মেহেরপুর প্রতিনিধি: সবুজ পাতার ঘন বুননের ফাঁকে ফাঁকে ঝুলছে থোকা থোকা আঙুর। কোনোটি গাঢ় কালো, কোনোটি লাল, আবার কোনোটি হালকা সবুজ আভা ধারণ করেছে। মরুভূমির এই রসালো ফল এখন আর মেহেরপুরের মানুষের কাছে কেবল দূর দেশের স্বপ্ন নয়, বরং হাতের নাগালে থাকা এক উজ্জ্বল বাস্তবতা।
মেহেরপুরের মুজিবনগর উপজেলার শিবপুর গ্রামের শারীরিক প্রতিবন্ধী উদ্যোক্তা শরিফুল ইসলাম ও তাঁর স্ত্রী মিম মিলে বসতবাড়ির আঙিনা ও পতিত জমিতে গড়ে তুলেছেন এক স্বপ্নিল আঙুর বাগান। তাঁদের এই অভাবনীয় সাফল্য এখন এলাকার বেকার যুবকদের জন্য অনুপ্রেরণার এক জীবন্ত উৎস।
বাগান ঘুরে দেখা যায়, বসতবাড়ির প্রবেশমুখেই মাচায় মাচায় থোকায় থোকায় ঝুলছে রঙিন আঙুর। ফলের ভারে নুয়ে পড়া এই ডালগুলো যেন কেবল ফল নয়, বরং এক অদম্য দম্পতির ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প বলছে।
এই দীর্ঘ পথচলায় শরিফুলের ছায়ার মতো পাশে ছিলেন তাঁর স্ত্রী মিম। প্রতিদিনের কঠোর পরিশ্রম, গাছের পরিচর্যা আর স্বামীকে প্রতিনিয়ত সাহস জুগিয়ে তিনি এই বাগান তৈরিতে সমান অবদান রেখেছেন। শুরুর দিকে চারপাশের মানুষের নানা উপহাস ও কটু কথাকে উপেক্ষা করে এই দম্পতি তাঁদের লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হননি।
ইতিমধ্যেই শরিফুলের এই বিষমুক্ত ও সুস্বাদু আঙুর বাগান দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে ভিড় জমাচ্ছেন উৎসুক মানুষ। কেউ আসছেন সরাসরি বাগান থেকে সতেজ আঙুর কিনতে, আবার কেউ আসছেন নিজের জমিতে নতুন বাগান করার স্বপ্ন নিয়ে চারা সংগ্রহ করতে।
বাগান থেকে আঙুর ও চারা নিতে আসা ভবেরপাড়া ক্যাথলিক চার্চের ফাদার তাপস হালদার নিজের অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করে বলেন,
"আঙুর বাগানের কথা জানতে পেরে এখানে এসেছি। এটি সত্যিই অসাধারণ একটি বাগান। বিদেশি ফল হলেও বাংলার মাটিতে যে এত সুন্দর ও মানসম্মত আঙুর ধরা সম্ভব, তা আমার ধারণায় ছিল না। বাজার থেকে আমরা যে আঙুর কিনি, তার চেয়ে এই বাগানের আঙুর অনেক বড়, রসালো এবং মিষ্টি। সরাসরি বাগান থেকে ফল ছেঁড়ার অনুভূতিটাই অন্যরকম।"
শরিফুলের এই সফলতার পেছনের গল্পটি চরম অদম্য সংগ্রামের। অতীত জীবনের স্মৃতি চারণ করে শরিফুল বলেন,
"শৈশবে ফুটবল খেলতে গিয়ে বাম হাতে আঘাত পেয়েছিলাম। পরে গ্রাম্য চিকিৎসকের ভুল চিকিৎসায় হাতে পচন ধরে এবং শেষ পর্যন্ত হাতটি কেটে ফেলতে হয়। এক হাত হারিয়ে জীবনযুদ্ধে প্রায় কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলাম। ভারী কাজে অক্ষমতা আর ব্যবসায় মন্দার কারণে যখন চারদিকে অন্ধকার দেখছিলাম, তখনই আশার আলো হয়ে আসে একটি সাধারণ আঙুরের চারা। প্রায় দুই বছর আগে এক প্রতিবেশীর কাছ থেকে পাওয়া সেই চারাটি রোপণের পর যখন মিষ্টি ফল আসে, তখন থেকেই বাণিজ্যিক চাষের চিন্তা মাথায় আসে। এরপর ইউটিউবে বিদেশের আধুনিক বাগান দেখে এবং প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে ভারত থেকে উন্নত জাতের চারা সংগ্রহ করি।"
বর্তমানে শরিফুলের ১২ কাঠা জমিতে একোলো, বাইকুনুর, ব্ল্যাক ম্যাজিক, জয় সিডলেস, অস্ট্রেলিয়া কিং, ভেলেস, ডিগসন ও সিলভার মতো বিশ্বখ্যাত সব জাতের আঙুর রয়েছে।
স্বামীর এই কৃষি বিপ্লবের মিম বলেন, "প্রতিদিন সূর্য ওঠার আগেই গাছের যত্ন নেওয়া, নিড়ানি দেওয়া আর সম্পূর্ণ জৈব সারের মাধ্যমে পোকামাকড় দমন সবই আমরা দুজনে মিলে করেছি। প্রথমে অনেকেই আমাদের এই বাগান দেখে উপহাস করে বলেছিলেন এই মাটিতে মিষ্টি আঙুর হবে না। কিন্তু আমি আমার স্বামীকে হতাশ হতে দিইনি। আজ যখন বাগানভর্তি মিষ্টি ফল ঝুলে থাকতে দেখি, তখন মনে হয় আমাদের সব শ্রম সার্থক হয়েছে।"
শরিফুল ও মিমের এই যৌথ উদ্যোগ প্রমাণ করেছে যে, শারীরিক সীমাবদ্ধতা বা প্রতিকূল পরিবেশ কোনোটিই বড় বাধা নয়, যদি থাকে সঠিক পরিকল্পনা, আত্মবিশ্বাস আর কঠোর পরিশ্রম। তাঁদের এই অভিনব কৃষি উদ্যোগ মেহেরপুরের অর্থনীতিতে ও ফল চাষে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে।
রিপোর্টার্স২৪/মিতু