| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

বাগেরহাটে ইটের বিকল্প পরিবেশবান্ধব কংক্রিট ব্লক, বদলে যাচ্ছে নির্মাণের ধারা

reporter
  • আপডেট টাইম: জুন ২৮, ২০২৬ ইং | ১৫:৫৩:৪৮:অপরাহ্ন  |  ১৭৪৭ বার পঠিত
বাগেরহাটে ইটের বিকল্প পরিবেশবান্ধব কংক্রিট ব্লক, বদলে যাচ্ছে নির্মাণের ধারা

সোহাগ হাওলাদার, বাগেরহাট প্রতিনিধি : কৃষিজমির উর্বর মাটি কেটে পোড়া ইট তৈরির প্রচলিত ধারা থেকে বেরিয়ে এসে বাগেরহাটে দ্রুত জনপ্রিয়তা পাচ্ছে পরিবেশবান্ধব কংক্রিট ব্লক। গ্রামীণ সড়ক নির্মাণে বিটুমিনাস কার্পেটিং ও মাটিপোড়া ইটের পরিবর্তে ব্যবহার করা হচ্ছে ইউনিব্লক। পাশাপাশি হলো ব্লক, সলিড ব্লক, এএসি ব্লক, ডিজাইন ব্লক, ইকো-ব্রিক ও পার্কিং টাইলস দিয়ে নির্মিত হচ্ছে আবাসিক ভবন, মসজিদ, লাইব্রেরি এবং বিভিন্ন বাণিজ্যিক স্থাপনা। টেকসই, ব্যয় সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব হওয়ায় এসব নির্মাণসামগ্রীর ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে।

জেলার বিভিন্ন উদ্যোক্তার কারখানায় প্রতিদিন উৎপাদিত হচ্ছে হাজার হাজার কংক্রিট ব্লক। উদ্যোক্তা আবু সাইদ, আল মামুন, ফিরোজ আহমেদ, জিয়াউল হক, কামাল হোসেন ও জিয়াউর রহমানের কারখানায় ফ্লাই অ্যাশ (কয়লার ছাই), পাথরের খোয়া ও মোটা বালু দিয়ে তৈরি হচ্ছে এসব ব্লক। পোড়া ইটের কার্যকর বিকল্প হিসেবে এগুলো এখন বিভিন্ন নির্মাণকাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।

পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)-এর সহযোগিতায় কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (কোডেক) বাস্তবায়ন করছে সাসটেইনেবল মাইক্রোএন্টারপ্রাইজ অ্যান্ড রেজিলিয়েন্ট ট্রান্সফরমেশন (SMART) প্রকল্প। এ প্রকল্পের আওতায় বাগেরহাটের বিভিন্ন উপজেলায় অন্তত ২৪ জন উদ্যোক্তা পরিবেশবান্ধব নির্মাণসামগ্রী উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। প্রশিক্ষণ, কারিগরি সহায়তা, টেস্টিং ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন কার্যক্রমের মাধ্যমে এ খাতে নতুন বিনিয়োগের পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি হয়েছে।

বর্তমানে হলো ব্লক, ইকো-ব্রিক, ইউনিব্লক ও পার্কিং টাইলস ব্যবহার করে নির্মাণ করা হচ্ছে বাড়িঘর, বাণিজ্যিক স্থাপনা এবং গ্রামীণ সড়ক। কম খরচে দ্রুত নির্মাণ, অধিক স্থায়িত্ব এবং সহজ রক্ষণাবেক্ষণের কারণে সাধারণ মানুষের কাছেও এসব নির্মাণসামগ্রীর গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে।

এরই মধ্যে বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলার তেলেপুকুর এলাকায় নির্মিত হয়েছে একটি পরিবেশবান্ধব আদর্শ মসজিদ। কোডেক ও পিকেএসএফ-এর সহযোগিতায় নির্মিত প্রায় ১ হাজার ৪৩৫ বর্গফুট আয়তনের এ মসজিদে প্রচলিত পোড়া ইটের পরিবর্তে ব্যবহার করা হয়েছে কংক্রিট হলো ব্লক, সলিড ব্লক, স্টার ব্লক ও ইউনিপেভার। এখানে একসঙ্গে প্রায় ২০০ মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন।

অন্যদিকে ইউনিব্লক দিয়ে নির্মিত গ্রামীণ সড়ক ব্যবহার করে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন এলাকাবাসী ও যানবাহনের চালকেরা। তাদের মতে, এসব সড়ক যেমন মজবুত ও দৃষ্টিনন্দন, তেমনি বর্ষাকালেও কাদা জমে না এবং চলাচল অনেক সহজ হয়।

প্রকল্পের ব্যবস্থাপক লোকমান হোসেন বলেন, পরিবেশবান্ধব নির্মাণসামগ্রীর ব্যবহার বাড়াতে আমরা উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ, কারিগরি সহায়তা ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা দিয়ে আসছি। এর ফলে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছে এবং পরিবেশবান্ধব নির্মাণ প্রযুক্তির প্রসার ঘটছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পোড়া ইট তৈরিতে বিপুল পরিমাণ কৃষিজমির উর্বর মাটি ব্যবহার করা হয়। পাশাপাশি ইটভাটা থেকে নির্গত কার্বন ডাই-অক্সাইডসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর গ্যাস পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করছে। দক্ষিণাঞ্চলের পাঁচ জেলায় বর্তমানে পাঁচ শতাধিক ইটভাটায় বছরে প্রায় ১৫০ কোটি ইট উৎপাদিত হয়। এতে যেমন বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড বায়ুমণ্ডলে যুক্ত হচ্ছে, তেমনি নষ্ট হচ্ছে কৃষিজমির উর্বর মাটিও।

এলজিইডির বাগেরহাটের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মঞ্জুর রশিদ বলেন, পরিবেশ সংরক্ষণ ও টেকসই উন্নয়নের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে গ্রামীণ সড়ক নির্মাণে ইউনিব্লকের ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে। এসব সড়ক দীর্ঘস্থায়ী, টেকসই এবং রক্ষণাবেক্ষণেও সুবিধাজনক।

কোডেকের পরিচালক স্থপতি কাজী ওয়াফিক আলম বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার কারণে প্রচলিত পোড়া ইট অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী হয় না। সেখানে কংক্রিট ব্লক কার্যকর ও পরিবেশবান্ধব বিকল্প হিসেবে কাজ করছে। উদ্যোক্তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং পরিচ্ছন্ন উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে আমরা বিভিন্ন ধরনের সহায়তা প্রদান করছি।

ইতোমধ্যে বাগেরহাটে কংক্রিট ব্লক ব্যবহার করে নির্মাণ করা হয়েছে পাঁচটি আবাসিক ভবন, একটি লাইব্রেরি ভবন, একটি মডেল মসজিদ এবং ৮৫০ মিটার দীর্ঘ একটি গ্রামীণ সড়ক। পাশাপাশি জেলার বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ২৪ জন উদ্যোক্তা পরিবেশবান্ধব নির্মাণসামগ্রী উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।

এ বিষয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ড. শेख ফরিদুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে দেশে আনুমানিক ৮ হাজারের মতো ইটভাটা রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৫ হাজার অবৈধ এবং প্রায় ৩ হাজার বৈধভাবে পরিচালিত হচ্ছে। পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের স্বার্থে সরকার ইটভাটার বিকল্প নির্মাণসামগ্রী ও প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়ে কাজ করছে। তবে এখনো শতভাগ বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি।

তিনি আরও বলেন, বিগত সরকারের সময়ে ২০২৪-২৫ সালের মধ্যে ধাপে ধাপে ইটভাটার পরিবর্তে কংক্রিট ব্লকসহ অন্যান্য পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে রূপান্তরের একটি লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে সে লক্ষ্য অনুযায়ী অগ্রগতি সম্ভব হয়নি। বর্তমানে এ ক্ষেত্রে আনুমানিক ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ অগ্রগতি হয়েছে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমরা সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়, বিভাগ এবং অংশীজনদের সঙ্গে সমন্বয় করে কীভাবে দ্রুত ইটভাটার বিকল্প প্রযুক্তিতে রূপান্তর করা যায়, সে বিষয়ে কাজ করছি। কারণ ইটভাটা পরিবেশ দূষণের অন্যতম প্রধান উৎস। পরিবেশ রক্ষা ও টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে এই খাতকে আরও পরিবেশবান্ধব করতে সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। আশা করছি, সবার সহযোগিতায় আমরা ধাপে ধাপে এ লক্ষ্য অর্জনে সফল হব।

সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিবেশ রক্ষা, কৃষিজমি সংরক্ষণ এবং টেকসই অবকাঠামো নির্মাণে কংক্রিট ব্লক ও ইউনিব্লকের ব্যবহার নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করছে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে এর ব্যবহার আরও সম্প্রসারণ করা গেলে মাটিপোড়া ইটের ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব নির্মাণশিল্প বিকশিত হবে এবং দেশের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

রিপোর্টার্স২৪/এসএন

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪