আন্তর্জাতিক ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি চীনের উৎপাদন খাতকে চাপে ফেলতে চেয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে ২০২৫ সালজুড়ে নানা অস্থিরতার পরও চীনের অনেক কারখানা এখনো টিকে থাকার শক্ত অবস্থান দেখাচ্ছে। চীনের একটি ইলেকট্রনিক্স প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান এজিলিয়ান টেকনোলজির অভিজ্ঞতা বলছে, উপযুক্ত পরিস্থিতি থাকলে চীনকে প্রতিস্থাপন করা সহজ নয়।
আগে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে এজিলিয়ানের অর্ডারই ছিল আয়ের অর্ধেকের বেশি। কিন্তু শুল্ক আরোপের পর এসব অর্ডার মাসের পর মাস স্থগিত থাকে। অনেক ক্রেতাই প্রতিষ্ঠানটিকে চীনের বাইরে উৎপাদন গড়ে তুলতে চাপ দেয়। ফলে কোম্পানিটি বড় অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে।
শুরুতে ট্রাম্পের শুল্কনীতি চীনা কোম্পানিগুলোর জন্য বিপর্যয় তৈরি করেছিল। ২০২৫ সালে চীনের সরকারি ক্রয় ব্যবস্থাপক সূচক বা পিএমআই বছরের বেশির ভাগ সময় সংকোচনের মধ্যে ছিল। ২০২৫ সালের এপ্রিল ছিল ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের পর সবচেয়ে দুর্বল মাস।
তবে পরে চীন পাল্টা পদক্ষেপ নেয়। যুক্তরাষ্ট্রের শিল্পখাতে প্রয়োজনীয় খনিজ ও ধাতুর রপ্তানিতে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে বেইজিং। এতে শুল্কের চাপ কিছুটা কমে আসে। মার্চে চীনের সরকারি পিএমআই এক বছরের মধ্যে সবচেয়ে দ্রুত হারে বাড়ে।
এতে চীনের উৎপাদন খাত আবার গতি পায়। এজিলিয়ান টেকনোলজির মতো প্রতিষ্ঠানগুলোও কিছুটা স্বস্তি ফিরে পায়। বছরে প্রায় ৩ কোটি ডলারের ব্যবসা করা এ প্রতিষ্ঠানটি এখন চীনে তাদের অবস্থানকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে, যদিও তারা উৎপাদন ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের শুল্কনীতি চীনের সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে দিতে পারেনি। বরং অনেক ক্ষেত্রে তা বাণিজ্য ও সরবরাহ চেইন নতুনভাবে গড়ে তুলতে বাধ্য করেছে। এ বিষয়ে ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের প্রধান অর্থনীতিবিদ নিক মারো বলেন, ট্রাম্পের শুল্ক চীনের উৎপাদন গতি থামাতে পারেনি; বরং বাণিজ্যিক সম্পর্ক ও সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় রদবদল ঘটিয়েছে।
সরকারি হিসাবে, ২০২৬ সালের প্রথম দুই মাসে চীনের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে ২১৩.৬ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের ১৬৯.২১ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় বেশি। ২০২৫ সালজুড়ে চীনের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত বেড়ে রেকর্ড ১.২ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রে চীনা রপ্তানি কমেছে। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে চীনের রপ্তানি ২০ শতাংশ কমে যায়। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের ওপর নির্ভরশীল অনেক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হে ইয়াদং দুই দেশকে আগের আলোচনায় যা ঠিক হয়েছে, তা বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছেন। বিশ্লেষকদের ধারণা, ট্রাম্পের সম্ভাব্য চীন সফর দুই দেশের মধ্যে চলমান উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত করতে পারে।
এদিকে শিল্পবিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিরল খনিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ চীনের বড় কৌশলগত শক্তি। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান রোল্যান্ড বার্গারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডেনিস ডেপো বলেন, বিরল খনিজ এখন বাণিজ্যের সবচেয়ে শক্তিশালী চাপের অস্ত্রগুলোর একটি।
এজিলিয়ানের কর্মকর্তারা এখন ট্রাম্পের শুল্কনীতিকে ভবিষ্যতের ঝুঁকি মোকাবিলার একটি সংকেত হিসেবে দেখছেন। ২০২৪ সালেই তারা আগাম প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছিলেন, যখন মার্কিন ক্রেতারা শুল্ক এড়াতে পণ্য উত্তর আমেরিকার গুদামে পাঠাতে বলেছিল। এতে গুদাম ভাড়াও হু হু করে বেড়ে যায়।
সব মিলিয়ে, ট্রাম্পের শুল্কনীতি চীনের উৎপাদন খাতে অস্থিরতা তৈরি করলেও দেশটির শিল্পভিত্তিকে পুরোপুরি দুর্বল করতে পারেনি।