আশিস গুপ্ত, নয়াদিল্লি : ইরানে গত প্রায় ৪০ দিন ধরে চলা যুদ্ধে মার্কিন বিমান বাহিনীর ব্যাপক উপস্থিতি এবং শক্তি প্রদর্শিত হয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’-র অধীনে ইরানের সামরিক লক্ষ্যবস্তু এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে ১৩,০০০ বার বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এই আধিপত্য সত্ত্বেও ইরানি বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় মার্কিন বাহিনী উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে দামী ড্রোন এমকিউ-৪সি ট্রাইটন, আওয়াকস এবং অত্যাধুনিক এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান।
এপ্রিলের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধে অন্তত ৩৯টি মার্কিন সামরিক বিমান ধ্বংস হয়েছে এবং আরও ১০টি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ওয়াশিংটন ডিসি-ভিত্তিক অত্যন্ত প্রভাবশালী ও বিশ্বখ্যাত থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক বা গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস)-এর হিসাব মতে, যুদ্ধের প্রথম ছয় দিনেই যুক্তরাষ্ট্রকে অন্তত ১.৪ বিলিয়ন ডলারের যুদ্ধকালীন ক্ষয়ক্ষতি ও অবকাঠামোগত লোকসান গুণতে হয়েছে। হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে গত ১ এপ্রিল থেকে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ২৪টি এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন হারিয়েছে।
সিবিএস নিউজের তথ্য অনুযায়ী, শুধুমাত্র এই ড্রোনগুলো হারানোর ফলেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৭২০ মিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে। মনুষ্যবিহীন যানের সংখ্যাতাত্ত্বিক পতন ছাড়াও অত্যাধুনিক চালকবাহী বিমানের ক্ষয়ক্ষতি মার্কিন বাহিনীর জন্য আর্থিক ও কৌশলগত উভয় দিক থেকেই বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই ক্ষয়ক্ষতি লিবিয়া বা ইরাক যুদ্ধের সময়কার রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে গেছে।
পারস্য উপসাগরে হারানো এমকিউ-৪সি ট্রাইটন ড্রোনের প্রতিটি ইউনিটের মূল্য প্রায় ২০০ থেকে ২৪০ মিলিয়ন ডলার, যা দুটি পঞ্চম প্রজন্মের এফ-৩৫ ফাইটার জেটের মূল্যের প্রায় সমান। গত ৯ এপ্রিল হরমুজ প্রণালীতে অভিযান চলাকালীন একটি ট্রাইটন ড্রোন জরুরি সংকেত পাঠানোর পর নিখোঁজ হয় এবং পরে মার্কিন নৌ কমান্ড এর ধ্বংসের বিষয়টি নিশ্চিত করে। রিপার ড্রোনের ক্ষেত্রেও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ব্যাপক। ২০০৭ সালে সার্ভিসে আসা প্রতিটি রিপার ড্রোনের মূল্য প্রায় ৩০ মিলিয়ন ডলার। এপ্রিলের শুরু পর্যন্ত মূলত ইরানের ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র বা গ্রাউন্ড স্ট্রাইকের মাধ্যমে ২৪টি রিপার ড্রোন ধ্বংস হয়েছে, যার ফলে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৭২০ মিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে।
বিশ্বের অন্যতম সেরা স্টিলথ ফাইটার হিসেবে পরিচিত এফ-৩৫ লাইটনিং-টু এই যুদ্ধে অপ্রত্যাশিত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। গত ১৯ মার্চ সিএনএন এক প্রতিবেদনে জানায় যে, মধ্যপ্রাচ্যের একটি মার্কিন বিমান ঘাঁটিতে একটি এফ-৩৫ জরুরি অবতরণে বাধ্য হয়, যা সম্ভবত ইরানের গোলন্দাজ বাহিনীর হামলার শিকার হয়েছিল। ১০ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো এফ-৩৫ শত্রুপক্ষের সরাসরি হামলার শিকার হলো।
এছাড়া ইরান গত ৩ এপ্রিল আরও একটি এফ-৩৫ ভূপাতিত করার দাবি করেছে, যদিও যুক্তরাষ্ট্র তা অস্বীকার করেছে। এফ-১৫ই স্ট্রাইক ঈগল জেটের ক্ষেত্রেও বড় ক্ষতি হয়েছে। ১ মার্চ কুয়েতের আকাশে ‘ফ্রেন্ডলি ফায়ার’-এ তিনটি এফ-১৫ই বিধ্বস্ত হয়। পরবর্তীতে ৩ এপ্রিল পশ্চিম ইরানে ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আঘাতে চতুর্থ স্ট্রাইক ঈগলটি ভূপাতিত হয়। এই চারটি জেট হারানোর ফলে সরাসরি আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলার।
আকাশে জ্বালানি সরবরাহের জন্য ব্যবহৃত কেসি-১৩৫ স্ট্র্যাটোট্যাঙ্কার বিমানও রেহাই পায়নি। ১২ মার্চ ইরাকের আকাশে দুটি ট্যাঙ্কার বিমানের সংঘর্ষে একটি বিধ্বস্ত হয় এবং অপরটি তেল আবিবে জরুরি অবতরণ করে। এছাড়া সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমান ঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত আটটি কেসি-১৩৫ ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। প্রতিটি ট্যাঙ্কার বিমানের বর্তমান বাজারমূল্য বা এর বিকল্পের ব্যয় প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ডলার। একই দিনে একটি এ-১০ ওয়ার্টহগ গ্রাউন্ড-অ্যাটাক বিমানও হরমুজ প্রণালীর কাছে বিধ্বস্ত হয়েছে। যদিও এটি একটি পুরোনো মডেল, তবুও যুদ্ধক্ষেত্রে এর অনুপস্থিতি মার্কিন পদাতিক বাহিনীকে সমর্থনের ক্ষেত্রে বাড়তি চাপের সৃষ্টি করেছে। ২৭ মার্চ প্রিন্স সুলতান ঘাঁটিতে হামলার সময় অন্তত একটি ই-৩ সেন্ট্রি বা ‘ফ্লাইং রাডার’ ধ্বংস হয়েছে, যার প্রতিটি ইউনিটের বর্তমান সমতুল্য মূল্য প্রায় ৭০০ মিলিয়ন ডলার।
সবশেষে, ভূপাতিত এফ-১৫ই জেটের ক্রুদের উদ্ধারে পরিচালিত বিশেষ অভিযানেও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তেহরানের দক্ষিণে দুর্গম এলাকায় উদ্ধারকারী দুটি এমসি-১৩০জে কমান্ডো-টু বিমান শত্রুহস্তে পড়া এড়াতে মার্কিন বিশেষ বাহিনী নিজেরাই ধ্বংস করে দেয়। একেকটি এমসি-১৩০-এর দাম প্রায় ১২০ মিলিয়ন ডলার। একই অভিযানে চারটি এএইচ-৬ লিটল বার্ড হেলিকপ্টারও ধ্বংস করা হয়।
সব মিলিয়ে এই বিশাল ক্ষয়ক্ষতি একটি রূঢ় বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে—আকাশপথে প্রবল আধিপত্য থাকলেও প্রতিপক্ষের আধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং কৌশলগত প্রতিরোধের মুখে কোনো শক্তিই অপরাজেয় নয়। ইরানের বহুমুখী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও উচ্চমূল্যের লক্ষ্যবস্তুকে আঘাত করার সক্ষমতা মার্কিন সামরিক অভিযানের ওপর এক আকাশচুম্বী আর্থিক ও কৌশলগত বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে।
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব