ডিপ্লোম্যাটিক রিপোর্টার: বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী প্রেক্ষাপটে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরী আটক হয়েছিলেন কিন্তু তার অতি দ্রুত মুক্তি লাভ বিভিন্ন মহলে বেশ আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছিলো। সে সময় এ নিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতিতেও পড়তে হয়েছিলো অন্তবর্তীকালীন সরকারকে। স্ক্যান্ডিনেভিয়ান তিনটি দেশের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে নিজ বাসায় বৈঠক করা নিয়ে আওয়ামীলীগের সাবেক এই মন্ত্রী আবারও আলোচনায় উঠে এসেছেন ।
সাবের হোসেন চৌধুরীর সঙ্গে বৈঠক করেন ঢাকায় নিযুক্ত নরওয়ের রাষ্ট্রদূত হ্যাকন আরাল্ড গুলব্রানসেন, সুইডেনের রাষ্ট্রদূত নিকোলাস লিনাস রাগনার উইকস এবং ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত ক্রিশ্চিয়ান ব্রিক্স মলার। এই তিন রাষ্ট্রই স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশ, যারা বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন এবং মানবাধিকারের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের অংশীদার।
ক্ষমতাচ্যুত সাবেক এই মন্ত্রীর মুক্তিতে রিফাইন্ড আওয়ামীলীগ গঠনের যে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছিল, কূটনীতিকদের সঙ্গে তার বৈঠকের পর সেটি আবারও জোরালো আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এই বৈঠকের ঘটনা রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অঙ্গনে কৌতূহল সৃষ্টি করেছে। আওয়ামী লীগ মাঠে না থাকলেও সরকারের দায়িত্বশীল প্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে ঘাটেঘাটে ভিড়ছে ক্ষমতাচ্যুত এই দলটির ‘ডুবে যাওয়া তরী’।
সোমবার (৬ অক্টোবর) দুপুরে রাজধানীর গুলশানে সাবের হোসেন চৌধুরীর নিজ বাসভবনে প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে ওই কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠক চলে। এমন একটি বৈঠক আসলেই হয়েছে কি না তার সত্যতা সম্পর্কে সাবের হোসেন চৌধুরী বা ওই তিন কূটনীতিক অথবা সরকারের পক্ষ থেকে কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানায়, বৈঠকে সাবের চৌধুরীর কাছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া দল আওয়ামী লীগের আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের কোনো পরিকল্পনা রয়েছে কি না, সে বিষয়ে কূটনীতিকরা জানতে চেয়েছেন। এ ছাড়া, কীভাবে দলটির কার্যক্রম ফের শুরু করা যায়, তা নিয়েও আলোচনা হয়। আওয়ামী লীগের স্বচ্ছ ভাবমূর্তির সদস্যদের যদি বর্তমান সরকার ও অন্যান্য রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়, তাহলে বিদেশি কূটনীতিকদের তাতে তেমন কোনো আপত্তি নেই বলে জানান। বরং তাতে নির্বাচনের মাঠে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড পুরোপুরি বজায় থাকবে বলেই মনে করেন তারা। যদিও বৈঠকে কী নিয়ে আলোচনা হয়েছে, তা কোনো পক্ষই আনুষ্ঠানিকভাবে খোলাসা করেনি।
এই তিন রাষ্ট্রদূত ফ্ল্যাগ ছাড়া অর্থাৎ কোনো কূটনৈতিক স্বাক্ষর ছাড়াই একই গাড়িতে চড়ে সাবের হোসেনের বাসভবনে প্রবেশ করেন। নজর এড়াতে তারা বৈঠক শেষে বাসভবনটি থেকে বেরিয়ে বিকল্প রাস্তা ব্যবহার করে চলে যান। সচরাচর এমন গোপনীয়তা সাধারণ কূটনৈতিক সাক্ষাতের ক্ষেত্রে অনুসরণ করা হয় না।
সাবের হোসেন চৌধুরীর বাসায় রাষ্ট্রদূতদের বৈঠক প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন বলেন, তারা একজন ব্যক্তির বাসায় গেছেন। তিনি যদি অপরাধী হতেন অবশ্যই তাকে হেফাজতে রাখা হতো, এটাতো হয় নাই। আর রাষ্ট্রদূতরা যে কারো বাসায় যেতে পারেন। তবে তারা কী নিয়ে কথাবার্তা বলেছেন, সেটার ফলাফল নিয়ে বিতর্ক চলতে থাকতে পারে। এটা নিয়ে তাদের আমার বলার কিছু নাই।
কেউ জানে না, এমনও অনেক মিটিং হচ্ছে উল্লেখ করে রাষ্ট্রদূতদের বৈঠক প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, কূটনীতিকরা কার বাসায় বৈঠক করবেন সেটা তাদের নিজস্ব বিষয়। এ নিয়ে আমরা চিন্তা করি না। তাঁরা বৈঠক করবেন, এটা নিয়ে আমাদের কোনো বক্তব্য নেই। কারও বাসায় বৈঠক করলে রাজনীতিতে কিছু আসে যায় না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক জাহেদ উর রহমানের মতে, সংবাদমাধ্যমে এ নিয়ে প্রকাশিত খবরের কেউ প্রতিবাদ করেনি। যার অর্থ বৈঠকের তথ্যটি সত্য। কেন তারা বৈঠকটি করেছেন এ নিয়ে নানা কথা বলা হচ্ছে। এটা খুবই স্বাভাবিক, যদি ৫ আগস্টের পর সাবের হোসেন চৌধুরীর সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোকে আমরা বিবেচনায় নিই। তার জামিন পাওয়াটাই এক ধরনের প্রশ্ন তৈরি করে যে ,আওয়ামী লীগকে নতুন কোনো ফর্মে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে কি না?
তিনি আরও বলেন, রিফাইন্ড আওয়ামীলীগ বলতে যারা আওয়ামী লীগের বড় কোনো পদে ছিলেন না, যাদের বিরুদ্ধে বড় কোনো অভিযোগ নেই তারা মিলে যদি নির্বাচনে আসে তাহলে তারা কিছু আসনে জিতে যাবে এবং তাদের আসন সংখ্যা ইসলামী জোটের চেয়েও বেশি হবে বলে আমি মনে করি। রাষ্ট্রদূতরা সেই ধরনের একটা হিসাব কষছেন কি না, সেটা ভাবার কারণ আছে বলে মনে করি। ইসলামী দলগুলোর সাম্প্রতিক হাইপ, এর সঙ্গে তৌহিদি জনতার নামে নানা রকম কর্মকাণ্ড একটা বৈশ্বিক উদ্বেগ তৈরি করছে। সে কারণে কোনো ফর্মে আওয়ামী লীগকে ফিরিয়ে আনার চিন্তা তারা করছেন কি না, আমি নিশ্চিত নই। কিছুদিন আগে এনসিপি নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহ একটি পোস্ট দিয়েছিলেন; সেখানে তিনি এ ধরনের একটা পরিকল্পনার কথা ফাঁস করে দেন।
সূত্রটি আরও জানায়, বৈঠকে সাবের চৌধুরীর কাছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া দল আওয়ামী লীগের আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের কোনো পরিকল্পনা রয়েছে কি না, সে বিষয়ে কূটনীতিকরা জানতে চেয়েছেন। এ ছাড়া, কীভাবে দলটির কার্যক্রম ফের শুরু করা যায়, তা নিয়েও আলোচনা হয়।
অ্যাক্টিভিস্ট ও লেখক পিনাকী ভট্টাচার্য একটি ফেসবুক পোস্টে লেখেন, ‘সাবের হোসেন চৌধুরীর বাসায় রাষ্ট্রদূত যাইয়া বৈঠক করে কেমনে?’ ফাইজলামি পাইছেন? সাবের হোসেন চৌধুরীর জামিনের শর্ত কী ছিল? ওরে জামিন দিছেন কি আওয়ামী লীগ নিয়া দেন-দরবার করার লাইগ্যা? হয় এই রাষ্ট্রদূত গুলারে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের অভিযোগে খেদান, নয়তো সাবের হোসেনরে জেলে ভরেন।
প্রসঙ্গত, ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের প্রায় দুই মাস পর গত বছরের ৬ অক্টোবর ঢাকার গুলশান থেকে সাবেক বন ও পরিবেশ মন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরদিন আদালতে হাজির করা হলে বিএনপি কর্মী মকবুল হত্যা মামলায় তাকে ৫ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেন বিচারক। পাশাপাশি খিলগাঁও থানার দুই হত্যা মামলা এবং হত্যাচেষ্টার আরও দুই মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। তবে ৮ অক্টোবর ছয় মামলায় জামিন দিয়ে তাকে এক ঘণ্টার মধ্যে মুক্তি দেওয়া হয়।
রিপোর্টার্স২৪/টিআই/ধ্রুব