আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইসরায়েলে নতুন করে হামলা চালিয়েছে ইরানএবং ‘পূর্ণ বিজয়’ না পাওয়া পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে তেহরান। এর মাত্র একদিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিরসনে ইরানের সঙ্গে ‘গুরুত্বপূর্ণ ও ফলপ্রসূ আলোচনা’ হয়েছে বলে দাবি করেছিলেন,যা ইরান সরাসরি অস্বীকার করেছে।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে ইরানি সামরিক কর্মকর্তা আলী আব্দোল্লাহি আলিয়াবাদি বলেন, দেশের সশস্ত্র বাহিনী “ইরানের মর্যাদা ও বিজয় রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ” এবং এই লড়াই অব্যাহত থাকবে।
সংঘাত আরও তীব্র হওয়ার ইঙ্গিত দিয়ে ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী রক্ষী বাহিনী (আইআরজিসি) জানিয়েছে, ইসরায়েল যদি লেবানন ও গাজায় হামলা বন্ধ না করে, তাহলে উত্তর ইসরায়েল ও গাজার নিকটবর্তী এলাকায় ইসরায়েলি বাহিনীর ওপর ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হবে। আইআরজিসি-সংশ্লিষ্ট বার্তা সংস্থা তাসনিমের বরাতে বলা হয়েছে, ইসরায়েল ইতোমধ্যে ‘সব লাল রেখা অতিক্রম করেছে’।
মঙ্গলবার ভোরে ইসরায়েল ডিফেন্স ফোর্স (আইডিএফ) জানায়, মধ্য ও দক্ষিণ ইসরায়েলের বিভিন্ন স্থানে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাতের খবর পাওয়ার পর সেখানে অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দল পাঠানো হয়েছে। তেল আবিবে ক্ষতিগ্রস্ত বহুতল ভবন ও যানবাহনের ভিডিওও প্রকাশ করেছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী।
ইরানের মতোই ইসরায়েলও তাদের সামরিক অভিযান কমানোর কোনো ইঙ্গিত দেয়নি। দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, হামলার পরিধি আরও বাড়বে। তিনি জানান, ইরান ও লেবাননে হামলা অব্যাহত রয়েছে এবং ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংসের লক্ষ্যেই এই অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। পাশাপাশি হিজবুল্লাহর ওপরও কঠোর আঘাত অব্যাহত থাকবে।
নেতানিয়াহু আরও জানান, তার সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কথা হয়েছে এবং ট্রাম্প মনে করেন, একটি সমঝোতার মাধ্যমে যুদ্ধের লক্ষ্য অর্জনের সুযোগ রয়েছে।
এদিকে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ জানিয়েছেন, হিজবুল্লাহবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে দক্ষিণ লেবাননের একটি বড় অংশ দখলে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে ইসরায়েল ঘোষণা দিয়েছে, ইরানের বিভিন্ন অঞ্চলে সামরিক উৎপাদন কেন্দ্রগুলোতে বড় পরিসরে নতুন হামলা চালানো হয়েছে। আইডিএফের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরানে তিন হাজারেরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে।
এই পরিস্থিতি ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সোমবার তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ‘গঠনমূলক আলোচনা’ হয়েছে এবং এর প্রেক্ষিতে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলার পরিকল্পনা স্থগিত রাখা হয়েছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, আলোচনা সফল না হলে হামলা অব্যাহত থাকবে।
ফ্লোরিডা থেকে এয়ার ফোর্স ওয়ানে ওঠার আগে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ইরান চুক্তি করতে আগ্রহী, তবে সমঝোতা না হলে যুদ্ধ চলবে। তিনি আরও দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের একজন ‘উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তির’ সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে,যিনি নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি নন।
তবে ট্রাম্পের এই দাবি দ্রুত প্রত্যাখ্যান করে ইরান। দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবফ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি। তিনি এসব দাবি ‘ভুয়া খবর’ আখ্যা দিয়ে বলেন, এটি তেলবাজারে প্রভাব ফেলতে এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের জটিলতা আড়াল করতেই প্রচার করা হচ্ছে।
সংঘাত নিরসনে মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছে শেহবাজ শরীফের নেতৃত্বাধীন পাকিস্তান সরকার। ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে এ প্রস্তাবের কথা স্বীকার করেছেন।
এদিকে যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বাড়ছে। মঙ্গলবার ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম আবারও ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে। এই পরিস্থিতির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে হরমুজ প্রণালী যেখানে দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবাহিত হয়। এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথকে কৌশলগত চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে ইরান, ফলে তেল ও তরলীকৃত গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলে জ্বালানি স্থাপনাগুলোর ওপর হামলায় উৎপাদন ও রপ্তানিও ব্যাহত হয়েছে। কাতারের রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি কাতার এনার্জি জানিয়েছে, রাস লাফান গ্যাস হাবে হামলার ফলে রপ্তানি সক্ষমতা ১৭ শতাংশ কমে গেছে এবং পুরোপুরি পুনরুদ্ধারে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে।
জ্বালানি সংকটের আশঙ্কায় ফার্ডিনান্ড মার্কোস জুনিয়র জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ ও স্থিতিশীলতার জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করেছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। উরসুলা ভন ডের লেয়েন বলেছেন, দ্রুত আলোচনার টেবিলে ফিরে গিয়ে সংঘাতের অবসান ঘটানো জরুরি। তার মতে, এই সংকট বিশ্বব্যাপী তেল-গ্যাসের দামে বড় প্রভাব ফেলছে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান-ইসরায়েলের এই চলমান পাল্টাপাল্টি হামলা দ্রুত থামার কোনো লক্ষণ নেই। বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যকে আরও বড় আঞ্চলিক সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে, যার প্রভাব পড়ছে পুরো বিশ্বের অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তায়। সূত্র: টাইম
রিপোর্টার্স২৪/এসসি