আন্তর্জাতিক ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধের চার সপ্তাহ পার হতে না হতেই লেবাননে আবারও বড় পরিসরে ইসরায়েলি হামলার মুখে পড়েছে দেশটির সাধারণ মানুষ। একের পর এক হামলা, জোরপূর্বক সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ এবং অব্যাহত সংঘাতে দেশটির বিপুল জনগোষ্ঠী চরম দুর্ভোগে পড়েছে।
লেবানন সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলের জোরপূর্বক উচ্ছেদ আদেশের ফলে দক্ষিণাঞ্চল ও বৈরুতের দক্ষিণ উপশহর দাহিয়েহ থেকে অন্তত ১২ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে, যা দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশ।
বাস্তুচ্যুতদের অনেকেই চরম হতাশা ও ক্লান্তির মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। যারা এখনও ঘরবাড়ি ছাড়েননি, তারাও প্রতিনিয়ত হামলার ভয়, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, ব্যবসা-বাণিজ্যের মন্দা এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের চাপে রয়েছেন।
দক্ষিণ লেবাননের টায়ার এলাকা থেকে সম্প্রতি বৈরুতে আশ্রয় নেওয়া এক ফিলিস্তিনি শিক্ষক সামিহা বলেন, এটা আমাদের জন্য নতুন কিছু নয়। আগের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা কিছুটা প্রস্তুত ছিলাম। কিন্তু এই পরিস্থিতি কতদিন চলবে, তা কেউ জানে না।
লেবাননে ইসরায়েলের নতুন করে হামলা জোরদার হয় ২ মার্চ, যখন ইরানের মিত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ ইসরায়েলি হামলার জবাব দেয়। এর আগে ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে কার্যত যুদ্ধবিরতি থাকলেও জাতিসংঘের হিসাবে সেই সময়ের মধ্যে ইসরায়েলের ১০ হাজারের বেশি যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে।
ইসরায়েল দক্ষিণ লেবানন দখল এবং সেখানে একটি তথাকথিত ‘নিরাপত্তা অঞ্চল’ গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে। একই সঙ্গে সীমান্তবর্তী বহু গ্রাম ধ্বংসের অভিযোগ উঠেছে।
এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সমাজের ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী—বিশেষ করে অভিবাসী শ্রমিক, শরণার্থী, দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি এবং চিকিৎসা-নির্ভর মানুষজন। অনেকেই প্রয়োজনীয় ওষুধ সংরক্ষণের জন্য ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধাও পাচ্ছেন না।
জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিল (UNFPA)-এর লেবানন প্রতিনিধি জানান, ২০২৪ সালের মানবিক সংকটের তুলনায় ২০২৬ সালের পরিস্থিতি অনেক বেশি ভয়াবহ। এবারের সংকটের মাত্রা, গতি এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা সবকিছুই একেবারেই ভিন্ন, বলেন তিনি।বিশেষ করে নারীরা সবচেয়ে বেশি ভুগছেন। গর্ভবতী নারীরা স্বাস্থ্যসেবা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন, অনেকেই চিকিৎসা সহায়তা পাচ্ছেন না।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ হামলায় এখন পর্যন্ত ১,০৯৪ জন নিহত এবং ৩,১১৯ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ৮১ জন নারী ও ১২১ জন শিশু রয়েছে।
শিশুদের ওপর এই সংঘাতের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মানবিক সংস্থাগুলোর কর্মকর্তারা। তারা আশঙ্কা করছেন, চলমান সহিংসতা দীর্ঘমেয়াদে শিশুদের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যে গভীর প্রভাব ফেলবে।
অন্যদিকে, দেশজুড়ে মানসিক স্বাস্থ্য সংকটও তীব্র আকার ধারণ করেছে। আত্মহত্যা প্রতিরোধ ও মানসিক সহায়তা হটলাইনে কলের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৪ সালে প্রতিদিন গড়ে ৩০টি কল এলেও বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ৫০টিতে দাঁড়িয়েছে।
লেবাননের ন্যাশনাল লাইফলাইন হটলাইনের এক কর্মকর্তা জানান, “মানুষ এখন টিকে থাকার লড়াইয়ে ব্যস্ত। কিন্তু এই দীর্ঘস্থায়ী সংকট তাদের মানসিকভাবে ভেঙে দিচ্ছে।”
বিশ্লেষকদের মতে, ২০১৯ সালের অর্থনৈতিক সংকট, কোভিড-১৯ মহামারি, বৈরুত বিস্ফোরণ এবং ধারাবাহিক সামরিক সংঘাত সব মিলিয়ে লেবাননের জনগণ এক অন্তহীন সংকটের মধ্যে বসবাস করছে।
রিপোর্টার্স২৪/এসসি