আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে অপহরণের ঘটনায় শুধু লাতিন আমেরিকাই নয়, মধ্যপ্রাচ্যেও নতুন করে যুদ্ধের আশঙ্কা বাড়ছে। বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াশিংটনের এই পদক্ষেপ ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাতের পথ আরও প্রশস্ত করছে এবং কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগ সংকুচিত করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইসরায়েলি রাজনীতিক ইয়ার লাপিদ তেহরানকে সতর্ক করে বলেন, ভেনেজুয়েলায় যা ঘটছে, ইরানের সরকারকে তা গভীরভাবে লক্ষ্য করা উচিত। এই মন্তব্য আসে এমন এক সময়, যখন এক সপ্তাহেরও কম আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠক করে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন হামলার হুমকি দিয়েছিলেন।
যদিও ওয়াশিংটনের সঙ্গে কারাকাস ও তেহরানের উত্তেজনার পটভূমি ভিন্ন, তবু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাদুরোর বিরুদ্ধে ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিয়েছে।
ন্যাশনাল ইরানিয়ান আমেরিকান কাউন্সিলের (এনআইএসি) সভাপতি জামাল আবদি বলেন, নতুন ধরনের আইনহীনতা পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করছে এবং যুদ্ধকে আরও সম্ভাব্য করে তুলছে। তার মতে, ‘সার্জিক্যাল’ রেজিম চেঞ্জে ট্রাম্প আগ্রহী হয়ে উঠলে বা নেতানিয়াহুকে একই ধরনের পদক্ষেপের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদন দিলে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের পক্ষে থাকা শক্তিগুলো আরও উৎসাহ পাবে।
আবদি সতর্ক করে বলেন, মাদুরো অপহরণের ঘটনা ইরানকে এমন কোনো পদক্ষেপ নিতে প্ররোচিত করতে পারে, যা সরাসরি সামরিক সংঘাত ডেকে আনবে এর মধ্যে সামরিক প্রতিরোধ শক্তি বাড়ানো বা আগাম হামলার উদ্যোগও থাকতে পারে।
সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির সিনিয়র ফেলো নেগার মোর্তাজাভিও বলেন, ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপ ট্রাম্প প্রশাসনের ‘চূড়ান্ত চাপের’ নীতি স্পষ্ট করে দিয়েছে, যা কূটনীতির সম্ভাবনাকে আরও ক্ষীণ করছে। তার ভাষায়, ‘তেহরান থেকে যা শোনা যাচ্ছে, তা হলো এই প্রশাসন আলোচনায় নয়, বরং পূর্ণ আত্মসমর্পণ চায়। ফলে কূটনীতির সুযোগ কমে যাচ্ছে এবং সংঘাতের পথ খুলে যাচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, এই মুহূর্তে ইসরায়েল, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র—তিন পক্ষই সম্ভাব্য সংঘাতের দিকে এগোচ্ছে।
আবদিও একই সুরে বলেন, এই অভিযান যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য নিয়ে ইরানের সন্দেহকে আরও জোরালো করেছে এবং ইরানের ভেতরে যারা মনে করেন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার কোনো মূল্য নেই—তাদের অবস্থান শক্তিশালী হয়েছে।
ইরান–ভেনেজুয়েলা জোট ও তেল প্রসঙ্গ
মাদুরো অপহরণ করে যুক্তরাষ্ট্রে নেওয়ার অভিযানটি আসে ট্রাম্প প্রশাসনের দীর্ঘদিনের কড়া বক্তব্যের পর। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা মাদুরোর বিরুদ্ধে মাদকচক্র পরিচালনার অভিযোগ তুলেছেন এবং ট্রাম্প ও তার সহযোগীরা ক্রমেই দাবি করছেন, ভেনেজুয়েলার বিপুল তেলসম্পদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অধিকার রয়েছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও মাদুরোর সঙ্গে ইরানের সম্পর্কের বিষয়টি বারবার তুলে ধরছেন। তার অভিযোগ, প্রমাণ ছাড়াই, ভেনেজুয়েলা লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহকে পশ্চিম গোলার্ধে কার্যক্রম চালানোর সুযোগ দিয়েছে।
ইরান ও ভেনেজুয়েলা দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা এই দুই দেশ দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য আরও জোরদার করার চেষ্টা করছে, যার পরিমাণ কয়েক বিলিয়ন ডলার বলে ধারণা করা হয়। মাদুরোর পতনের ফলে ইরানের বৈশ্বিক মিত্রদের সংখ্যা আরও কমে যেতে পারে—সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদের পতন ও লেবাননে হিজবুল্লাহর দুর্বলতার পর।
ইরান সরকার দ্রুত যুক্তরাষ্ট্রের এই অভিযানের নিন্দা জানিয়ে জাতিসংঘকে ‘অবৈধ আগ্রাসন’ বন্ধে হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, “একটি স্বাধীন ও জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক আগ্রাসন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শান্তি-নিরাপত্তার গুরুতর লঙ্ঘন।”
এদিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, “আমরা শত্রুর কাছে মাথা নত করব না। বরং শত্রুকেই হাঁটু গেড়ে বসতে বাধ্য করব।”
ট্রাম্পের হুমকি ও যুদ্ধের আশঙ্কা
গত সপ্তাহে ট্রাম্প আবারও হুঁশিয়ারি দেন, ইরান যদি ক্ষেপণাস্ত্র বা পারমাণবিক কর্মসূচি পুনর্গঠন করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে হামলা চালাবে। তিনি বলেন, “ওরা যদি আবার ঘুরে দাঁড়াতে চায়, আমরা ওদের গুঁড়িয়ে দেব।”
এর আগে জুনে ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে, যেখানে দেশটির শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা, পারমাণবিক বিজ্ঞানী ও শত শত বেসামরিক মানুষ নিহত হন। যুক্তরাষ্ট্রও এতে অংশ নিয়ে ইরানের প্রধান তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলা চালায়। যদিও ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ‘ধ্বংস’ করা হয়েছে, বাস্তবে ইরানের শাসনব্যবস্থা টিকে আছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের মতো দেশে ভেনেজুয়েলার আদলে ‘সরকার অপসারণ অভিযান’ চালানো অনেক বেশি জটিল ও বিপজ্জনক হবে। কারণ, ইরানের পাল্টা জবাব দেওয়ার সক্ষমতা অনেক বেশি।
মাদুরো ছাড়া ভেনেজুয়েলা
এদিকে মাদুরো অপসারণের পরও ভেনেজুয়েলায় এখনো সরকার ভেঙে পড়েনি। ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ, যিনি বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট, বলেছেন—মাদুরোই ভেনেজুয়েলার বৈধ নেতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের হামলার তীব্র নিন্দা জানান। তিনি অভিযোগ করেন, এই অভিযানে ইসরায়েলের হাত থাকতে পারে।
ট্রাম্প পাল্টা হুমকি দিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের দাবি না মানলে রদ্রিগেজকে “মাদুরোর চেয়েও বড় মূল্য দিতে হবে”।
বিশ্লেষকদের মতে, ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদ নিয়ন্ত্রণে নিতে ট্রাম্প প্রশাসনকে আরও সামরিক পদক্ষেপ নিতে হতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদি অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র জড়িয়ে পড়লে ইরানের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর সক্ষমতা ও আগ্রহ কমে যেতে পারে বলেও মত দিয়েছেন কেউ কেউ।
রিপোর্টার্স২৪/এসসি