| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

ইউরোপ নীরবে ট্রাম্পকে প্রত্যাখ্যান করছে!

reporter
  • আপডেট টাইম: মার্চ ২৭, ২০২৬ ইং | ১৮:০৬:০৫:অপরাহ্ন  |  ১৯২৯২৩ বার পঠিত
ইউরোপ নীরবে ট্রাম্পকে প্রত্যাখ্যান করছে!

ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক: এক যুগ আগে যেকোনো ইস্যুতে একসঙ্গে দাঁড়ানো শক্তির নাম ছিল পশ্চিমা জোট। যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ইংল্যান্ড একই কণ্ঠে কথা বলত। কিন্তু সময় বদলেছে। সেই ঐক্যের দেয়ালে এখন সূক্ষ্ম ফাটল, যা ক্রমে স্পষ্ট হয়ে উঠছে ইরান যুদ্ধের ছায়ায়।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ফাটলের কেন্দ্রে রয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যার কথা, কর্মকাণ্ড ও বারবার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন যেন এখন আস্থাহীনতার প্রতীকে পরিণত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। আর এই আস্থাহীনতা থেকে ইউরোপের মধ্যে কাজ করছে দ্বিধা, সতর্কতা এবং কূটনৈতিক দীর্ঘসূত্রিতা।

ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা যখন বাড়ছিল, তখন ওয়াশিংটনের প্রত্যাশা ছিল পুরোনো মিত্ররা পাশে দাঁড়াবে। কিন্তু ইউরোপের প্রতিক্রিয়া ছিল ভিন্ন। ন্যাটোর পতাকার নিচে দাঁড়িয়ে থাকা দেশগুলো যেন হঠাৎ করে নিজেদের অবস্থান নতুন করে পরিমাপ করতে শুরু করেছে। কিছু দেশ একদমই নীরব, কিছু দেশের নেতারা ধীরে ধীরে আমেরিকার বিরুদ্ধে মুখ খোলা শুরু করেছেন।

২৬ মার্চ (বৃহস্পতিবার) ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার স্টাব বলেছেন, ইরান যুদ্ধ আমাদের নয়। এটা ন্যাটো সদস্য দেশগুলোরও ব্যাপার নয়। কারণ ন্যাটো মূলত প্রতিরক্ষামূলক জোট, আক্রমণাত্মক অভিযানে অংশ নেওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই।

এর আগে মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) জার্মানির রাষ্ট্রপতি ফ্রাঙ্ক ওয়ালটার স্টাইনমায়ার ইরানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হামলাকে আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী ও রাজনৈতিকভাবে মারাত্মক ভুল বলে মন্তব্য করেছেন। একই সঙ্গে তিনি আন্তর্জাতিক আইন রক্ষায় জোর দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জার্মানি ও ইউরোপের নীতিগত দূরত্ব বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।

ফ্রাঙ্ক ওয়ালটার স্টাইনমায়ারের এই বক্তব্য জার্মান রাজনীতিতে রীতিমতো ঝড় বয়ে যাচ্ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে কোনো জার্মান নেতা এভাবে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেননি। জার্মান রাষ্ট্রপতি আরও বলেছেন, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ ছিল সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় এবং এটি সহজেই এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল।

এর আগে জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মার্সও বলেন, ইরান যুদ্ধে তারা অংশ নয়। তবে ইউক্রেন যুদ্ধ ইউরোপের অস্তিত্বের প্রশ্ন। তিনি ইরান যুদ্ধের পরিবর্তে ইউক্রেনে সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা অব্যাহত রাখার ওপর জোর দেন।

২৬ মার্চ নরওয়ের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইস্পেন বার্থ আইডেও ইরান যুদ্ধের বিরোধিতা করে বলেন, এই যুদ্ধ সবার জন্যই ভয়ানক পরিণতি বয়ে আনবে। তিনি সংঘাত নিরসনে আলোচনায় বসার ওপর জোর দেন।

এছাড়া ২৪ মার্চ অনুষ্ঠিত ডেনমার্কের নির্বাচনেও প্রধান ইস্যু ছিল যুক্তরাষ্ট্র। সেখানে অধিকাংশ দলই গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করে। একই সঙ্গে দেশটির প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন ইরান যুদ্ধে আমেরিকাকে সরাসরি সহযোগিতা না করার কথা বলেন।

এছাড়া ইতালি ও স্পেন সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধে সহযোগিতা না করার কথা জানিয়েছে। একই সঙ্গে ইউরোপের পারমাণবিক শক্তিধর দেশ ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বলেছেন, আমাদের কৌশলগত স্বাধীনতা দরকার। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিনির্ভরতা কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন এবং ইরান ইস্যুতে কূটনৈতিক সমাধানের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

এদিকে ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটে বলেছেন, এই যুদ্ধ তাদের নয়, অন্তত সরাসরি নয়। ন্যাটো মহাসচিবের এমন মন্তব্যের পর ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে ন্যাটোর তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি এই যুদ্ধকে লয়্যালটি টেস্ট বা আনুগত্যের পরীক্ষা হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ইউরোপ এতে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি এমনকি ন্যাটোকে অকার্যকর বলেও মন্তব্য করেন এবং দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র চাইলে একাই চলতে পারে। ট্রাম্প সর্বশেষ ন্যাটোকে ‘স্টুপিড’ সংগঠন বলেও কটাক্ষ করেন।

ইউরোপ ও ন্যাটোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের এমন সম্পর্কের কারণ সম্পর্কে যুক্তরাজ্যের ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক গবেষক ইমরান আহম্মেদ বলেন, ইউক্রেন যুদ্ধে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সহযোগিতা না করা, ইউরোপের ওপর বড় মাপের বাণিজ্য শুল্ক আরোপ এবং গ্রিনল্যান্ড নিয়েই মূলত অবিশ্বাস বেড়েছে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে। গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের আগ্রহ এবারই প্রথম নয়। এর আগেও এই অঞ্চল কেনার প্রস্তাব দিয়ে তিনি ইউরোপ, বিশেষ করে ডেনমার্কের সঙ্গে উত্তেজনা তৈরি করেছিলেন। বর্তমানে আর্কটিক অঞ্চলের কৌশলগত গুরুত্ব (খনিজ, সামরিক উপস্থিতি, বাণিজ্য রুট) বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ইস্যু আবার গুরুত্ব পাচ্ছে। ডেনমার্ক নিজেও ন্যাটোর সদস্য। ন্যাটোর সদস্য হয়েও গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকির পর ইউরোপ মনে করে, ট্রাম্পের নীতি তাদের সার্বভৌমত্বকে চ্যালেঞ্জ করে, যা আস্থার সংকট তৈরি করেছে।

তিনি আরও বলেন, ট্রাম্প প্রশাসনের ইউরোপীয় পণ্যের ওপর অতিরিক্ত উচ্চ শুল্ক আরোপ (বিশেষ করে স্টিল ও অ্যালুমিনিয়াম) ইউরোপ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ককে দুর্বল করেছে। এই শুল্ক আরোপ অবিশ্বাস ও আস্থাহীনতার সম্পর্কের ভিত্তি সৃষ্টি করেছে। ইরান যুদ্ধের এই সময়েও অর্থনৈতিক চাপ অব্যাহত রয়েছে। দ্রব্যমূল্যের দাম বাড়ছে। তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে বিভিন্ন দেশ। ইউরোপ মনে করছে, ট্রাম্প নিরাপত্তা সহযোগিতাকে বাণিজ্যিক চাপের সঙ্গে যুক্ত করছেন, যা সম্পর্ককে আরও জটিল করছে। এই যুদ্ধে জড়ালে ইউরোপ যে বিপর্যয়ে পড়বে, তা এখন সহজেই অনুমেয়।

ইমরান আহম্মেদ আরও বলেন, ইউরোপের কাছে সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ এখনো ইউক্রেন যুদ্ধ ও রাশিয়া। ন্যাটো এবং ইউরোপীয় দেশগুলো মনে করে, একসঙ্গে দুই ফ্রন্টে (ইউক্রেন ও ইরান) জড়ানো ঝুঁকিপূর্ণ। তাই তারা মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এড়িয়ে ইউক্রেন ইস্যুতে মনোযোগ ধরে রাখতে চায়। এছাড়া ট্রাম্পের সঙ্গে রাশিয়ার সুসম্পর্ক ইউরোপে ট্রাম্প সম্পর্কে অবিশ্বাসের মাত্রা বাড়িয়েছে।

রাজনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, ইউরোপ আমেরিকার প্রতি অবিশ্বাসের কারণে ইরান যুদ্ধ এখন শুধু একটি সামরিক সংঘাত নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সম্পর্কের গভীর সংকটকে সামনে এনেছে। একসময় ঘনিষ্ঠ মিত্র হলেও এখন উভয় পক্ষের অগ্রাধিকার ভিন্ন। ট্রাম্পের একক নেতৃত্বের নীতি এবং ইউরোপের বহুপাক্ষিক কূটনীতি-এই দুই দর্শনের সংঘাতই আজকের দূরত্বের মূল কারণ। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই দূরত্ব যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে ন্যাটোর ভবিষ্যৎ ও বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যেও বড় পরিবর্তন আসতে পারে। আর ইউরোপ এখন যুক্তরাষ্ট্রকে নীরব বার্তা দিচ্ছে-বন্ধুত্ব আছে, কিন্তু শর্তহীন আনুগত্য নয়। 

রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪