মেহেরপুর প্রতিনিধি: মেহেরপুরে অনলাইন জুয়া ও ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে অবৈধ ডলার লেনদেন চক্রের এক বিশাল নেটওয়ার্কের সন্ধান পেয়েছে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। শুক্রবার রাতভর মেহেরপুর সদর ও গাংনী থানা এলাকার বিভিন্ন পয়েন্টে সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে এই চক্রের মূল হোতাসহ চার সক্রিয় সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন, রাফসান জনি রিপন (৩২), ফাহাদ হাসান জুনায়েদ (১৯), বায়েজিদ ডালিম (৩০) ও রকিবুল ইসলাম (৩৫)। তাদের কাছ থেকে ৩৭টি সচল ই-মেইল আইডি, ২৯টি অনলাইন জুয়ার অ্যাকাউন্ট, বেশ কয়েকটি আধুনিক স্মার্টফোন এবং জনপ্রিয় ক্রিপ্টোকারেন্সি প্ল্যাটফর্ম ‘বাইনান্স’ (Binance)-এর মাধ্যমে লাখ লাখ টাকার অবৈধ লেনদেনের তথ্য উদ্ধার করা হয়েছে।
শনিবার (১৬ মে) বিকাল ৫টার দিকে আদালতের মাধ্যমে আসামিদের কারাগারে পাঠানো হয়।
জেলা গোয়েন্দা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) ওসি মুহাদ্দিদ মোর্শেদ চৌধুরীর নেতৃত্বে শুক্রবার রাতভর এই বিশেষ অভিযান পরিচালিত হয়। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ডিবির একটি দল প্রথমে সদর উপজেলার চাঁদবিল এলাকায় অভিযান চালিয়ে বায়েজিদ ডালিমকে আটক করে।
এ সময় তার কাছ থেকে একটি ‘Galaxy Z Fold5’ মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়। ফোনটি তল্লাশি করে বাইনান্সের মাধ্যমে অবৈধ ডলার কেনাবেচা এবং অনলাইন জুয়ার এজেন্ট হিসেবে কাজ করার তথ্য পাওয়া যায়। একই সঙ্গে তার ফোনে অনলাইন জুয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চারটি ই-মেইল আইডির তথ্যও মেলে।
পরে বায়েজিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মুজিবনগরের পুরন্দরপুর গ্রাম থেকে রকিবুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার কাছ থেকে উদ্ধারকৃত ওপ্পো ও ভিভো স্মার্টফোন দুটি পর্যালোচনা করে অনলাইন জুয়া পরিচালনা ও অবৈধ ডলার লেনদেনের তথ্য পায় ডিবি।
এদিকে ডিবির আরেকটি দল গাড়াডোব এলাকা থেকে রাফসান জনি রিপনকে আটক করে। তার কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় একটি ‘Redmi Note 14 Pro’ মোবাইল ফোন। প্রাথমিক যাচাইয়ে ফোনটিতে ৩৭টি মেইল আইডি এবং ২৯টি অনলাইন জুয়ার সক্রিয় অ্যাকাউন্ট পাওয়া যায়, যা দেখে খোদ গোয়েন্দা কর্মকর্তারাও চমকে যান।
পরবর্তী সময়ে রাফসানের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আমঝুপি এলাকা থেকে ফাহাদ হাসান জুনায়েদকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার ব্যবহৃত ওপ্পো ফোনে সাতটি ই-মেইল আইডিসহ অনলাইন জুয়ার মার্চেন্ট অ্যাকাউন্টের তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃতরা স্বীকার করেছে যে, তারা নিজেদের ও কৌশলে অন্যের নামে নিবন্ধিত সিম ব্যবহার করে ইন্টারনেটের মাধ্যমে এই অনলাইন জুয়া পরিচালনা করত। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়া বাইনান্স অ্যাপ ব্যবহার করে অবৈধ ই-ট্রানজেকশন বা মানি লন্ডারিং চালিয়ে আসছিল।
ডিবি পুলিশের দাবি, এই চক্রের কারণে গ্রামের অনেক বেকার যুবক ও সাধারণ মানুষ স্বল্প সময়ে লাভের আশায় অর্থ হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন। অনেকেই হতাশাগ্রস্ত হয়ে মাদকাসক্তি ও বিভিন্ন সামাজিক অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন।
এ ঘটনায় মেহেরপুর সদর ও গাংনী থানায় সদ্য প্রণীত সাইবার সুরক্ষা আইন-২০২৬ এ পৃথক মামলা দায়ের করা হয়েছে।
ডিবির ওসি মুহাদ্দিদ মোর্শেদ চৌধুরী ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, অনলাইন জুয়া ও অবৈধ ডলার লেনদেনকে কেন্দ্র করে এই সংঘবদ্ধ চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে মেহেরপুরে সক্রিয় ছিল।
গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে মামলা দায়েরের পর আদালতের মাধ্যমে কারাগারে তাদের পাঠানো হয়েছে। যুবসমাজকে এই সর্বনাশা জুয়ার হাত থেকে রক্ষা করতে জেলা জুড়ে ডিবির এই জিরো টলারেন্স অভিযান অব্যাহত থাকবে।
রিপোর্টার্স২৪/মিতু