বেনাপোল প্রতিনিধি: যশোরের শার্শা উপজেলার সাতমাইল–গোগা সড়কে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার ও অনিয়মের অভিযোগে স্থানীয়দের বাধার মুখে একদিন কাজ বন্ধ থাকলেও মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে আবারও একইভাবে সিসি ঢালাইয়ের কাজ শুরু হওয়ায় এলাকায় চরম ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, অদৃশ্য ক্ষমতার প্রভাবেই নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে পুনরায় কাজ চালিয়ে যাচ্ছে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও কর্তৃপক্ষ।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় ১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন সাতমাইল–গোগা সড়কে দীর্ঘদিন ধরেই নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার ও ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার (২৫ ডিসেম্বর) শার্শা উপজেলার বসতপুর বাজার এলাকায় ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী কাজ বন্ধ করে দেন। তবে কোনো তদন্ত, নমুনা পরীক্ষা বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ছাড়াই শুক্রবার (২৬ ডিসেম্বর) সকাল থেকে আবারও একই সামগ্রী দিয়ে ঢালাইয়ের কাজ শুরু করা হয়।
এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকেই বলছেন, কাজ বন্ধের ঘোষণাটি ছিল লোক দেখানো। বাস্তবে কোনো ব্যবস্থা না নিয়েই আগের মতোই নির্মাণকাজ চালানো হচ্ছে।
উল্লেখ্য, শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ‘শার্শার বাগআঁচড়ায় সিসি রাস্তা নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগে কাজ বন্ধ’ শীর্ষক সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়টি আরও আলোচনায় আসে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয় পায়ের আঙুল দিয়ে চাপ দিলেই সদ্য ঢালাই করা রাস্তা ভেঙে যাচ্ছে। সংবাদ প্রকাশের পর শার্শা উপজেলা প্রকৌশলী সানাউল্লাহ এবং বাগআঁচড়া ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক রঞ্জু কাজ বন্ধের কথা জানালেও বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি।
সরেজমিনে বসতপুর বাজার এলাকা ঘুরে দেখা যায়, চরম অব্যবস্থাপনার মধ্যেই সড়কের সিসি ঢালাইয়ের কাজ চলছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্মাণকাজে ব্যবহার করা হচ্ছে পুরোনো, ময়লাযুক্ত কালো পাথর, নিম্নমানের ইটের খোয়া ও অপরিষ্কার বালি। নির্ধারিত নকশা অনুযায়ী সিমেন্টের পরিমাণ এবং রডের মানও মানা হচ্ছে না। এতে অল্প সময়ের মধ্যেই সড়কটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, অনিয়মের প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার সকালে তারা নিজেরাই কাজ বন্ধ করে দেন। কিন্তু কোনো তদন্ত ছাড়াই শুক্রবার সকালে আবারও একই পদ্ধতিতে ঢালাই শুরু হয়। তাদের অভিযোগের তীর শার্শা উপজেলা প্রকৌশলী সানাউল্লাহ, বাগআঁচড়া ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক এবং শার্শা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) শাহারিয়ার মাহমুদ রঞ্জুর দিকে। এলাকাবাসীর প্রশ্ন—আগে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সময়ে যদি অনিয়ম হতো, প্রশাসকের তত্ত্বাবধানেও যদি একই চিত্র দেখা যায়, তাহলে পরিবর্তনের সুফল কোথায়?
জানা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রকল্প উন্নয়ন সহায়তা কর্মসূচির আওতায় বাগআঁচড়া ইউনিয়নের সাতমাইল–গোগা ১০ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণে ১৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর মধ্যে বসতপুর স্কুল মোড় থেকে বাজারের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত প্রায় ৩৫০ মিটার সিসি ঢালাই রাস্তার কাজ চলমান রয়েছে। তবে কাজ শুরুর পর থেকেই নকশা ও মানদণ্ড অনুসরণ না করার অভিযোগ উঠছে।
নির্মাণকাজে নিয়োজিত শ্রমিকরা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নাম জানাতে পারেননি। তারা জানান, ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের লোকজন কিছুক্ষণ আগেও ঘটনাস্থলে ছিলেন, তবে সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে দ্রুত সরে যান। কাজ বন্ধ থাকার পর কীভাবে আবার শুরু হলো এ বিষয়ে শ্রমিকদের বক্তব্য অস্পষ্ট ও পরস্পরবিরোধী।
এ বিষয়ে বাগআঁচড়া ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক ও শার্শা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) শাহারিয়ার মাহমুদ রঞ্জু কিছুটা অনিয়মের সত্যতা স্বীকার করে বলেন, স্থানীয়দের অভিযোগ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জানানো হয়েছে। তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শার্শা উপজেলা প্রকৌশলী সানাল্লাহ বলেন, অভিযোগের পর নির্মাণকাজ বন্ধ রাখা হয়েছিল। তবে কাজ পুনরায় শুরু হওয়ার বিষয়ে তিনি অবগত নন। তিনি জানান, রোববার অফিস সময়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে এবং অনিয়মের প্রমাণ পেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে, ঘটনার পর থেকে এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে। তারা দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং নির্ধারিত মান বজায় রেখে নতুন করে কাজ শুরুর জোর দাবি জানিয়েছেন।
রিপোর্টার্স২৪/ঝুম