| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

মণিপুর বয়স্ক পুর্নবাসন কেন্দ্র

এখানে মৃত্যুর আগে এবং পরে সবাই একসঙ্গেই থাকে

reporter
  • আপডেট টাইম: সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২৬ ইং | ২১:৫৫:২২:অপরাহ্ন  |  ২৫৩ বার পঠিত
এখানে মৃত্যুর আগে এবং পরে সবাই একসঙ্গেই থাকে

এ এইচ সবুজ, গাজীপুর: একই আঙিনায় সারি সারি কবর। পাশাপাশি শায়িত আছেন মুসলমান, হিন্দু বা খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীর কেউ। জীবদ্দশায় তাদের পরিচয় আর বিশ্বাসের পথ ছিল আলাদা। তবে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সেই পরিচয়ের বিভাজন যেন মুছে গেছে। মৃত্যু তাদের এনে দিয়েছে একই ঠিকানায়। তারা ফিরে এসেছেন গাজীপুরের মনিপুরে বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রের কবরস্থানে।

কয়েক বিঘা জায়গাজুড়ে অবস্থিত এই কবরস্থান যেন শুধু মৃত মানুষের শেষ ঠিকানা নয়, এটি ধর্মীয় বিভাজনের বাইরে তাদের আরেকটি পরিচয়ের নীরব সাক্ষ্য। ধর্মভেদে তাদের শেষ বিদায়ের রীতি আলাদা হলেও এখানে শেষ আশ্রয়ের জায়গা একই।

সরজমিনে দেখা যায়, কবরস্থানের ভেতরে কোথাও পুরোনো কবর, আবার কোথাও নতুন মাটির চিহ্ন। কোনো কোনো কবরের চিহ্ন সময়ের সঙ্গে মলিন হয়ে গেছে। তবে ধর্মীয় রীতির ক্ষেত্রে রয়েছে স্বাতন্ত্র্য। 

মুসলমানদের দাফন করা হয় ইসলামী রীতি অনুযায়ী, আর হিন্দু, খ্রিষ্টানসহ অন্য ধর্মাবলম্বীদের ক্ষেত্রেও অনুসরণ করা হয় তাদের ধর্মীয় নিয়ম। পরবর্তী সময়ে মরদেহ হস্তান্তরের সুযোগ রাখার স্বার্থে দাহ না করে সবাইকে একই প্রতিষ্ঠানের সীমানায় সমাহিত করা হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৯৮৭ সালে ভাড়া বাড়িতে খাতীব আব্দুল জাহিদ মুকুল এটি নিজ উদ্যোগে ও অর্থায়নে বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রটির কার্যক্রম শুরু করেন। পরে ১৯৯৪ সালে এটি গাজীপুরের মনিপুর এলাকায় স্থানান্তর করা হয়। প্রায় ৭২ বিঘা জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত এই কেন্দ্রটি শুধু প্রবীণদের থাকার জায়গা নয়, অনেকের কাছে এটি জীবনের শেষ আশ্রয়। এখানে থাকা প্রবীণদের চিকিৎসা,পরিচর্যা ও নিজ নিজ ধর্ম পালনের সুযোগ রয়েছে। আর প্রতিষ্ঠানটির পাশের কবরস্থানটি সেই আশ্রয়েরই শেষ সীমানা।

বাঁচা-মরাতেও পাশাপাশি:

বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রে জাতি, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে প্রবীণেরা বসবাস করেন। বর্তমানে এখানে প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ জন প্রবীণ রয়েছেন। প্রতিষ্ঠানটির মোট ধারণক্ষমতা প্রায় ১ হাজার ২০০ জন।

এখানে ধর্ম পালনে নেই কোনো বাধা। প্রত্যেকে নিজ নিজ ধর্মীয় বিশ্বাস ও রীতি অনুযায়ী প্রার্থনা ও উপাসনা করেন। ভিন্ন ধর্মের মানুষ হয়েও তারা একই পরিবেশে বসবাস করেন। কারও অসুস্থতার খবর পেলে অন্যরা পাশে দাঁড়ান, কারও মন খারাপ হলে সঙ্গ দেন। উৎসব এলে ভাগাভাগি করে নেন আনন্দ। বয়সের শেষ প্রান্তে এসে রক্তের সম্পর্কের বাইরে তাদের মধ্যে গড়ে ওঠে আরেক ধরনের সম্পর্ক।

এখানে প্রায় দুই হাজার মানুষের শেষ ঠিকানা:

সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৩০ বছরে এই কবরস্থানে দুই হাজার মানুষকে সমাহিত করা হয়েছে। তাদের অনেকেই ছিলেন এমন মানুষ, যাদের জীবনের শেষ সময়ে পাশে থাকার মতো আপনজন ছিল না। কেউ পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছেন, কেউ আর পরিবারের কাছে ফিরতে পারেননি। শেষ বয়সে এই প্রতিষ্ঠানই হয়ে উঠেছিল তাদের একমাত্র আশ্রয়।

তাই মৃত্যুর পরও সেই আশ্রয়ের সাথে সম্পর্ক শেষ হয়নি। পুনর্বাসন কেন্দ্রটির কারো মৃত্যু হলে প্রথমে তার স্বজনদের খবর দেওয়া হয়। স্বজনেরা মরদেহ নিয়ে যেতে চাইলে তাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। আর পরিবার মরদেহ গ্রহণ না করলে প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনায় দাফন বা শেষকৃত্য সম্পন্ন করে ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

মুসলিম-হিন্দুদের আলাদা স্থানে কবর:

সরেজমিনে দেখা যায়, কবরস্থানে ঢোকার প্রধান ফটকের পাশেই রয়েছে বড় একটি সাইনবোর্ড। সেখানে আলাদা করে উল্লেখ রয়েছে- মুসলমান, হিন্দু, খ্রিষ্টানসহ বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের কবরস্থান। ভেতরে বড় বড় গাছেও রয়েছে আলাদা আলাদা সম্প্রদায়ের পরিচয়বাহী সাইনবোর্ড। কোথাও লেখা 'গোরস্থান মুসলমানদের জন্য' আবার কোথাও লেখা 'গোরস্থান হিন্দুদের জন্য'। এখানে রয়েছে মুসলমানদের জানাজা পড়ার স্থান। পাশাপাশি হিন্দু ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের মরদেহের ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার জন্যও রয়েছে আলাদা ব্যবস্থা।

এই বৃদ্ধাশ্রমের বাসিন্দা বৃদ্ধা সাবিনা বলেন, মরলে আমাদের এখানেই খবর দেওয়া হয়। যারা লাশ নিয়ে যেতে চায় তারা নিয়ে যায়। যে সব হিন্দুর স্বজনরা মরদেহ পোড়াতে চান তাদের লাশ নিয়ে যান। না হলে এখানে কবর দেওয়া হয়। একই জায়গায় কবর দেওয়া হলেও ধর্ম অনুযায়ী আলাদা ভাগ করা আছে।

বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রে থাকা মনোয়ারা বলেন, যাদের কেউ নেই তাদের এখানেই কবর দেওয়া হয়। আমাদের এখানে সবার কবর এক জায়গায়। মুসলমানদের জানাজা পড়িয়ে করব দেওয়া হয়। অন্য ধর্মের মানুষদেরও কবর দেওয়া হয়। তবে এখানে পোড়ানোর কোনো নিয়ম নেই।

স্থানীয় বাসিন্দা আইয়ুব আলী বলেন, এই বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রে সব ধর্মের মানুষ একসঙ্গেই বসবাস করে। আমরা বছরের পর বছর ধরে দেখে আসছি, মৃত্যুর পরেও তাদের প্রায় অধিকাংশকেই এখানে কবরস্থ করা হয়। শত শত কবর রয়েছে এখানে। একটা আঙিনার মধ্যেই হিন্দু, মুসলিম, খ্রিষ্টান সবারই কবর। এটি অন্যান্য জায়গার মানুষের কাছে অস্বাভাবিক মনে হলেও আমাদের কাছে স্বাভাবিক মনে হয়।

বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রের হোস্টেল সুপার হাবিবা খন্দকার বলেন, আমাদের এখানে হিন্দু-মুসলিম-খ্রিষ্টান সবাইকেই সমাহিত করা হয়। এখানে কেউ মারা গেলে প্রথমে আত্মীয়-স্বজনকে জানানো হয়। কেউ নিয়ে যেতে চাইলে তারা নিয়ে যেতে পারে। যদি না নেয় তাহলে নিয়ম অনুযায়ী জানাজা শেষে তাদেরকে দাফন করানো হয়। এছাড়া হিন্দুরা মারা গেলে অন্যান্য নিয়ম মেনে হিন্দুদের দিয়েই কবর দেওয়া হয়। খ্রিস্টানদের মৃত্যুর পর যে নিয়মগুলো আছে সেই নিয়ম মেনে কবর দেওয়া হয়। 

তিনি আরো বলেন, আমি এখানে প্রায় ৩০ বছর ধরে কর্মরত রয়েছি। আমরাই এগুলো মৃত্যুর পর সমস্ত ব্যবস্থা করে থাকি। এই কবরস্থানে প্রায় দুই হাজারের মতো মানুষকে কবর দেওয়া হয়েছে।

রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪