আন্তর্জাতিক ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। বুধবার ইসরায়েল ও ইরান পরস্পরের ওপর নতুন করে বিমান হামলা চালিয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আলোচনার দাবিকে সরাসরি নাকচ করেছে ইরানের সামরিক নেতৃত্ব।
রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর সমন্বিত কমান্ড—যেখানে কট্টরপন্থি ইসলামিক বিপ্লবী রক্ষী বাহিনী (আইআরজিসি)-এর প্রভাব রয়েছে,জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র আসলে ‘নিজেদের সঙ্গেই আলোচনা করছে’।
ইরানের যৌথ সামরিক কমান্ডের মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাগারি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বলেন, ট্রাম্প কি নিজের সঙ্গেই আলোচনার পর্যায়ে পৌঁছে গেছেন? তিনি আরও বলেন, আমাদের মতো মানুষদের সঙ্গে আপনাদের মতো মানুষের কখনও সমঝোতা হবে না এখন নয়, কখনওই নয়।
ইরানের নেতৃত্ব আগেই জানিয়ে এসেছে, গত দুই বছরে উচ্চপর্যায়ের আলোচনার সময় যুক্তরাষ্ট্র দু’বার হামলা চালানোর কারণে তারা ওয়াশিংটনের সঙ্গে আর আলোচনায় বসতে আগ্রহী নয়।
চার সপ্তাহ ধরে চলা এই যুদ্ধে হাজারো মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি ও আর্থিক বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বুধবারও দুই পক্ষের হামলা অব্যাহত ছিল।
ইসরায়েল ডিফেন্স ফোর্সেস (আইডিএফ) জানায়, তারা তেহরানের বিভিন্ন অবকাঠামো লক্ষ্য করে নতুন করে হামলা চালিয়েছে। ইরানের আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, এসব হামলায় আবাসিক এলাকাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ধ্বংসস্তূপে উদ্ধার অভিযান চলছে।
অন্যদিকে ইরানও পাল্টা হামলা জোরদার করেছে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের বরাতে জানা যায়, তেল আবিব ও কিরিয়াত শমোনাসহ ইসরায়েলের বিভিন্ন স্থানে নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। পাশাপাশি কুয়েত, জর্ডান ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।
এদিকে কুয়েত ও সৌদি আরব জানিয়েছে, তারা নতুন ড্রোন হামলা প্রতিহত করেছে। কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের একটি জ্বালানি ট্যাংকে হামলার ফলে আগুন লাগলেও কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
সংঘাতের মধ্যেই ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে ‘সঠিক ব্যক্তিদের’ সঙ্গে আলোচনা করছে এবং তেহরান একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে আগ্রহী। তবে ইরানের পক্ষ থেকে তা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।
অন্যদিকে মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কাছে ১৫ দফা প্রস্তাব পাঠিয়েছে। ইসরায়েলি গণমাধ্যমের তথ্যমতে, এই প্রস্তাবের অংশ হিসেবে এক মাসের যুদ্ধবিরতির পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করা, লেবাননের হিজবুল্লাহসহ বিভিন্ন প্রক্সি গোষ্ঠীর প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার এবং হরমুজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত করার বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলার মধ্য দিয়ে এই যুদ্ধের সূচনা হয়। এরপর থেকে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে এবং কার্যত হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিয়েছে যার মাধ্যমে বিশ্বে প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস পরিবাহিত হয়।
এর ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। এশিয়ার দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, কারণ এই অঞ্চলের দেশগুলো হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত তেলের ৮০ শতাংশেরও বেশি আমদানি করে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি (আইইএ) জরুরি মজুদ থেকে প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এদিকে সংঘাত নিরসনে মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছে পাকিস্তান। দেশটির প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনার আয়োজন করতে তার দেশ প্রস্তুত।
তবে কূটনৈতিক তৎপরতার পাশাপাশি সামরিক প্রস্তুতিও বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। জানা গেছে, মার্কিন সেনাবাহিনীর এলিট ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের হাজারো সেনা মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে সেখানে প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে, যা সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা আরও বাড়িয়ে তুলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, একদিকে আলোচনার আলোচনা, অন্যদিকে পাল্টাপাল্টি হামলা এই দ্বিমুখী পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যকে আরও বড় ও দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। রয়টার্স
রিপোর্টার্স২৪/এসসি