে অদৃশ্যভাবে “গৃহপালিত” এক সত্তায় পরিণত হয়েছে।
মানবজাতির প্রাচীনতম সময়—প্রস্তরযুগ—ছিল বেঁচে থাকার নির্মম সংগ্রামের যুগ। তখন মানুষ ছিল শিকারি ও সংগ্রাহক। নারী-পুরুষ উভয়েই খাদ্য সংগ্রহে অংশ নিত। কোনো জমির মালিকানা ছিল না, কোনো উত্তরাধিকার রাজনীতি ছিল না। বেঁচে থাকার জন্য প্রত্যেক মানুষকেই নিজের শ্রমে টিকে থাকতে হতো। সেই আদিম সমাজে নারী ছিল না কোনো অলঙ্কার, না কোনো নির্ভরশীল সত্তা; সে ছিল সংগ্রামী, স্বনির্ভর এবং আত্মমর্যাদাসম্পন্ন এক মানুষ।
কিন্তু মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক বিশাল মোড় আসে কৃষির আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে। মানুষ যখন স্থায়ী বসতি গড়ে তোলে, জমি চাষ করে, তখনই জন্ম নেয় সম্পত্তির ধারণা। আর সম্পত্তি জন্ম নিলেই জন্ম নেয় মালিকানা, উত্তরাধিকার এবং নিয়ন্ত্রণের রাজনীতি। এই রাজনীতিই ধীরে ধীরে গড়ে তোলে পিতৃতন্ত্রের কঠিন প্রাচীর।
নারী তখন আর কেবল মানুষ নয়—সে হয়ে ওঠে বংশরক্ষার মাধ্যম। তার শরীর হয়ে ওঠে উত্তরাধিকারের নিরাপত্তা রক্ষার ক্ষেত্র। তাকে গৃহে আবদ্ধ করা হয়, তার চলাফেরা নিয়ন্ত্রিত হয়, তার স্বাধীনতা ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়। ইতিহাসের ভাষায় একে বলা হয় “সামাজিক শৃঙ্খলা”; কিন্তু বাস্তবে এটি ছিল ক্ষমতার এক সূক্ষ্ম প্রকৌশল।
ধর্ম, পুরাণ, লোকাচার এবং সামাজিক বিধান এই কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করে তোলে। নারীর জন্য নির্ধারিত হয় এক আদর্শ চরিত্র—নম্র, অনুগত, আত্মবিসর্জনপ্রবণ। তাকে শেখানো হয়—গৃহই তার স্বর্গ, আর আনুগত্যই তার ধর্ম। এই শিক্ষা এত গভীরভাবে সমাজে প্রোথিত হয় যে বহু নারী নিজের অদৃশ্য শৃঙ্খলকেই নিজের ভাগ্য বলে মেনে নেয়।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই “গৃহিণী” পরিচয় কি সত্যিই সম্মানের, নাকি এটি এক ধরনের সামাজিক প্রশিক্ষণ, যার মাধ্যমে নারীর শ্রম ও স্বাধীনতাকে নীরবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়?
একজন গৃহিণী ভোর থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করেন—রান্না, সন্তান লালন, পরিবার পরিচালনা, অসুস্থের সেবা। তার শ্রম ছাড়া একটি পরিবার একদিনও চলতে পারে না। তবু এই শ্রমকে অর্থনৈতিক মূল্য দেওয়া হয় না, সামাজিক স্বীকৃতি দেওয়া হয় না। তাকে বলা হয়—এটাই তার দায়িত্ব, এটাই তার ভালোবাসা। এখানেই শুরু হয় সবচেয়ে সূক্ষ্ম বৈপরীত্য।
যে শ্রম ছাড়া সমাজ টিকে থাকতে পারে না, সেই শ্রমকে “কাজ” বলা হয় না; তাকে বলা হয় “নারীর কর্তব্য”। আর যখন কোনো মানুষের শ্রমকে কর্তব্য বলে ধরে নেওয়া হয়, তখন তার স্বাধীনতা ধীরে ধীরে কর্তৃত্বের কাছে সমর্পিত হয়ে যায়।
আধুনিক যুগে নারী শিক্ষা পেয়েছে, কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করেছে, রাষ্ট্র পরিচালনায়ও অংশ নিচ্ছে। কিন্তু সামাজিক মানসিকতার ভেতরে এখনো একটি পুরোনো ধারণা বেঁচে আছে—নারীর চূড়ান্ত গন্তব্য হলো গৃহ।
সমস্যা গৃহে থাকা নয়; সমস্যা তখনই শুরু হয়, যখন গৃহ একটি অদৃশ্য খাঁচায় পরিণত হয়। যখন নারীর সম্ভাবনা, স্বপ্ন ও সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা গৃহস্থালির দায়িত্বের নিচে চাপা পড়ে যায়। সভ্যতার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই আজও অমীমাংসিত— নারী কি গৃহের নির্মাতা, নাকি গৃহের বন্দি?
সম্ভবত সময় এসেছে এই প্রশ্নটি নতুন করে করার। কারণ ইতিহাস আমাদের একটি কঠিন সত্য শিখিয়েছে—যে সমাজ তার নারীদের স্বাধীন মানুষ হিসেবে স্বীকার করে না, সেই সমাজের সভ্যতা যতই উন্নত হোক, তার ভিতরে কোথাও না কোথাও আদিম বর্বরতা রয়ে যায়।
আর তাই হয়তো আজ সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটি হলো— আমরা কি সত্যিই নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছি, নাকি কেবল তার শৃঙ্খলকে “গৃহিণী” নাম দিয়ে সুন্দর করে সাজিয়েছি?
লেখক: কবি ও শিক্ষার্থী