| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

কুষ্টিয়ার চরাঞ্চলে আধিপত্যের লড়াইয়ে রক্তাক্ত সংঘর্ষ

reporter
  • আপডেট টাইম: নভেম্বর ০১, ২০২৫ ইং | ১২:৩৭:৪৬:অপরাহ্ন  |  ১৩০০৯৫৯ বার পঠিত
কুষ্টিয়ার চরাঞ্চলে আধিপত্যের লড়াইয়ে রক্তাক্ত সংঘর্ষ

কুষ্টিয়া প্রতিনিধি: কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার পদ্মা নদীর দুর্গম চরাঞ্চল ও সীমান্তসংলগ্ন এলাকাজুড়ে দীর্ঘদিন ধরেই চলছে সন্ত্রাসীদের দৌরাত্ম্য। জমি দখল, ফসল কাটা, চাঁদাবাজি, বালু উত্তোলন, মাদক ও অস্ত্র পাচার—সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ এখন নানা চরের বিভিন্ন বাহিনীর হাতে। এরা একেকজন গড়ে তুলেছে নিজেদের ‘রাজ্য’, যার নাগাল সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।

সাম্প্রতিক সময়ে ‘কাকন বাহিনী’ ও ‘মণ্ডল বাহিনী’র মধ্যে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ঘণ্টাব্যাপী বন্দুকযুদ্ধে তিনজন নিহত হওয়ার পর প্রশাসন নড়েচড়ে বসেছে। ঘটনায় দায়ের করা মামলায় কাকন বাহিনীর প্রধান ‘কাকন’-কে প্রধান আসামি করা হয়েছে। ঘটনার পরদিনই জেলা পুলিশের শতাধিক সদস্য নৌকায় চেপে প্রবেশ করেন পদ্মার দুর্গম চরে। তবে প্রথম দিনের অভিযানে কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।

পুলিশ বলছে, অভিযান শুধু আসামি ধরার জন্য নয়, বরং চরবাসীর মধ্যে নিরাপত্তাবোধ ফিরিয়ে আনাই মূল লক্ষ্য। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) ফয়সাল মাহমুদ বলেন, “আমরা চাই মানুষ যেন বুঝতে পারে—এ চরে আর কোনো সন্ত্রাসীর জায়গা হবে না। প্রশাসনের নজর এখান থেকে সরবে না।”

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দৌলতপুরের এই চরাঞ্চলে প্রায় দুই দশক ধরে একের পর এক সন্ত্রাসী বাহিনীর জন্ম হয়েছে। ২০০০ সালের গোড়ার দিকে ‘পান্না বাহিনী’ ও ‘লালচাঁদ বাহিনী’র উত্থানের সময় থেকেই শুরু হয় চরের দৌরাত্ম্য। সে সময় তাদের ভাগ না দিয়ে কেউ জমির ফসল ঘরে তুলতে পারত না। ২০০০ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত এই দুই বাহিনীর সংঘর্ষে নিহত হয় অন্তত ৪১ জন। তখন পান্নার ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন বর্তমান ‘কাকন বাহিনী’র প্রধান কাকন।

কাকনের জীবনের গল্পটিও নাটকীয়। ১৯৯৪ সালে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বিএসসি পাস করে তিনি ঢাকায় চাকরিজীবন শুরু করেন। পরে প্রবাসে, সৌদি আরবে পাড়ি জমান। কিন্তু ২০০৫ সালে পান্না নিহত হওয়ার পর তিনি দেশে ফিরে আসেন এবং রাজনীতির ছায়ায় আশ্রয় নিয়ে বালুমহাল দখলের মাধ্যমে পুনরায় চরে প্রভাব বিস্তার শুরু করেন। ধীরে ধীরে গড়ে তোলেন নিজস্ব সশস্ত্র বাহিনী—‘কাকন বাহিনী’। বর্তমানে তাঁর বাহিনীতে সদস্যসংখ্যা প্রায় ৪০। পুলিশ জানায়, গত জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত কাকনের বিরুদ্ধে অন্তত ছয়টি মামলা হয়েছে। দৌলতপুরের চরে কাকন বাহিনী একা নয়; এখনো সক্রিয় রয়েছে আরও অন্তত ডজনখানেক বাহিনী।

‘টুকু বাহিনী’: ফিলিপনগর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নইম উদ্দিন সেন্টু হত্যার পর আলোচনায় আসে এ বাহিনী। প্রধান তরিকুল ইসলাম ওরফে টুকু—প্রায় ২০ জন সদস্য তাঁর অধীনে কাজ করে।

‘সাঈদ বাহিনী’: প্রধান আবু সাঈদ মণ্ডল। তাঁর বিরুদ্ধে দৌলতপুর থানায় নয়টির বেশি মামলা রয়েছে।

‘লালচাঁদ বাহিনী’: প্রতিষ্ঠাতা লালচাঁদ নিহত হওয়ার পর তাঁর ভাই সুখচাঁদ নেতৃত্ব নিয়েছেন। এখনো মাদক ও অস্ত্র ব্যবসায় সক্রিয়।
‘রাখি বাহিনী’, ‘কাইগি বাহিনী’, ‘রাজ্জাক বাহিনী’, ‘বাহান্ন বাহিনী’সহ ছোট-বড় আরও কয়েকটি বাহিনী বর্তমানে পদ্মার চরে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে।

গোয়েন্দা সংস্থার সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ৫ আগস্টের পর দৌলতপুর সীমান্ত দিয়ে অন্তত তিন দফায় দেশে প্রবেশ করেছে দুই হাজারেরও বেশি আগ্নেয়াস্ত্র। এসব অস্ত্র এখন ছড়িয়ে পড়েছে চরের বিভিন্ন বাহিনীর হাতে। পুলিশ ধারণা করছে, এই নতুন অস্ত্রের চালানই সাম্প্রতিক সংঘর্ষের মূল জ্বালানি।
একজন সিনিয়র গোয়েন্দা কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “অস্ত্র এসেছে নদীপথে। ভারতীয় সীমান্তঘেঁষা হওয়ায় পাচারকারীরা সহজেই অস্ত্র ঢোকাতে পারছে। এখন এসব অস্ত্র স্থানীয় বাহিনীগুলোর কাছে ভাড়ায় বা অংশীদারিত্বে পৌঁছে যাচ্ছে।”

গত বৃহস্পতিবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রায় ১২০ জন পুলিশ সদস্যের অংশগ্রহণে পদ্মার চরে অভিযান চালানো হয়। যদিও অভিযানে কেউ গ্রেপ্তার হয়নি, তবু স্থানীয়দের মধ্যে স্বস্তির বাতাস বইছে।


রিপোর্টার্স২৪/এসএন

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪