| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

ঐতিহ্য আর কূটনীতির বুনন: দিল্লিতে বাংলাদেশের জামদানি প্রদর্শনী

reporter
  • আপডেট টাইম: সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২৫ ইং | ১৮:২৬:৪০:অপরাহ্ন  |  ১৫১৪৬৪৩ বার পঠিত
ঐতিহ্য আর কূটনীতির বুনন: দিল্লিতে বাংলাদেশের জামদানি প্রদর্শনী
ছবির ক্যাপশন: ঐতিহ্য আর কূটনীতির বুনন: দিল্লিতে বাংলাদেশের জামদানি প্রদর্শনী

আশিস গুপ্ত, নতুন দিল্লি :

এক অনন্য উদ্যোগের সাক্ষী হলো ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি। শুক্রবার নয়াদিল্লির ন্যাশনাল ক্র্যাফ্টস মিউজিয়ামে বাংলাদেশের হাই কমিশনের উদ্যোগে প্রথমবার উদ্বোধন করা হয়েছে থমবার জামদানি প্রদর্শনী। এই আয়োজন ভারতীয় দর্শকদের সামনে তুলে ধরেছে বাংলাদেশের সবচেয়ে বিখ্যাত বুননের নিপুণ কারুকার্যের এক ঝলক, যা একইসঙ্গে ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা এবং দুই দেশের মধ্যে সাংস্কৃতিক সংযোগ স্থাপনের এক নতুন দৃষ্টান্ত।

তবে, এই প্রদর্শনীর কেন্দ্রে থাকা জামদানির ইতিহাস বহুকাল আগের। বহু যুগ আগে ঢাকার সোনারগাঁয়ের মাটিতে জন্ম নিয়েছিল এই অনন্য অলৌকিক শিল্প। তুলোর সূক্ষ্ম সুতোয় গাঁথা এই শাড়ি যেন ইতিহাসের বুক থেকে উঠে আসা এক অমূল্য রত্ন। ইতিহাসবিদরা বলেন, বাংলার তাঁতশিল্পের শিকড় বহু গভীরে প্রোথিত। খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ অব্দের কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র-এ বঙ্গ ও পুণ্ড্র অঞ্চলের সূক্ষ্ম বস্ত্রের উল্লেখ পাওয়া যায়। পরবর্তীতে গ্রিক এবং আরবীয় ভ্রমণকারীদের বিবরণীতেও এই অঞ্চলের মিহি কাপড়ের, বিশেষত মসলিনের, খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল। মসলিনের সেই সূক্ষ্মতার ওপর যখন রঙিন নকশার খেলা শুরু হলো, তখনই জন্ম নিল জামদানি—যেন মসলিনের রঙিন স্বপ্ন। মুঘল আমলেই জামদানি তার স্বর্ণযুগে পৌঁছেছিল। সম্রাটদের রাজসভায় এর কদর ছিল অপরিসীম।

জামদানি শুধু নান্দনিকতার প্রতীক নয়, এটি অসীম পরিশ্রমেরও প্রতীক। একটি শাড়ি বুনতে প্রতিদিন অন্তত দু’জন তাঁতির ১২-১৪ ঘণ্টা পরিশ্রম লাগে। সূক্ষ্মতা ও নকশার জটিলতা অনুসারে, একটি শাড়ি তৈরি হতে সাত দিন থেকে ছ’মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

তবে দুঃখের বিষয় হলো, বর্তমানে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প অনেক সংকটে জর্জরিত। মেশিনে তৈরি সস্তার পাওয়ারলুম শাড়ির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, পুঁজির অভাব এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার ঘাটতির কারণে অনেক তাঁতি পূর্বপুরুষের পেশা ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। অথচ ২০১৬ সালে ইউনেস্কো জামদানিকে বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক (GI) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, যা আমাদের জন্য এক বিরাট গর্বের বিষয়।

এই প্রেক্ষাপটে, নয়াদিল্লির ন্যাশনাল ক্র্যাফ্টস মিউজিয়ামে বাংলাদেশের হাই কমিশন কর্তৃক আয়োজিত প্রথম জামদানি প্রদর্শনীটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এই উদ্যোগটি কেবল একটি সাংস্কৃতিক প্রদর্শনী বা অনুষ্ঠান নয়, বরং দুই দেশের মধ্যে এক নতুন ধরনের ‘শাড়ি কূটনীতি’-র উদাহরণ। উৎসবের মরসুমে, দুর্গাপূজার ঠিক আগে, জামদানির এই রঙিন আভা ভারত এবং বাংলাদেশের সম্পর্কের মধ্যে নতুন উষ্ণতার বার্তা নিয়ে এসেছে।

এই প্রদর্শনীতে ১৫০ বছরের পুরনো দুটি বিরল জামদানি শাড়ি প্রদর্শন করা হয়েছে, যা দর্শকদের বিমোহিত করেছে। বাংলাদেশের হাইকমিশনার এম. রিয়াজ হামিদুল্লাহ এবং প্রখ্যাত ভারতীয় ডিজাইনার চন্দ্রশেখর ভেদার তত্ত্বাবধানে আয়োজিত এই প্রদর্শনীতে ইউনেস্কো কর্তৃক জামদানিকে স্পর্শাতীত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। প্রখ্যাত ভারতীয় কারু ও বস্ত্র পুনরুজ্জীবনকারী চন্দ্রশেখর ভেদার তত্ত্বাবধানে এই প্রদর্শনীতে বাংলাদেশের কারিগরদের বোনা কিছু সেরা জামদানি, যার মধ্যে ১৫০ বছরের পুরনো দুটি বিরল শাড়ি প্রদর্শিত হচ্ছে । উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভেদা বলেন, “জামদানি যন্ত্র দ্বারা তৈরি করা যায় না। এর স্বচ্ছতা ও সূক্ষ্মতা এমন, যেন বাতাসে ভাসা এক জাদুকরি বুনন।”

প্রদর্শনীতে একটি ধারণাগত গভীরতা যোগ করে, বাংলাদেশের কারুশিল্প পুনরুজ্জীবনের পথিকৃৎ এবং আড়ং-এর প্রাক্তন ডিজাইন লিডার চন্দ্রশেখর সাহা কাপড়ের ঐতিহ্য তুলে ধরে বলেন,  “একসময় বাংলার মসলিন ছিল সেরা। জামদানি সেই একই মর্যাদায় আসীন—এটি এমন একটি শিল্প, যা আপনাকে বুঝতে হলে দেখতে ও অনুভব করতে হবে। আশা করি, এর ঐতিহ্য টিকে থাকবে।”

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভারতের ডিজাইন ও সাংস্কৃতিক জগতের বিশিষ্ট ব্যক্তিরাও উপস্থিত ছিলেন। পদ্মশ্রী পুরস্কারপ্রাপ্ত ইন্টেরিয়র ডিজাইনার সুনিতা কোহলি জামদানির গৌরবময় অতীত নিয়ে কথা বলেন, যা একসময় “বোনা বাতাস” হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছিল। তিনি বলেন, “সম্রাটরা এর জন্য আকাঙ্ক্ষা করতেন, বণিকরা এটি সমুদ্র পেরিয়ে নিয়ে যেতেন এবং কবিরা এর সূক্ষ্মতা ধারণ করতে লড়াই করতেন। ইউনেস্কো এটিকে স্পর্শাতীত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বলে অভিহিত করেছে—আমি এটিকে স্পর্শাতীত বিলাসিতা বলি, যা দাম দিয়ে নয়, বরং ধৈর্য, সময় এবং মানব হাতের  ছোঁয়ায় পরিমাপ করা হয়।”

বিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা এবং ডিজাইনার মুজাফফর আলী cinematic note-এর সাথে বলেন, জামদানি “আলো এবং বুননের এক সত্যিকারের আনন্দ, একটি সৌন্দর্য যা কারুশিল্পের প্রতি ভাগ করা মুগ্ধতার মাধ্যমে দেশগুলিকে একত্রিত করতে পারে।”

ভারতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার এম. রিয়াজ হামিদুল্লাহ এই প্রদর্শনীর পরিকল্পনা করেন। তার মতে, এটি একটি নির্জন মুহূর্ত থেকে জন্ম নিয়েছিল।

তিনি বলেন, “এই বছর আমাদের স্বাধীনতা দিবসের বার্ষিকী উদযাপনের সময়, আমরা কয়েকটি জামদানি প্রদর্শন করেছিলাম। ব্যাপক সাড়া আমাদের এটিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করেছে। এই প্রদর্শনীর মাধ্যমে আমরা আশা করি আরও বেশি মানুষ জামদানির চিরন্তন সৌন্দর্য আবিষ্কার করবে।”

দুজন জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত জামদানি তাঁতি, মোহাম্মদ জামাল হোসেন এবং মোহাম্মদ সাজীব—যাদের প্রত্যেকে দুই দশকেরও বেশি অভিজ্ঞতাসম্পন্ন—জামদানি বুননের জটিল প্রক্রিয়া সরাসরি প্রদর্শনের জন্য বাংলাদেশ থেকে এসেছেন।

এই প্রদর্শনী প্রমাণ করে, রাজনৈতিক টানাপোড়েন থাকলেও শিল্প ও সংস্কৃতির মতো শক্তিশালী সংযোগের মাধ্যমে দুই দেশের সাধারণ মানুষের হৃদয়ে একটি সূক্ষ্ম অথচ দৃঢ় বুনন তৈরি করা সম্ভব। এটি জামদানিকে কেবল একটি বস্ত্র হিসেবে নয়, বরং ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার সম্পর্ক এবং ভাগ করে নেওয়া প্রশংসা-এর প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

রিপোর্টার্স২৪/সোহাগ

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪