আন্তর্জাতিক ডেস্ক: জি-৭ সম্মেলনের প্রাক্কালে বিশ্বের ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোর একক আধিপত্যের পরিবর্তে মধ্যম শক্তিধর দেশগুলোর মধ্যে নতুন ধরনের সহযোগিতামূলক বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি।
শনিবার (১৩ জুন) আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে ট্রিনিটি কলেজে ‘ডি শাস্তেলেইন পাবলিক লেকচার’ সিরিজের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, বিশ্ব বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। এ সময় তিনি তথাকথিত ‘মিডল পাওয়ার’ বা মধ্যম শক্তিধর দেশগুলোর নেতাদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে আয়ারল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী মাইকেল মার্টিনও উপস্থিত ছিলেন।
কার্নি বলেন, কানাডা ও আয়ারল্যান্ড এখন একটি বৈশ্বিক ভাঙনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, এটি কোনো শান্তিপূর্ণ রূপান্তর নয়। শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী নিয়মভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে। বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়েছে। যে অর্থনৈতিক সংযুক্তি থেকে আমরা উপকৃত হয়েছি, সেটিকেই এখন অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। বহু দশক ধরে নির্ভর করা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থাও হুমকির মুখে।
তবে তিনি কোনো নির্দিষ্ট দেশের নাম উল্লেখ করেননি কিংবা কারও বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগও তোলেননি। যদিও তার বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফেরার পর থেকে কানাডার ওপর নানা ধরনের চাপ সৃষ্টি করে আসছেন। ট্রাম্প প্রকাশ্যে কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘৫১তম অঙ্গরাজ্য’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলেছেন। পাশাপাশি শুল্ক আরোপের মাধ্যমে বাণিজ্য ও অভিবাসন ইস্যুতেও কানাডার ওপর চাপ বাড়িয়েছেন।
আগামী ১৫ থেকে ১৭ জুন ফ্রান্সের এভিয়ান-লে-ব্যাঁ শহরে অনুষ্ঠিতব্য জি-৭ সম্মেলনে কার্নি ও ট্রাম্প উভয়ের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
কার্নির ‘মিডল পাওয়ার’ ধারণা ইউরোপীয় ইউনিয়নের কয়েকটি সদস্য দেশের মধ্যেও ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমাতে এবং বর্তমান উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে বিকল্প জোট গড়ে তুলতে আগ্রহী ইউরোপীয় দেশগুলো তার প্রস্তাবে আগ্রহ দেখাচ্ছে।
ইউরোপীয় অংশীদারদের উদ্দেশে কার্নি বলেন, কানাডা, আয়ারল্যান্ড ও ইউরোপ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি নিকটবর্তী হুমকির মুখে। কিন্তু এই পরিবর্তনের সময়েও আমরা ইতিবাচক শক্তি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারি।
এর আগে চলতি বছরের শুরুতে সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে দেওয়া এক বক্তৃতায় প্রথমবারের মতো তিনি ‘মধ্যম শক্তিধর দেশগুলোর নতুন বিশ্বব্যবস্থা’ ধারণা তুলে ধরেন। সেখানে তিনি আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে ছোট দেশগুলোর ওপর চাপ প্রয়োগের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের সমালোচনা করেন।
সেই বক্তব্যের পর ট্রাম্প প্রকাশ্যে কার্নির সমালোচনা করেন। দাভোসে দেওয়া এক বক্তব্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, কানাডা আমাদের কাছ থেকে অনেক সুবিধা পায়। তাদের কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত। কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের কারণেই টিকে আছে। মনে রেখো, মার্ক।
তবে শনিবারের বক্তব্যেও নিজের অবস্থানে অনড় ছিলেন কার্নি। তিনি বলেন, কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সম্মিলিত শক্তি বিশ্বের বড় অর্থনীতিগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা রাখে।
তার ভাষায়, একসঙ্গে কাজ করার ক্ষমতার কারণেই আমরা শক্তিশালী। আমাদের সম্মিলিত জনসংখ্যা যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিগুণেরও বেশি। আর আমাদের সম্মিলিত প্রতিরক্ষা বাজেট চীনের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
২০২৫ সালে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকেই ইউরোপের সঙ্গে কানাডার সম্পর্ক আরও জোরদারের উদ্যোগ নিয়েছেন কার্নি। মে মাসে তিনি প্রথম কোনো অ-ইউরোপীয় নেতা হিসেবে ইউরোপিয়ান পলিটিক্যাল কমিউনিটি সামিটে অংশ নেন। এছাড়া ইউরোপের ‘সেইফ ইনস্ট্রুমেন্ট’ প্রতিরক্ষা ঋণ কর্মসূচিতে কানাডার অন্তর্ভুক্তিও তার সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
শনিবার তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নকে ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের আহ্বানও জানান। তার মতে, এ ধরনের সহযোগিতা দেড়শ কোটির বেশি মানুষের একটি বৃহৎ বাণিজ্য জোট গড়ে তুলতে পারে।
কার্নি বলেন, যেসব দেশ নিজেদের সক্ষমতায় বিনিয়োগ করবে এবং সমমনা মিত্রদের সঙ্গে অংশীদারিত্ব গড়ে তুলবে, তারা নিজেদের শক্তিকে বহুগুণ বাড়িয়ে তুলতে পারবে।
জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক সংঘাতের মতো অভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কানাডা ও ইউরোপের মধ্যে ঐতিহাসিক সম্পর্ক ও অভিন্ন মূল্যবোধকে কাজে লাগানোরও আহ্বান জানান তিনি।
তার ভাষায়, আমরা একটি অনন্য ট্রান্স-আটলান্টিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলেছি। আমাদের বিশ্বাস, সংযুক্ত থাকলেই আমরা আরও শক্তিশালী হই, সমৃদ্ধি ভাগাভাগি করলেই তা বাড়ে এবং আমরা সবাই আমাদের ভূমির অভিভাবক।
রিপোর্টার্স২৪/বাবি