স্টাফ রিপোর্টার: আমি মোবারক। দিনমজুরের কাজ করি। কর্মে গেলে রোজ পাই মানে টাকা পাই, না গেলে রোজ পাওয়া তো দূরের কথা কেউ খোঁজ নিতে চায় না। শুনেছি মে দিবস আছে, কিন্তু সেখানে যাই টাই না।
মোবারকের মতো অনেক শ্রমিক আজও জানে না, মে দিবস আসলে কী, কেন পালন করা হয়। যাদের ঘাম ঝরে, যাদের শ্রমে শহর চলে, দেশ চলে, তাদের কাছেই পৌঁছায় না এই দিবসের প্রকৃত অর্থ। অথচ শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়, ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও সম্মানজনক জীবনের দাবিতে বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর পহেলা মে, মহান মে দিবস পালিত হয়। তেমনি আজ মাহান মে দিবস। কিন্তু বাস্তবতা হলো, মে দিবস পালিত হয়, শোভাযাত্রা হয়, বক্তৃতা হয়; শুধু মোবারকদের জীবনে পরিবর্তন আসে না।
ঢাকার একটি ব্যস্ত স্থানে দাঁড়িয়ে থাকা দিনমজুর মোবারককে দেখেই বোঝা যায়, শরীরটা আসলে কালো নয়, বরং বছরের পর বছর রোদে পুড়ে, ঘাম ঝরানো কঠোর দিনমজুরের খাটুনিতেই মোবারকের চামড়া এমন রঙ ধারণ করেছে। গলায় গামছা, গেঞ্জি ও লুঙ্গি পরে ঢাকার এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে ছিলেন ৩৩ বছর বয়সের দিনমজুর মোবারক। তাকে দেখেই বোঝা যাচ্ছিল, দীর্ঘ পরিশ্রমে তিনি ক্লান্ত। কাছে গিয়ে কথা বলতেই প্রথমে কিছুটা ভীত ও হতবিহ্বল মনে হলেও পরে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে কথা বলতে শুরু করেন তিনি।
মোবারক জানান, তিনি দিনমজুরের কাজ করেন। কখনো নির্মাণাধীন ভবনে মিস্ত্রির সহকারী হিসেবেও কাজ করেন। ঠিকাদারের অধীনে দৈনিক ৬০০ টাকা মজুরি। শুক্রবার তিনি সাধারণত কাজ করেন না। শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কথা বলতে গিয়ে যখন মে দিবসের প্রসঙ্গ ওঠে, মোবারক প্রায় ৩০ সেকেন্ড নীরব থাকেন। পরে ধীর কণ্ঠে বলেন, মে দিবসের কথা শুনেছি, কিন্তু কখনো যাইনি। বাবা-মাও বলেনি। আমাদের সবসময় কাজের মধ্যেই থাকতে হয়।
তিনি আরও জানান, তার বাবা কয়েক বছর আগে মারা গেছেন। মা অসুস্থ। নিজেরও এখনো বিয়ে হয়নি।
মোবারক বলে, বর্তমানে ঠিকাদারের তত্ত্বাবধানে কাজ করতে গেলে বড় বড় ভবনে তারা নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রাখে। কাজের বিনিময়ে প্রতিদিনের মজুরি দিয়ে দেয়। কিন্তু আমরা যদি কখনো বিপদে পড়ি অথবা অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে থাকি। তখন আমাদের কেউ খোঁজ খবর নেয় না। কাজ করলেই তাদের কাছে আমাদের মূল্যায়ন, এছাড়া মানবতা ভালোবাসা বলে কিছুই নেই।
মোবারক এক পর্যায়ে বলেন, মে দিবস আমার মতন অনেক দিনমজুর, শ্রমিক জানে না। যেহেতু আমি জানিনা, তাহলে আমার সঙ্গীরাও যদি জানত, আমার সঙ্গে আলাপ করত, নিশ্চয়ই তারাও জানে না।
মোবারকের বাড়ি চট্টগ্রাম পাহাড়তলী উপজেলা সিটি গেট এলাকায়। এখানেই দুই রুমের একটি বাসা ভাড়া করে তিন ভাই মাকে নিয়ে থাকেন। মোবারক দিনমজুরের কাজ করলেও অন্যান্য ভাই কেউ ভ্যান চালায় ও আরেক ভাই টুকটাক কাজ করে। এসব কথাগুলো দিনমজুর মোবারক তার জেলার ভাষায় বলেছে, সেগুলো স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলা হলো।
এ সকল শ্রমিক মে দিবসই জানে না, শ্রম আইন জানবে কিভাবে। তাছাড়া তারা মূল ঠিকাদারের তত্ত্বাবধানে সরাসরিও কাজ করতে পারে না, মে দিবসকে বুদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে দেয়। খোঁজখবর নিয়ে দেখুন মূল ঠিকাদারের তত্ত্বাবধানে অপর একজন সাব ঠিকাদার থাকে। সেই দ্বিতীয় ঠিকাদারের তত্ত্বাবধানে আরেকজন সরদার থাকে। সরদারের তত্ত্বাবধানে শ্রমিকরা কাজ করে থাকে।
বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) রাতে মোবারকের সঙ্গে কথা বলায় সময়, উপস্থিত দুই একজন বলেন- এইসব শ্রমিক ও দিনমজুররা মে দিবস সম্পর্কে আর কতটুকু জানবে।
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব