সনৎ চক্রবর্তী, ফরিদপুর: শীতের শেষে ও বসন্তের শুরুতে গ্রামীণ বাংলার আনাচে-কানাচে কিংবা সড়কের পাশে অযত্নে ফুটে থাকা ভাটিফুল শোভা ছড়াচ্ছে। স্থানভেদে এটির নাম ভাটি ফুল, ভাটফুল, ঘেটু ফুল, ভাত ফুল, ঘণ্টাকর্ণ হলেও ফরিদপুর অঞ্চলে ‘ভাটিফুল’ নামেই পরিচিত।
উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের মতে, ভাট গাছের বৈজ্ঞানিক নাম Clerodendrum infortunatum। এটি Lamiaceae পরিবারের অন্তর্ভুক্ত একটি সপুষ্পক ঝোপজাতীয় উদ্ভিদ। সাধারণত গাছটি তিন থেকে পাঁচ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়। এর কাণ্ড সবুজাভ ও শক্ত প্রকৃতির। পাতা বড়, ডিম্বাকার এবং কিছুটা রুক্ষ। পাতায় এক ধরনের তীব্র গন্ধ রয়েছে। ভাট গাছের ফুল সাদা ও হালকা গোলাপি আভাযুক্ত এবং গুচ্ছাকারে ফোটে। ফুলের মাঝখানে লম্বা পুংকেশর বেরিয়ে থাকে, যা দেখতে আকর্ষণীয়। ভাটফল প্রথমে সবুজ এবং পাকার পর নীলচে-কালো রং ধারণ করে।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, বসন্তের আগমনে পলাশ-শিমুলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এ ফুল ফোটে। ফাল্গুন ও চৈত্র মাসে এটি বেশি দেখা যায়। বিশেষ করে পরিত্যক্ত মাঠ, বন, রাস্তা কিংবা জলাশয়ের পাশে ভাটিফুলের ঝোপ চোখে পড়ে। ভাট গাছের প্রধান কাণ্ড সোজাভাবে দণ্ডায়মান। সাধারণত ২ থেকে ৪ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয় গাছটি। এর পাতা কিছুটা পানপাতার আকৃতির ও খসখসে। ডালের শীর্ষে পুষ্পদণ্ডে ফুল ফোটে। পাপড়ির রং সাদা, এতে বেগুনি রঙের মিশ্রণ থাকে। বসন্ত থেকে গ্রীষ্ম অবধি ফুল ফোটে। এ ফুলে রয়েছে মিষ্টি সৌরভ; রাতে বেশ সুঘ্রাণ ছড়ায়। ফুল ফোটার পর মৌমাছিরা ভাটিফুলের মধু সংগ্রহ করে।
ফরিদপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ভাটিফুলের কমবেশি দেখা মেলে। অযত্নে-অবহেলায় ফুটে থাকা ভাটি যেন বিশাল ফুলের তোড়া। চৈত্রের শুরু থেকেই দেখা মিলছে এই ভাটিফুলের। অনেকে এটিকে বনজুঁই বা ঘেটু ফুল নামেও চেনেন। তবে স্থানীয়রা বলছেন, বর্তমানে আগের তুলনায় ভাটিফুল কম দেখা যাচ্ছে।
প্রকৃতির কবি জীবনানন্দ দাশ-ও পড়েছিলেন ভাটিফুলের প্রেমে। তাই তো তিনি তার ‘বাংলার মুখ’ কবিতায় লিখেছেন, ‘ছিন্ন খঞ্জনার মতো যখন সে নেচেছিল ইন্দ্রের সভায়/ বাংলার নদী মাঠ ভাট ফুল ঘুঙুরের মতো তার কেঁদেছিল পায়।’
ফরিদপুর জেলার বোয়ালমারী উপজেলার ময়না সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক কালিপদ চক্রবর্তী বলেন, ভাটি ফুল সৌন্দর্যপ্রিয় মানুষের মনের খোরাক জোগায়। রাস্তার পাশে ও পরিত্যক্ত জমিতে অনাদরে-অবহেলায় বেড়ে ওঠা ভাট গাছের ফুল বসন্তে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে বাড়তি মাত্রা যোগ করে। পথচারীরা উপভোগ করেন আবহমান বাংলার আদি বুনো ফুলের অপরূপ সৌন্দর্য।
অর্ক চক্রবর্তী নামে এক স্কুলছাত্র বলেন, ফাল্গুন মাস এলেই প্রকৃতিতে ফোটে ভাটিফুল। এতে পরিবেশে নতুন মাত্রা যোগ হয়। বসন্তের আগমনে পলাশ-শিমুলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এই ফুল ফোটে। ফাল্গুন ও চৈত্র মাসে বিশেষ করে রাস্তার দুপাশ, পরিত্যক্ত মাঠ, বন কিংবা জলাশয়ের পাশে এ ফুল দেখা যায়।
রিপোর্টার্স২৪/এসএন