স্টাফ রিপোর্টার: কয়েক সপ্তাহ আগেও রাজধানীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে ছিল তীব্র ভিড়। মোটরসাইকেল, ব্যক্তিগত গাড়ি ও পিকআপভ্যান নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো চালকদের। তবে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর বদলে গেছে সেই চিত্র। এখন রাজধানীর অধিকাংশ পাম্পেই নেই দীর্ঘ সারি বা বাড়তি চাপ। স্বাভাবিক ছন্দে ফিরেছে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের অস্থিরতা তৈরি হলে দেশের বাজারেও এর প্রভাব পড়ে। সরবরাহ ঘাটতির আশঙ্কায় অনেকেই অতিরিক্ত তেল কিনে মজুত করতে শুরু করেন। এতে বিভিন্ন এলাকায় কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়। তবে এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে সরকার জ্বালানির দাম বাড়ানোর পর পরিস্থিতির পরিবর্তন দেখা যায়।
রাজধানীর মিরপুর, মোহাম্মদপুর, তেজগাঁও ও যাত্রাবাড়ীর কয়েকটি ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা গেছে, বর্তমানে জ্বালানি নিতে বাড়তি অপেক্ষা করতে হচ্ছে না। স্বল্প সময়েই তেল নিয়ে গন্তব্যে ছুটছেন চালকরা।
মিরপুরের স্যাম অ্যাসোসিয়েট লিমিটেডের ক্যাশিয়ার শরিফ আহমেদ বলেন, “এখন ডিপো থেকে চাহিদা অনুযায়ী তেল পাওয়া যাচ্ছে। আগে যেখানে দিনে ১০ হাজার লিটার তেল লাগত, সংকটের সময় সেই চাহিদা বেড়ে ২০ হাজার লিটারে পৌঁছায়। কিন্তু ডিপো থেকেও পর্যাপ্ত সরবরাহ পাওয়া যেত না। ফলে পাম্পে দীর্ঘ লাইন তৈরি হতো।”
একই পাম্পের মিটারম্যান রিফাত জানান, সংকটের সময় অনেক গ্রাহক ফুল ট্যাংক তেল নিয়ে মজুত করতেন। দাম বাড়ার পর এখন প্রয়োজন অনুযায়ী তেল নিচ্ছেন সবাই।
প্রাইভেটকার চালক কাজী মুবিন বলেন, তেলের দাম বাড়ার পর এখন আর লাইনে দাঁড়াতে হয় না। তবে আমার মনে হয়, আগে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়েছিল।
রাইডশেয়ার চালক সোহেল রানা জানান, আগে প্রতিদিন ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা লাইনে অপেক্ষা করতে হতো। এখন ৫ থেকে ১০ মিনিটেই তেল পাওয়া যাচ্ছে। তবে দাম বাড়ায় খরচ বেড়ে গেছে।
বাইকচালক পারভেজ মোশারফ বলেন, এখন যার যতটুকু প্রয়োজন ততটুকুই নিচ্ছে। ফলে পাম্পে চাপ কমেছে। দুই মিনিটেই তেল নিয়ে চলে যাওয়া যায়।
গত ১৮ এপ্রিল সরকার ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়ায়। নতুন দামে ডিজেলের মূল্য নির্ধারণ করা হয় ১১৫ টাকা, অকটেন ১৪০ টাকা এবং পেট্রোল ১৩৫ টাকা।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জানিয়েছে, দাম সমন্বয়ের পর সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি অবৈধ মজুত ঠেকাতে নজরদারিও জোরদার করা হয়েছে। এতে বাজারে কৃত্রিম সংকট অনেকটাই কমেছে।
তবে তেলের দাম বাড়ায় বাড়তি চাপ পড়েছে সাধারণ মানুষের ওপর। তেজগাঁওয়ের বাসচালক কামাল বলেন, লাইন কমেছে ঠিকই, কিন্তু আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলানো কঠিন হয়ে গেছে। তেলের দাম বাড়লে পরিবহন খরচ বাড়ে, তার প্রভাব পড়ে নিত্যপণ্যের দামেও।
সংকট কমার পেছনে যেসব কারণ
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু দাম বাড়ানোর কারণেই সংকট কমেনি; এর পেছনে আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি, যুদ্ধাবস্থার কিছুটা শিথিলতা এবং সরবরাহ ব্যবস্থাপনার উন্নয়নও ভূমিকা রেখেছে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা ও ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির প্রকৌশল অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কিছুটা কমেছে এবং হরমুজ প্রণালী ঘিরে অনিশ্চয়তাও কমেছে। ফলে সরকার নতুন করে তেল আমদানির সুযোগ পেয়েছে এবং সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।
তিনি বলেন, শুধু দেশের বাজারে দাম বাড়িয়ে সংকটের সমাধান করা সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম অত্যধিক বেড়ে গেলে প্রয়োজনীয় ডলার জোগাড় করাও কঠিন হয়ে পড়ে। তখন সরকার বাধ্য হয়ে আমদানি কমিয়ে দেয়।
তার মতে, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে দেশের জ্বালানি মজুতও কমে প্রায় ৩০ দিনের পর্যায়ে নেমে এসেছিল। সাধারণত দেশে ৪৫ দিনের জ্বালানি মজুত রাখার সক্ষমতা রয়েছে। সীমিত মজুত দীর্ঘ সময় ধরে চালাতে গিয়ে সরকার সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করেছে বলেও মনে করেন তিনি।
ড. শামসুল আলম আরও বলেন, আমদানি সীমিত ছিল, পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে কালোবাজারিও হয়েছে। সব মিলিয়ে সংকট আরও প্রকট হয়েছিল। এখন আন্তর্জাতিক বাজার কিছুটা স্থিতিশীল হওয়ায় পরিস্থিতিও উন্নত হয়েছে।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাত শুরু হলে আন্তর্জাতিক বাজারে আবারও তেলের দাম বেড়ে যেতে পারে। তখন বাংলাদেশকে পুনরায় ডলার সংকট, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি ও সরবরাহ সংকটের ঝুঁকিতে পড়তে হতে পারে।