রিপোর্টার্স২৪ ডেস্ক :
বাংলাদেশে বিনিয়োগে নিজেদের জন্য সর্বোচ্চ সুযোগ চায় যুক্তরাষ্ট্র। বিশেষ করে জ্বালানি, গ্যাস, বীমা ও টেলিযোগাযোগ খাতে বিদেশি মালিকানার সীমা তুলে নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে ওয়াশিংটন। সাম্প্রতিক শুল্ক আলোচনায় ঢাকার কাছে এসব শর্ত রেখেছে তারা। বিষয়টি নিশ্চিত করেছে সরকারের উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্র।
ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত ওই আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে বাণিজ্যিক অংশীদারিত্ব জোরদার এবং বিদ্যমান শুল্ক কাঠামোর বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতি হলেও মালিকানা সীমা, পুঁজির প্রত্যাবাসনসহ বেশ কিছু বিষয়ে এখনো মতপার্থক্য রয়ে গেছে।
সংবেদনশীল খাতে বিদেশি নিয়ন্ত্রণে সতর্ক ঢাকা
বর্তমানে বাংলাদেশে চারটি খাত— অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম, সংরক্ষিত বনাঞ্চল, পারমাণবিক শক্তি এবং টাকা মুদ্রণ— কেবল সরকারি বিনিয়োগের জন্য সংরক্ষিত। যদিও বিদ্যুৎ উৎপাদন ও গ্যাস অনুসন্ধানে বেসরকারি বিনিয়োগের সুযোগ আছে, তবে গ্যাস বিতরণ ও তেল বিপণনে পুরোপুরি বিদেশি মালিকানা অনুমোদন দেওয়া হয় না।
এ বিষয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘তেল, গ্যাস ও টেলিযোগাযোগ খাত যে কোনো দেশের জন্য কৌশলগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। এগুলোর ওপর বিদেশি নিয়ন্ত্রণ থাকলে ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও স্বার্থ হুমকির মুখে পড়তে পারে।’
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র চাপ প্রয়োগ করছে। একদিকে শুল্ক বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে নতুন সুবিধা দাবি করছে। অথচ তাদের কোম্পানি শেভরন আজও মাগুরছড়ার ক্ষতিপূরণ দেয়নি। সরকারকে এখন এ নিয়ে শক্ত অবস্থান নিতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘যে পণ্য ও সেবা পুরো রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে, সেখানে বিদেশিদের শতভাগ মালিকানা দেওয়ার আগে জাতীয় সক্ষমতা বিবেচনা করা উচিত।’
শর্ত হিসেবে পুঁজির প্রত্যাবাসনও চায় ওয়াশিংটন
যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, বাংলাদেশে মার্কিন বিনিয়োগকারীদের পুঁজি যেন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (IMF) প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সহজে প্রত্যাবাসন করা যায়— সেজন্য একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা ও স্বচ্ছ নীতিমালা থাকা দরকার।
আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশের (অ্যামচেম) সভাপতি সৈয়দ এরশাদ আহমেদ জানান, শেভরনের বকেয়া পরিশোধ হয়েছে এবং অন্য বিনিয়োগকারীরাও নিজ নিজ অর্থ ফিরিয়ে নেওয়ার অনুমোদন পেয়েছেন।
তবে এর আগেও শেভরন ও মেটলাইফসহ একাধিক মার্কিন কোম্পানি তাদের মুনাফার অর্থ দেশে আটকে থাকার অভিযোগ তুলেছিল। ২০১৯ সালের পর থেকে মেটলাইফ তাদের অর্থ যুক্তরাষ্ট্রে নিতে পারেনি বলে দাবি করে আসছে।
বিশেষজ্ঞ মত: মালিকানা নয়, দরকার সুশাসন ও প্রতিযোগিতা
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, ‘বিদেশি কোম্পানিকে তেল আমদানির অনুমতি দিলে দেশীয় কোম্পানিকেও একই সুবিধা দিতে হবে। এতে প্রতিযোগিতা বাড়বে, যা দেশের জন্য ভালো। তবে এটি হতে হবে একটি সুসংহত নীতিমালার আওতায়।’
প্রবেশাধিকার সীমাবদ্ধ ১৭টি খাত
বর্তমানে বাংলাদেশে ১৭টি খাতে ব্যবসা পরিচালনার জন্য বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মন্ত্রণালয়ের অনুমতি প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে বিমান চলাচল, ব্যাংক, খনিজ অনুসন্ধান, বীমা, বিদ্যুৎ, ভিওআইপি, গভীর সমুদ্র মৎস্য আহরণ ও সমুদ্রবন্দর খাত।
যুক্তরাষ্ট্রের মতে, বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগে বড় কোনো বৈষম্য নেই, তবে কিছু জায়গায় স্থানীয় শিল্পের প্রতি অতিরিক্ত সংরক্ষণবাদ দেখা যায়। বিশেষ করে ওষুধ, বীমা ও শিপিং খাতে বিদেশিদের স্থানীয় অংশীদার থাকা প্রায় বাধ্যতামূলক, যদিও এটি আইনিভাবে সংজ্ঞায়িত নয়।
.
রিপোর্টার্স২৪/এস