| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে পাঁচ বছরের চুক্তি করছে বাংলাদেশ

reporter
  • আপডেট টাইম: অক্টোবর ১৬, ২০২৬ ইং | ১৯:১৪:৪১:অপরাহ্ন  |  ১৯২৫ বার পঠিত
বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে পাঁচ বছরের চুক্তি করছে বাংলাদেশ

সোমনাথ দে, ব্যাংকক (থাইল্যান্ড) থেকে: মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে সাত মাসে জ্বালানি ও সার আমদানিতে বাংলাদেশের অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে ৪১২ কোটি ডলার, দেশীয় মুদ্রায় যা প্রায় ৫০ হাজার ২৬৪ কোটি টাকা। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এ দুই পণ্যের আমদানিতে প্রতি মাসে বাড়তি ব্যয় আরও প্রায় ৬০ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে। এ বিপুল আর্থিক ক্ষতি সামাল দিতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চাওয়ার পাশাপাশি যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত অথচ সংঘাতে সরাসরি জড়িত নয়-এমন দেশগুলোর ক্ষতিপূরণের বিষয়টিও সামনে এনেছে বাংলাদেশ।

গতকাল শুক্রবার থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভার ফাঁকে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ক্ষয়ক্ষতি ও আন্তর্জাতিক সহায়তা নিয়ে আলোচনায় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বিষয়টি তুলে ধরা হয়। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জ্বালানি ও সার আমদানিতে বাড়তি ব্যয়ের হিসাব তুলে ধরে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর পাশে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।

তবে যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশের বাড়তি ব্যয়ের সমপরিমাণ অর্থ ক্ষতিপূরণ হিসেবে পাওয়া যাবে-এমন কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের কাছ থেকে বাড়তি অর্থায়ন পাওয়ার উদ্যোগ চলছে। ঋণ, অনুদান বা জরুরি সহায়তা পাওয়া গেলে তা অর্থনৈতিক চাপ সামলাতে কাজে লাগবে। তবে এসব অর্থকে সরাসরি যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ হিসেবে বিবেচনা করার সময় এখনো আসেনি।

বাড়ছে আমদানি ব্যয়, চাপে অর্থনীতি

জ্বালানি ও সারের আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ছে। জ্বালানির দাম বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন ও শিল্পকারখানার পরিচালন ব্যয় বেড়ে যায়। অন্যদিকে সারের দাম বাড়লে কৃষি উৎপাদনের খরচ ও সরকারি ভর্তুকির চাপ বাড়ার আশঙ্কা থাকে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত পণ্য ও সেবার দাম বৃদ্ধির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ওপরও পড়তে পারে।

তিতুমীরের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধ অব্যাহত থাকলে জ্বালানি ও সার আমদানিতে প্রতি মাসে প্রায় ৬০ কোটি ডলার অতিরিক্ত ব্যয় হতে পারে। ফলে যুদ্ধের মেয়াদ যত বাড়বে, বৈদেশিক মুদ্রার জোগান নিশ্চিত করা ও সরকারি বাজেটের ভারসাম্য রক্ষা তত কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

এমনিতেই উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগে দুর্বলতা এবং ব্যাংকিং খাতের সংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। এ পরিস্থিতিতে সরকারের যুক্তি, যুদ্ধের সিদ্ধান্তে সরাসরি অংশ না নিলেও আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বড় আর্থিক ক্ষতি বহন করতে হচ্ছে। তাই ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য সহজ শর্তে অর্থায়ন, অনুদান ও জরুরি সহায়তার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

৩০ থেকে ৪০ দেশের সহায়তায় বিশ্বব্যাংক

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা সামলাতে ৩০ থেকে ৪০টি দেশের সঙ্গে সম্ভাব্য জরুরি সহায়তা নিয়ে আলোচনা করছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা জানিয়েছেন, পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে সংকট মোকাবিলায় সহায়তার পরিমাণ সর্বোচ্চ ১০০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। প্রাথমিকভাবে ২৫ বিলিয়ন ডলারের একটি সংকটকালীন তহবিলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। চলমান ও অনুমোদিত প্রকল্পের অর্থ পুনর্বিন্যাস করেও ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে সহায়তা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

এদিকে আগামী তিন বছরে বিশ্বব্যাংকের কাছে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলার অর্থায়ন চেয়েছে বাংলাদেশ। পাশাপাশি আইএমএফের সঙ্গে নতুন তিন বছর মেয়াদি ৪৫০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচি নিয়েও আলোচনা চলছে। এসব অর্থায়ন যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ হিসেবে নির্ধারিত নয় বরং অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলা ও পুনরুদ্ধারের বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ।

ঋণ ও ক্ষতিপূরণের মধ্যে পার্থক্য বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ঋণের অর্থ তাৎক্ষণিকভাবে আমদানি ব্যয়ের চাপ সামলাতে সহায়তা করলেও ভবিষ্যতে সুদসহ তা পরিশোধ করতে হবে। অন্যদিকে অনুদান বা সহজ শর্তে অর্থায়ন তুলনামূলকভাবে কম দায় তৈরি করবে। ফলে শুধু অর্থের পরিমাণ নয়, অর্থায়নের শর্ত ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও বিবেচনায় নিতে হবে।

বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে পাঁচ বছরের অংশীদারত্ব চুক্তি

বাংলাদেশের আগামী পাঁচ বছরের উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে অংশীদারত্ব কাঠামো চুক্তি করতে যাচ্ছে সরকার। আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে সরকারের প্রতিনিধিদলের বৈঠকে চুক্তির বিষয়গুলো চূড়ান্ত করার কথা রয়েছে।

আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভার ফাঁকে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, মূল নীতিগত বিষয়গুলোতে বড় কোনো সমস্যা নেই। আলোচনার মাধ্যমে যৌথ কর্মপরিকল্পনার ভিত্তিতে চুক্তির বিষয়গুলো চূড়ান্ত করা হবে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীরা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় কাজ করছে। নির্বাচনি ইশতেহার ও উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে আগামী পাঁচ বছরের জন্য একটি নির্দিষ্ট কাঠামো তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এদিন সকালে ব্যাংক অব আমেরিকা, গুগল, আইএমএফ, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক ও মুডিসের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও বৈঠক করেন অর্থমন্ত্রী। এসব বৈঠকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, ঋণ, আর্থিক খাতের সংস্কার ও উন্নয়ন সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়।

দারিদ্র্য হ্রাস ও কর্মসংস্থানে জোর

দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি ও মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। তিতুমীর বলেন, বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, অতীতের দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির কারণে বাংলাদেশে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও অন্যান্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে দরিদ্র মানুষের দুর্ভোগ কমানো এবং নতুন করে দারিদ্র্য বাড়ার ঝুঁকি ঠেকানো সম্ভব হবে।

তিনি বলেন, স্বাধীন গবেষণা সংস্থাগুলোর মূল্যায়ন অনুযায়ী, ফ্যামিলি কার্ড কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে দারিদ্র্য প্রায় ৫ শতাংশ কমতে পারে। অতীতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে উপকারভোগী নির্বাচনে ত্রুটি ছিল। এ সমস্যা দূর করতে সরকার ডিজিটাল জনপরিকাঠামো ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।

তিতুমীর আরও বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে শুধু কঠোর মুদ্রানীতি যথেষ্ট নয়; রাজস্ব ও আর্থিক খাতের সংস্কারও জরুরি। কর ফাঁকি কমিয়ে রাজস্ব আয় বাড়ানো, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং উৎপাদন ও রপ্তানিমুখী শিল্পে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।

অন্যদিকে বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা উন্নয়নশীল দেশগুলোতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেন। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরে এসব দেশে প্রায় ১২০ কোটি তরুণ কর্মক্ষম বয়সে পৌঁছাবে। কিন্তু বর্তমান ধারায় তাদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে আনুমানিক ৪০ কোটি। ফলে প্রায় ৮০ কোটি কর্মসংস্থানের ঘাটতির আশঙ্কা রয়েছে। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বেসরকারি বিনিয়োগ, প্রযুক্তির ব্যবহার ও উৎপাদনশীল খাতের সম্প্রসারণ জরুরি বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বাঙ্গা আরও জানান, ২০২৬ থেকে ২০৩০ অর্থবছরের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ খাতে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের অর্থায়ন পাঁচ গুণের বেশি বাড়িয়ে ১৯ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। ২০২১ থেকে ২০২৫ অর্থবছরে এ খাতে অর্থায়ন ছিল ৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার।

সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বাংলাদেশের জন্য শুধু জ্বালানি ও সার আমদানির ব্যয় বৃদ্ধির সংকট নয়, এর প্রভাব পড়ছে বৈদেশিক মুদ্রার জোগান, সরকারি বাজেট, কৃষি উৎপাদন, মূল্যস্ফীতি ও কর্মসংস্থানে। তাই আন্তর্জাতিক সহায়তার পাশাপাশি যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট ক্ষতির দায় ও ক্ষতিপূরণের প্রশ্নটি সামনে আনছে বাংলাদেশ। তবে এ উদ্যোগের বাস্তব ফল নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ক্ষতিপূরণের প্রশ্ন কতটা এগোয় এবং উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে কী শর্তে অর্থায়ন পাওয়া যায়, তার ওপর।

রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪