ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক: লেখক মার্কো কারনেলোস ৯/১১ হামলার সময় নিউইয়র্কে ছিলেন এবং নিজের চোখে টুইন টাওয়ারে আগুন ও ধোঁয়া উঠতে দেখেছিলেন। ২৫ বছর পর তার মূল্যায়ন হলো—৯/১১-এর পর যুক্তরাষ্ট্র যে পথ বেছে নিয়েছিল, সেটি আমেরিকাকে নিরাপদ করার বদলে আরও যুদ্ধ, অস্থিতিশীলতা ও ক্ষোভ তৈরি করেছে। এ নিয়ে মিডল ইস্ট আইয়ে তিনি একটি মন্তব্য কলাম লিখেছেন।
লেখক মার্কো কারনেলোস মূলত একজন সাবেক ইতালীয় কূটনীতিক। তিনি সোমালিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও জাতিসংঘে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৯৫ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে তিনি ইতালির তিনজন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক দপ্তরে কাজ করেছেন। পরবর্তী সময়ে তিনি মধ্যপ্রাচ্য শান্তি প্রক্রিয়ার সমন্বয়কারী এবং সিরিয়া-বিষয়ক বিশেষ দূত হিসেবে ইতালি সরকারের হয়ে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৭ সালের নভেম্বর পর্যন্ত তিনি ইরাকে ইতালির রাষ্ট্রদূত ছিলেন।
লেখকের মতে, ৯/১১-এর পর যুক্তরাষ্ট্রের উচিত ছিল সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সীমিত ও লক্ষ্যভিত্তিক ব্যবস্থা নেওয়া এবং কেন এত ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল তা বোঝার চেষ্টা করা।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান ও ইরাকে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ ও দখলদারিত্বের পথে যায়। ইরাকে গণবিধ্বংসী অস্ত্র থাকার দাবি পরে মিথ্যা প্রমাণিত হয়। যুদ্ধের ফলে বিপুলসংখ্যক বেসামরিক মানুষ মারা যায় এবং শেষ পর্যন্ত এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, যেখান থেকে ইসলামিক স্টেটের মতো সংগঠনের উত্থান ঘটে।
ইতালির সাবেক এ কূটনীতিক মার্কো কারনেলোস মনে করেন আফগানিস্তান ও ইরাক থেকে মার্কিনীরা শিক্ষা নেয়নি।
দুই দশক যুদ্ধ করার পর ২০২১ সালে আফগানিস্তান আবার তালেবানের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। লেখকের মতে, এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ছিল—সামরিক শক্তি দিয়ে কোনো দেশের রাজনৈতিক সমস্যা স্থায়ীভাবে সমাধান করা যায় না।
কিন্তু তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্র এখন ইরানের ক্ষেত্রে একই ধরনের ভুল আবার করছে। অর্থাৎ যুদ্ধ শুরু করা হলেও যুদ্ধ শেষ করার পরিকল্পনা বা ‘পরের দিনের’ পরিষ্কার পরিকল্পনা নেই।
লেখকের মতে ইরান যুদ্ধ আরও বড় সংকট তৈরি করতে পারে। তিনি মনে করেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথে অস্থিরতা তৈরি হলে বিশ্ব অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন মিত্ররাও নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য হতে পারে।
লেখক দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন ফিলিস্তিন সমস্যাকে উপেক্ষা করা হয়েছে। লেখাটির আরেকটি বড় বক্তব্য হলো—মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার অন্যতম প্রধান কারণ ফিলিস্তিন প্রশ্ন।
লেখকের মতে, যুক্তরাষ্ট্র বহু বছর ধরে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হওয়ার দাবি করলেও বাস্তবে ইসরায়েলের প্রতি বেশি পক্ষপাত দেখিয়েছে। অসলো চুক্তির পরও পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি বেড়েছে এবং ফিলিস্তিনিদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা দুর্বল হয়েছে।
ফলে সমস্যার মূল কারণ সমাধান না করে শুধু বারবার আলোচনা ও সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
তিনি দেখিয়েছেন, আরব বিশ্বের মধ্যে আমেরিকার ভাবমূর্তি খারাপ হয়েছে। লেখক বিভিন্ন জরিপের কথা উল্লেখ করে বলেন, আরব বিশ্বের বড় অংশ মনে করে যুক্তরাষ্ট্র ফিলিস্তিনিদের তুলনায় ইসরায়েলের পক্ষ নিয়েছে।
তার যুক্তি হলো, অনেক আরব মানুষ আমেরিকার জনগণ, শিক্ষা, সংস্কৃতি বা মূল্যবোধকে অপছন্দ করে না। তারা মূলত মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতির বিরোধিতা করে।
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুশের মতে ‘তারা আমাদের স্বাধীনতাকে ঘৃণা করে’—এই ব্যাখ্যাকে লেখক প্রত্যাখ্যান করেন। লেখক মনে করেন, বুশ প্রশাসনের বহুল আলোচিত বক্তব্য ছিল—৯/১১ হামলাকারীরা আমেরিকার স্বাধীনতা ও জীবনযাপনকে ঘৃণা করত। লেখক এ মতের বিপক্ষে তার মত দিয়ে বলেন, তারা মূলত আমেরিকার কিছু নীতির প্রতি ক্ষুব্ধ ছিল—যেমন মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি, ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন, বিভিন্ন দেশে সামরিক হস্তক্ষেপ এবং দ্বিমুখী নীতি।
সাবেক ইতালির কূটনীতিক কিছু প্রস্কাবনা তুলে ধরে এর সমাধান প্রস্তাব করেন, তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রকে কয়েকটি বিষয় বুঝতে হবে:
সামরিক শক্তি দিয়ে রাজনৈতিক সমস্যা স্থায়ীভাবে সমাধান করা যায় না।
দখলদারিত্ব সাধারণত প্রতিরোধ ও আরও সহিংসতা তৈরি করে।
ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক অধিকার ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
শত্রু রাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধের বদলে কূটনীতিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের ক্ষেত্রে একই মানদণ্ড প্রয়োগ করতে হবে।
যুদ্ধ শুরু করার আগে যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতির বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা থাকতে হবে।
এ কলামে লেখক সর্বোপরি বুঝাতে চেয়েছেন, ৯/১১-এর পর যুক্তরাষ্ট্র যে সামরিক ও হস্তক্ষেপমূলক নীতি গ্রহণ করেছিল, তা মধ্যপ্রাচ্যকে শান্ত করার বদলে আরও অস্থিতিশীল করেছে। এখন ইরানের সঙ্গে নতুন যুদ্ধে জড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্র সেই পুরোনো ভুল আবার করছে। একই সঙ্গে ফিলিস্তিন সমস্যার সমাধান না করায় ক্ষোভ ও সংঘাতের মূল কারণগুলোও থেকে যাচ্ছে।
রিপোর্টার্স২৪/রাফিদ