আশিস গুপ্ত, নয়াদিল্লি : আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা সংক্রান্ত মার্কিন কমিশন (ইউএসসিআইআরএফ)-এর কমিশনারদের আপত্তির মুখেই যুক্তরাষ্ট্র সফর শুরু করতে যাচ্ছেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) প্রধান মোহন ভাগবত। আগস্টের ২৫ তারিখ থেকে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও যুক্তরাজ্য সফর শুরুর প্রাক্কালে মার্কিন প্রশাসনের কাছে সংঘের নেতাদের কোনো কূটনৈতিক সৌজন্য বা উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে আমন্ত্রণ না জানানো এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা লঙ্ঘনের দায়ে আরএসএস সদস্যদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান পুনঃব্যক্ত করেছে ঐ মার্কিন কমিশন।
ইউএসসিআইআরএফ মার্কিন সরকারের একটি স্বাধীন ও দ্বিদলীয় কমিশন, যা বিশ্বজুড়ে ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর নজরদারি রেখে ওয়াশিংটনকে নীতিগত পরামর্শ দেয়। ইতিপূর্বেও আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা আইনের আওতায় ভারতকে 'বিশেষ উদ্বেগের দেশ' হিসেবে চিহ্নিত করার জন্য ওয়াশিংটনের প্রতি টানা সাতবার সুপারিশ জানিয়েছিল কমিশনটি। সেই সাথে ধর্মীয় স্বাধীনতা লঙ্ঘনের জন্য আরএসএস ও তার সংযোগী সংস্থাগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি ও সফর বাতিলের দাবি তোলে। ভারত সরকার বরাবরই ইউএসসিআইআরএফ-এর এই প্রতিবেদনগুলোকে 'পক্ষপাতদুষ্ট ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত' আখ্যা দিয়ে প্রত্যাখ্যান করে আসছে।
কমিশনের বর্তমান প্রধান চিকিৎসক ও মানবাধিকার কর্মী আসিফ মাহমুদ বুধবার রাতে এক বিবৃতিতে বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী যে সংঘ পরিবারের সদস্য, সেই আরএসএস-এর সহযোগী সংগঠনগুলো ভারতে খ্রিস্টান ও মুসলিমসহ ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা চালিয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটেই এই সফর করছেন মোহন ভাগবত। প্যানেলের কমিশনার জিন মিলস জানান, মার্কিন কর্মকর্তাদের উচিত হবে না ভারত সরকারের সাথে যুক্ত থাকলেও আরএসএস নেতাদের কোনো ধরনের উচ্চপর্যায়ের বৈঠক বা কূটনৈতিক আপ্যায়ন দিয়ে সম্মানিত করা। বরং ধর্মীয় স্বাধীনতা লঙ্ঘনের অপরাধে জড়িত আরএসএস সদস্যদের ওপর বিধিনিষেধ আরোপে যুক্তরাষ্ট্রের মনোযোগ দেওয়া উচিত। এর আগের দিন প্রাক্তন চেয়ারপারসন নাদিন মায়েঞ্জাও আরএসএস-এর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের দাবির প্রতি সমর্থন জানান এবং 'প্রভিডেন্স' ম্যাগাজিনে প্রকাশিত নিবন্ধে উল্লেখ করেন যে, এটি এমন একটি সংস্থা যার কর্মকাণ্ড নিষেধাজ্ঞা পাওয়ার যোগ্য।
তিনি ভাগবতকে প্যানেলের কমিশনারদের মুখোমুখি হয়ে তাদের সংগৃহীত প্রমাণের জবাব দেওয়ার আহ্বান জানান। তিন মাস আগে ওয়াশিংটন ডিসিতে ভারতের 'অবনতিশীল ধর্মীয় স্বাধীনতা' নিয়ে একটি শুনানির আয়োজন করেছিল কমিশনটি, যেখানে ধর্মান্তরবিরোধী আইন, নাগরিকত্ব আইন এবং সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার আইনি ও সামাজিক কাঠামো পর্যালোচনা করা হয়।
এরপর গত মার্চে প্রকাশিত ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে আরএসএস এবং ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস উইং (র)-এর ওপর সুনির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞার সুপারিশ করা হয়েছিল। চার মাস আগে কমিশন মন্তব্য করে যে, আরএসএস ও বিজেপির আন্তঃসম্পর্কের কারণেই ভারতের নাগরিকত্ব, ধর্মান্তরবিরোধী ও গো হত্যা সংক্রান্ত বৈষম্যমূলক আইন কার্যকর করা সম্ভব হয়েছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যথারীতি ইউএসসিআইআরএফ-এর এই দাবি ও দৃষ্টিভঙ্গিকে পক্ষপাতমূলক বলে উড়িয়ে দিয়েছে। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল বলেন, ভারতের প্রতি বারবার তথ্যবিকৃত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সমালোচনা না করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে হিন্দু মন্দিরে হামলা, ভাঙচুর এবং প্রবাসী ভারতীয়দের ওপর ক্রমবর্ধমান অসহিষ্ণুতার বিষয়গুলোতে মার্কিন কমিশনের গুরুত্ব দেওয়া উচিত। সংঘের শতবর্ষ উদযাপনের অংশ হিসেবেই মোহন ভাগবতের এই তিন দেশ সফর কর্মসূচি।
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব