শেরপুর প্রতিনিধি: শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার সীমান্তবর্তী নয়াবিল ইউনিয়নের বাতকুচি এলাকার বাসিন্দা নুরজাহান বেগম (৭৮)। প্রায় ৪৮ বছর ধরে নিভৃত পাহাড়ি অঞ্চলের নারীদের নিরাপদ ও স্বাভাবিকভাবে সন্তান প্রসবে সহায়তা করে আসছেন তিনি। দীর্ঘদিনের এই সেবার স্বীকৃতিস্বরূপ এলাকায় তিনি ‘জননী’ নামেই পরিচিত।
বয়সের ভারে এখন কিছুটা কমেছে তাঁর ব্যস্ততা। তবু প্রয়োজন হলেই এখনো ছুটে যান প্রসূতির ডাকে দিনে বা গভীর রাতেও। নুরজাহান বলেন, “এখন বয়স অইয়া গেছে, তবু মানুষ ডাহে। রাইত-রিবাইতে আমারে নিবার লাগি আহে। আমিও যাই। কামডা ত ভালা মানুষের উপকার অয়, মানুষ খুশি অয়।”
প্রায় ৫৮ বছর আগে বিয়ের পর এই এলাকায় আসেন নুরজাহান। শুরুতে এক প্রতিবেশীর সঙ্গে বাড়ি বাড়ি গিয়ে দেখে দেখে শিখে নেন ধাত্রীসেবার কাজ। পরে টাঙ্গাইলের মধুপুরে ব্র্যাকের সহায়তায় দুই দফায় ধাত্রীসেবা বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেন তিনি। অভিজ্ঞতার পাশাপাশি এই প্রশিক্ষণ তাঁকে আরও দক্ষ করে তোলে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এখন তিনি এলাকার অন্য নারীদেরও ধাত্রীর কাজ শিখিয়ে দিয়েছেন।
এ পর্যন্ত প্রায় আড়াই হাজারের বেশি নারীর সন্তান প্রসবে সহায়তা করেছেন নুরজাহান বেগম। নিজের পরিবারেও তাঁর এই অভিজ্ঞতার ছাপ রয়েছে ছেলে ও মেয়ের ঘরের ছয় নাতি-নাতনির জন্মও তাঁর হাত ধরেই হয়েছে।
প্রায় এক যুগ আগে স্বামী মারা গেছেন তাঁর। তবে জীবনের এই দীর্ঘ সময়ে মানুষের সেবাকেই তিনি বড় করে দেখেছেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ধাত্রীসেবা দিতে গিয়ে তিনি বা এলাকার অন্য ধাত্রীরা কোনো অর্থ নেন না।
গ্রামে একটি প্রচলিত রীতি রয়েছে,নবজাতককে প্রথমবার আঁতুড় ঘর থেকে বের করার দিন পরিবারটি সাধ্যমতো দাওয়াতের আয়োজন করে। সেখানে ধাত্রীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। অনেকেই খুশি হয়ে তাঁকে নতুন শাড়ি উপহার দেন। এই রীতি এখনো প্রচলিত রয়েছে।
নুরজাহান বলেন, একসময় গ্রামে সন্তান প্রসবে ধাত্রীরাই ছিলেন প্রধান ভরসা। তখন যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত না থাকায় উপজেলা বা শহরে যাওয়ার সুযোগও কম ছিল। বর্তমানে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে প্রসূতি নারীরা নানা পরামর্শ পাচ্ছেন। ফলে অনেকেই এখন হাসপাতালে গিয়ে সন্তান প্রসব করছেন। তবে এখনো অনেক পরিবার ধাত্রীর ওপর আস্থা রেখে ঘরেই সন্তান প্রসব করান।
স্থানীয় বাসিন্দা রবিউল আলম (৫৮) বলেন, “এক ঝড়ের রাতে হঠাৎ আমার স্ত্রীর ব্যথা শুরু হয়। সেই রাতে নুরজাহান খালার হাত ধরেই আমার মেয়েটা পৃথিবীতে আসে। আমার তিনটি সন্তানের প্রসবেই তিনি সহায়তা করেছেন। তিনি একজন সত্যিকারের ‘জননী’।”
নুরজাহান বেগমের নাতি হারুন অর রশিদ বলেন, “আমি ও আমার ভাই-বোনেরা নানীর হাত ধরেই পৃথিবীর আলো দেখেছি। তাঁর দীর্ঘদিনের এই মানবিক সেবার জন্য পাহাড়ি জনপদের মানুষের কাছে তিনি এক অনন্য আস্থার নাম।”
রিপোর্টার্স২৪/মিতু