ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি: কোনোটির আসন নেই, দরজা উধাও। কোনোটি চাকা বসে গিয়ে পড়ে আছে, কোনো গাড়ির নেই কাচ। কোথাও আবার পড়ে আছে শুধু মরিচাধরা কাঠামো। লতা-গুল্মে ঢেকে গেছে অনেক যানবাহন। দেখে বোঝার উপায় নেই—কোনটি একসময় সড়কে চলেছে, আর কোনটি এখন শুধু মামলার আলামত। ঠাকুরগাঁও আদালত চত্বরে খোলা আকাশের নিচে বছরের পর বছর পড়ে থেকে এভাবেই নষ্ট হচ্ছে শত শত জব্দ যানবাহন।
মোটরসাইকেল, প্রাইভেট কার, ট্রাক, মাইক্রোবাস, পিকআপ ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাসহ বিভিন্ন ধরনের যানবাহন রয়েছে সেখানে। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে ও ধুলায় পড়ে থেকে অনেক যানবাহনের যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও চুরি হয়ে গেছে বিভিন্ন যন্ত্রাংশও। দীর্ঘদিন পড়ে থাকায় অনেক যানবাহন হারিয়েছে ব্যবহারযোগ্যতা। ফলে মামলা নিষ্পত্তির পর মালিককে ফেরত দেওয়া কিংবা নিলামে বিক্রির সময়ও সেগুলোর আগের মূল্য ও অবস্থান থাকে না।
সম্প্রতি সরেজমিনে ঠাকুরগাঁও আদালত এলাকার পেছনে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের পেছনে বিআরটিএ কার্যালয়ের সামনের চত্বরে গিয়ে দেখা যায়, সারি সারি জব্দ যানবাহন পড়ে আছে। কোনোটি একটির সঙ্গে আরেকটি ঠেস দিয়ে, আবার কোনোটি স্তূপ করে রাখা হয়েছে। অধিকাংশ যানবাহনে জমেছে দীর্ঘদিনের ধুলার আস্তরণ। কিছু মোটরসাইকেলের শরীরজুড়ে মরিচা ধরেছে। কোনো কোনো গাড়ির কাঠামো ছাড়া প্রায় কিছুই অবশিষ্ট নেই। যানবাহনগুলো সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত ছাউনি বা কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেই।
আদালতের মালখানা সূত্রে জানা গেছে, জেলার সাতটি থানায় বিভিন্ন মামলায় জব্দ করা যানবাহন পরে আদালতে পাঠানো হয়। চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, মাদক বহন, সড়ক দুর্ঘটনাসহ বিভিন্ন ঘটনায় এসব যানবাহন জব্দ করা হয়েছে। মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘ সময় লাগায় বছরের পর বছর সেগুলো পড়ে থাকে। অনেক মামলার নিষ্পত্তিতে ১০ থেকে ১২ বছর পর্যন্ত সময় লেগে যায়। পরে আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কোনো যানবাহন মালিককে ফেরত দেওয়া হয়, আবার কোনোটি নিলামে বিক্রির ব্যবস্থা করা হয়।
তবে নিলামের প্রক্রিয়াটিও সময়সাপেক্ষ। ফলে মামলা নিষ্পত্তির আগেই অনেক যানবাহন এতটাই নষ্ট হয়ে যায় যে, সেগুলো ব্যবহার বা পুনরায় চালু করার পরিবর্তে ভাঙারি হিসেবে বিক্রি করা ছাড়া উপায় থাকে না। এতে একদিকে ব্যক্তিমালিকানাধীন সম্পদের মূল্য কমে যায়, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় সম্পদও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
মালখানা রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা কোর্টের উপপরিদর্শক (এসআই) আব্দুল মালেক বলেন, ২০০৪ সাল থেকে বিভিন্ন মামলায় জব্দ করা মালামাল জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের পেছনে বিআরটিএ কার্যালয়ের সামনের চত্বরে রাখা হচ্ছে। সেখানে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের প্রায় ২০০টি মোটরসাইকেল, ২৫০টির বেশি সাইকেল, একটি ট্রাক, দুই-তিনটি প্রাইভেট কার, একটি পিকআপ ভ্যান ও ছয়-সাতটি তিন চাকার অটোরিকশা রয়েছে। গত মাসের ২৮ তারিখে সর্বশেষ ১৬টি মোটরসাইকেল নিলাম হয়েছে। মাদক, নারী নির্যাতন, চুরি, ডাকাতিসহ বিভিন্ন অপরাধের মামলায় এসব যানবাহন জব্দ করা হয়েছিল।
ঠাকুরগাঁও সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সভাপতি আব্দুল লতিফ বলেন, আইনি প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত মামলার আলামত হিসেবে এসব যানবাহন সংরক্ষণ করতে হয়। কিন্তু বছরের পর বছর খোলা আকাশের নিচে পড়ে থাকলে আলামত সংরক্ষণের উদ্দেশ্য কতটা পূরণ হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। মামলার রায় বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসার আগেই কোনো যানবাহন ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে গেলে মালিককে ফেরত দেওয়ার সময় তার প্রকৃত মূল্যও থাকে না। একইভাবে নিলামের ক্ষেত্রেও রাষ্ট্র কম মূল্য পায়।
আদালতের কোর্ট ইন্সপেক্টর বেলাল হোসেন বলেন, জব্দ যানবাহনগুলো রোদ-বৃষ্টি থেকে রক্ষায় ছাউনি করা গেলে ভালো হয়। এতে রাষ্ট্রের সম্পদ সুরক্ষিত থাকবে। পরে আদালতের মাধ্যমে প্রকৃত মালিককে যানবাহন বুঝিয়ে দেওয়ার সময়ও সেগুলো তুলনামূলক ভালো অবস্থায় রাখা সম্ভব হবে।
আইনজীবী আশিকুর রহমান বলেন, কোটি কোটি টাকার সম্পদ এভাবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন খোলা জায়গায় পড়ে থাকায় যানবাহনের মূল্য ও ব্যবহারযোগ্যতা—দুটিই কমছে। এ বিষয়ে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
ঠাকুরগাঁও জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মো. আব্দুল হালিম বলেন, জব্দ করা যানবাহনগুলো রাষ্ট্রের সম্পদ। দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকায় এগুলো নষ্ট হচ্ছে। এই সম্পদ রক্ষায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে যেসব আলামত নিষ্পত্তিযোগ্য, সেগুলোর দ্রুত সুরাহা হওয়া উচিত।
ঠাকুরগাঁওয়ের পুলিশ সুপার বেলাল হোসেন বলেন, বিষয়টি তাঁরা দেখবেন। বিভিন্ন থানাতেও অনেক মালামাল পড়ে থাকে। নতুন অবস্থায় জব্দ করা কোনো কোনো গাড়ি দীর্ঘদিন পড়ে থেকে ধীরে ধীরে মাটির সঙ্গে মিশে যাওয়ার মতো অবস্থায় পৌঁছে যায়।
আদালতের মালখানার দায়িত্বে থাকা ঠাকুরগাঁওয়ের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. লুৎফর রহমান বলেন, এগুলো মামলার আলামত। বিচার শেষ হওয়ার পর আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কোনো আলামত ধ্বংস করা হয়, প্রকৃত মালিককে ফেরত দেওয়া হয় অথবা নিলামে বিক্রি করা হয়। মালিকরা আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাঁদের যানবাহন ফেরত পান। মামলা শেষ না হলে সাধারণভাবে নিলামের সুযোগ থাকে না।
তিনি আরও বলেন, মালখানার জন্য আদালতের নিজস্ব কোনো ভবন নেই। যে জায়গায় জব্দ যানবাহন রাখা হয়েছে, সেটি জেলা প্রশাসনের জায়গা। সেখানে শেড করা যায় কি না, তা নিয়ে গণপূর্ত বিভাগের সঙ্গে কথা বলা হবে। অন্তত একটি ছাউনি করা গেলে রোদ-বৃষ্টি ও ঝড় থেকে মালামালগুলো রক্ষা করা সম্ভব হবে।
চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বলেন, নিলামযোগ্য মালামালের তালিকা করা হয়েছে। পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে বড় পরিসরে একটি নিলামের প্রস্তুতি চলছে। ভাঙারি হিসেবে বিক্রির উপযোগী মালামালও এতে থাকবে। চলতি মাসেই নিলাম হতে পারে। এতে মালখানার প্রায় অর্ধেক জায়গা খালি হয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
রিপোর্টার্স২৪/রাফিদ