স্টাফ রিপোর্টার: কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার বুড়াবুড়ি সাতভিটা এলাকার আশিকুর রহমানকে (২৪) রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘জুলাই শহীদ’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। পরিবার পেয়েছে ৩০ লাখ টাকার অনুদানও। তবে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, আশিকুর জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না; বরং তিনি দীর্ঘদিন ধরে মস্তিষ্কে সংক্রমণজনিত জটিলতায় ভুগছিলেন এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।
সরেজমিন অনুসন্ধান, চিকিৎসা নথি, মৃত্যুসনদ ও স্থানীয় আন্দোলনকারীদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, আশিকুর রহমান ২০২৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর মূলত ব্রেন ইনফেকশনজনিত জটিলতায় মারা যান। অথচ মৃত্যুর পর তাঁকে ‘জুলাই শহীদ’ হিসেবে গেজেটভুক্ত করা হয় এবং পরে দায়ের করা হত্যা মামলায় ১০৪ জনকে আসামি করা হয়, যাদের মধ্যে তিনজন সাংবাদিকও রয়েছেন।
চিকিৎসা নথিতে ব্রেন ইনফেকশনের তথ্য
রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ছাড়পত্র অনুযায়ী, আশিকুর রহমান ২০২৪ সালের ১২ আগস্ট থেকে ১৮ আগস্ট পর্যন্ত মেডিসিন ইউনিট-১ এ চিকিৎসাধীন ছিলেন। সেখানে তাঁর রোগ হিসেবে উল্লেখ করা হয়— সেপসিস উইথ ফোকাল সিজার (এইচ/ও এনসেফালাইটিস)। অর্থাৎ তিনি গুরুতর সংক্রমণ ও ব্রেন ইনফেকশনে আক্রান্ত ছিলেন।
চিকিৎসা নথিতে কোথাও মাথায় আঘাত বা আন্দোলনে আহত হওয়ার কোনো তথ্য উল্লেখ ছিল না। পরে তাঁকে ঢাকার বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (তৎকালীন বিএসএমএমইউ) স্থানান্তর করা হয়।
তবে মৃত্যুসনদে হঠাৎ করেই যুক্ত হয়— অ্যালেজড হিস্ট্রি অব হেড ইনজুরি ডিউরিং স্টুডেন্ট প্রোটেস্ট। যদিও একইসঙ্গে সেখানে সেপটিক শক, অ্যাকিউট কিডনি ইনজুরি ও মেনিনগোএনসেফালাইটিসের কথাও উল্লেখ করা হয়।
‘হেড ইনজুরি’র প্রমাণ মেলেনি: চিকিৎসক
মৃত্যুসনদে স্বাক্ষরকারী চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. মন্তোষ কুমার মণ্ডল গণমাধ্যমকে বলেন, “আশিক মূলত সেপটিক শকে মারা গেছে। আমরা তার শরীরে কোনো হেড ইনজুরি পাইনি। এমআরআই রিপোর্টেও মাথায় আঘাতের প্রমাণ ছিল না।”
তাহলে মৃত্যুসনদে ‘হেড ইনজুরি’ কেন লেখা হয়েছিল— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “তৎকালীন পরিস্থিতিতে কিছু শিক্ষার্থী দাবি করেছিল, এটি আন্দোলনে আহত হওয়ার ঘটনা। সে কারণেই ‘অ্যালেজড’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়।”
তবে বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সরকারি মৃত্যুসনদে এ ধরনের তথ্য যুক্ত করা প্রশ্নবিদ্ধ এবং এর পেছনে চাপ বা প্রভাব থাকতে পারে।
স্থানীয় সমন্বয়কদের দাবি— আন্দোলনে ছিলেন না আশিক
কুড়িগ্রাম বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের স্থানীয় সমন্বয়করা জানিয়েছেন, আশিকুর রহমান আন্দোলনে অংশ নেননি।
জেলা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক লোকমান হোসেন লিমন বলেন, “আশিক আন্দোলনেই ছিল না। তার ছোট ভাই আন্দোলনে ছিল, কিন্তু আশিক তখন হাসপাতালে ভর্তি ছিল। সিসিটিভি ফুটেজেও তার উপস্থিতি পাওয়া যায়নি।”
তিনি আরও বলেন, পরিবারটি আগে থেকেই জানত আশিক ব্রেন টিউমার বা ব্রেন ইনফেকশনে আক্রান্ত। ঢাকায় গিয়ে ছাত্র পরিচয় দিয়ে চিকিৎসা সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল।
আরেক সমন্বয়ক কে এম নাজমুস সাকিব শাহীর ভাষ্য, আশিককে হত্যা করা হয়নি। পরিবার ও একটি মহল তাকে জুলাই শহীদ বানিয়ে মামলা করেছে।
হত্যা মামলায় সাংবাদিকদের নাম
আশিকুর রহমানের মৃত্যুর প্রায় এক মাস ১০ দিন পর কুড়িগ্রাম সদর থানায় একটি হত্যা মামলা করা হয়। মামলায় ১০৪ জনকে আসামি করা হয়, যাদের মধ্যে রয়েছেন তিন সাংবাদিক।
তারা হলেন— কালের কণ্ঠের জেলা প্রতিনিধি আব্দুল খালেক ফারুক, নিউজ২৪ প্রতিনিধি হুমায়ুন কবির সূর্য এবং এটিএন বাংলা ও এটিএন নিউজের প্রতিনিধি ইউসুফ আলমগীর।
সাংবাদিক হুমায়ুন কবির সূর্য বলেন, আন্দোলনের সময় সন্তানদের আন্দোলনে পাঠিয়ে আমি নিজে সাংবাদিকতার দায়িত্ব পালন করেছি। অথচ ব্যক্তিগত আক্রোশে আমাদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দেওয়া হয়েছে।
আব্দুল খালেক ফারুক বলেন, ৪০ বছরের সাংবাদিকতা জীবনে এমন অপমানজনক পরিস্থিতিতে পড়িনি।
গেজেটভুক্তির প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন
২০২৫ সালের ১৫ জানুয়ারি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত জুলাই শহীদদের গেজেটে ২১৭ নম্বরে আশিকুর রহমানের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
এ বিষয়ে জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সারজিস আলম বলেন, এক হাজারের বেশি শহীদের তালিকায় দু-একটি ভুল থাকতে পারে। যদি কেউ প্রকৃতপক্ষে আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত না হয়, তাহলে যাচাই করে তার নাম বাতিল করা উচিত।
বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়েও ‘জুলাই শহীদ’
অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, লালমনিরহাটে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যাওয়া আজিজুল ইসলামকেও ‘জুলাই শহীদ’ হিসেবে গেজেটভুক্ত করা হয়েছে। যদিও নিহতের পরিবার জানিয়েছে, এটি ছিল দুর্ঘটনা এবং তারা কোনো মামলা করেনি।
সরকারের বক্তব্য
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. মাসুদ আলম বলেন, ভুলবশত কেউ তালিকাভুক্ত হয়ে থাকলে তা সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। শুধুমাত্র প্রকৃত শহীদ ও যোদ্ধারাই রাষ্ট্রীয় সুবিধা পাবেন।
তিনি জানান, জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বাধীন কমিটির যাচাই-বাছাইয়ের ভিত্তিতেই শহীদদের তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে।
রিপোর্টার্স২৪/বাবি