স্টাফ রিপোর্টার: গত এক দশকে বাংলাদেশে অন্তত এক লাখ ৩০ হাজার শিশু ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছে। প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১৩ হাজার শিশু নতুন করে এই রোগে শনাক্ত হচ্ছেন বলে দ্য ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি অব পেডিয়াট্রিক অনকোলজি জানিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সময়মতো শনাক্ত ও সঠিক চিকিৎসা করলে অধিকাংশ শিশুই নিরাময়যোগ্য, কিন্তু চিকিৎসা ব্যয় ও অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
রোববার (১৫ ফেব্রুয়ারি) দেশে ‘বিশ্ব শিশু ক্যান্সার দিবস’ পালিত হচ্ছে। এবারের প্রতিপাদ্য ‘শিশু ক্যান্সারের প্রভাব তুলে ধরা চ্যালেঞ্জ পেরিয়ে পরিবর্তন’। দিবস উপলক্ষে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সভা ও কর্মসূচি আয়োজন করা হয়েছে।
চিকিৎসা কেন্দ্র আছে, কিন্তু সেবা সীমিত
দেশের ১৪টি সরকারি হাসপাতালসহ কিছু স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে শিশু ক্যান্সারের চিকিৎসা দেওয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট এবং অন্যান্য মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। তবে ঢাকা ও চট্টগ্রাম ছাড়া অধিকাংশ জেলায় উন্নত পরীক্ষা, বিশেষ করে জেনেটিক অ্যানালাইসিসের সুবিধা সীমিত।
আব্দুল্লাহ মাহাদীর লড়াই
উত্তরা, ঢাকার একটি পরিবারের সাত বছরের সন্তান আব্দুল্লাহ মাহাদী দুই বছর ধরে ব্লাড ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করছে। প্রথমে হঠাৎ জ্বর ও চোখের সমস্যা ধরা পড়ে। স্থানীয় ক্লিনিকে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ব্লাড ক্যান্সার শনাক্ত হয়। এরপর শুরু হয় দীর্ঘ চিকিৎসা-সংগ্রাম।
মাহাদীর মা মৌসুমী আক্তার বলেন, প্রথমে বুঝতেই পারিনি এত বড় রোগ। একের পর এক পরীক্ষা, কেমোথেরাপি– সব মিলিয়ে জীবনটাই উলটপালট হয়ে গেছে। ছেলের চিকিৎসায় দুই বছরে খরচ হয়েছে ১০ লাখ টাকার বেশি। ধারদেনা করে চিকিৎসা চালাচ্ছি, এখন আর কোথা থেকে টাকা জোগাড় করব– জানি না।
শিশু মাহাদীর মতো অসংখ্য পরিবারই ক্যান্সারের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করতে না পেরে আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে।
বিশেষজ্ঞ সংকট
দেশে কঠিন টিউমার অপসারণে প্রশিক্ষিত শিশু সার্জনের অভাব রয়েছে। পেডিয়াট্রিক হেমাটোলজি ও অনকোলজি সোসাইটি অব বাংলাদেশের প্রায় ৬০ জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রয়েছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সাবেক প্রধান অধ্যাপক ড. এ কে এম আমিরুল মোরশেদ খসরু বলেন, “প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করলে ৯০–৯৫% শিশু ক্যান্সার নিরাময়যোগ্য। কিন্তু অধিকাংশ রোগী শেষ মুহূর্তে হাসপাতালে আসে। চিকিৎসা কেন্দ্র এখনও ঢাকায় কেন্দ্রীভূত।”
সবচেয়ে বেশি দেখা যায়
শিশুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রক্তের ক্যান্সার, হজকিন ও নন-হজকিন লিম্ফগ্রন্থির ক্যান্সার, উইলমস টিউমার, মস্তিষ্কের টিউমার, নিউরোব্লাস্টোমা এবং অস্টিওসারকোমা দেখা যায়। মৃত্যুহার তুলনামূলকভাবে বেশি রক্তক্যান্সার, নিউরোব্লাস্টোমা, অস্টিওসারকোমা ও মস্তিষ্কের টিউমারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় ১৫ লাখ ক্যান্সার রোগী আছে। প্রতিবছর দেড় থেকে দুই লাখ নতুন রোগী শনাক্ত হচ্ছে। জনসংখ্যা অনুপাতে প্রয়োজন প্রায় ১৮০টি রেডিওথেরাপি মেশিন, অথচ আছে মাত্র ২০টি। একজন রোগীকে রেডিওথেরাপির জন্য তিন থেকে চার মাস অপেক্ষা করতে হয়।
চিকিৎসা ব্যয় বড় বাধা
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) অনুসারে, ক্যান্সার চিকিৎসায় ব্যয় সর্বনিম্ন ৮১ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা। একজন রোগীর গড় ব্যয় প্রায় ৫ লাখ ৪৭ হাজার ৮৪০ টাকা। ব্যয়ভার বহন করতে না পেরে প্রায় ৪০% রোগী চিকিৎসা ছেড়ে দেন। অধিকাংশ ওষুধ আমদানিনির্ভর হওয়ায় দাম ও সরবরাহ অনিশ্চিত।
জাতীয় নিবন্ধনের অভাব
দেশে এখনো জাতীয় ক্যান্সার নিবন্ধন নেই। ফলে কোন এলাকায় কী ধরনের ক্যান্সার বেশি, মৃত্যুহার কত– এসব নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া কঠিন। বিশেষজ্ঞদের মতে, কার্যকর নীতিনির্ধারণ ও প্রতিরোধমূলক কর্মসূচির জন্য জাতীয় নিবন্ধন জরুরি।
ডা. মো. জাহাঙ্গীর কবীর জানান, শুরু থেকে প্যালিয়েটিভ কেয়ার প্রয়োজন, কিন্তু দেশে শতকরা এক ভাগেরও কম শিশু এটি পায়। প্রয়োজনীয় ওষুধ, বিশেষ করে মরফিন সিরাপের ঘাটতি রয়েছে। চিকিৎসা, অবকাঠামো, বিশেষজ্ঞ সংকট ও ব্যয়ের ভার মিলিয়ে শিশু ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াই এখনও কঠিন।
চিকিৎসা বিকেন্দ্রীকরণ, জাতীয় নিবন্ধন চালু ও পর্যাপ্ত রেডিওথেরাপি মেশিন স্থাপন হলে শিশু ক্যান্সার চিকিৎসায় দৃশ্যমান অগ্রগতি সম্ভব। ইতিমধ্যে কিছু হাসপাতাল শিশু ক্যান্সারের সেবা বাড়াতে উদ্যোগ নিয়েছে।
রিপোর্টার্স২৪/ঝুম