নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি: এক বছরেরও বেশি সময় কারাভোগের পর জামিনে মুক্ত হয়ে নিজ বাসভবন ‘চুনকা কুটিরে’ ফিরেছেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি সেলিনা হায়াৎ আইভী। বুধবার (৩ জুন) রাত সোয়া ১০টার দিকে গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগার থেকে মুক্তি পান তিনি। পরে দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে নারায়ণগঞ্জ শহরের দেওভোগ এলাকায় অবস্থিত নিজ বাসভবনে পৌঁছান।
কারামুক্তির পর বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই তার খোঁজখবর নিতে আত্মীয়-স্বজন, ঘনিষ্ঠজন, কর্মী-সমর্থক ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা চুনকা কুটিরে আসতে শুরু করেন। তবে প্রশাসনিক চাপ ও নিরাপত্তাজনিত বিবেচনায় বাড়িতে আগতদের সংখ্যা সীমিত রাখার চেষ্টা করছে পরিবার। এ কারণে বাসভবনের প্রধান ফটক অধিকাংশ সময় বন্ধ রাখা হয়। পরিবারের সদস্য ও নিকট আত্মীয়-স্বজন ছাড়া অন্য কাউকে ভেতরে প্রবেশ করতে দেখা যায়নি।
সরেজমিনে দেখা যায়, চুনকা কুটিরের সামনে ও আশপাশের এলাকায় পুলিশ আধুনিক ক্লোজ সার্কিট (সিসিটিভি) ক্যামেরা স্থাপন করেছে। পাশাপাশি সাদা পোশাকধারী ও ইউনিফর্ম পরিহিত পুলিশের সদস্যদেরও নজরদারিতে থাকতে দেখা গেছে। স্থানীয়দের দাবি, আইভীর মুক্তির রাতেই এসব ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে।
বিষয়টি নিশ্চিত করে নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাজেদুর রহমান বলেন, সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এসব ক্যামেরা বসানো হয়েছে। পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন এলাকাতেও নজরদারি বাড়ানো হবে।
নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) তারেক আল মেহেদী বলেন, সেলিনা হায়াৎ আইভী একজন সাবেক মেয়র। জামিনে মুক্ত হয়ে তিনি বাড়িতে ফিরেছেন। তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে তিনি বা তার সমর্থকেরা নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের কোনো দলীয় কর্মকাণ্ডে জড়িত হচ্ছেন কি না, সেটিও পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
তিনি বলেন, নিষিদ্ধ কোনো সংগঠনের ব্যানারে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা বা অংশগ্রহণের প্রমাণ পাওয়া গেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পরিস্থিতির ওপর পুলিশের নজরদারি অব্যাহত থাকবে।
বাড়ির সামনে সিসিটিভি স্থাপনের বিষয়ে তারেক আল মেহেদী বলেন, এটি শুধু আইভীর বাসভবনকে কেন্দ্র করে নয়। নারায়ণগঞ্জকে অপরাধমুক্ত রাখতে শহরের অলিগলি সিসিটিভি নেটওয়ার্কের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। পর্যায়ক্রমে পুরো জেলায় প্রায় দুই হাজার ক্যামেরা স্থাপন করা হবে।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ৯ মে ভোরে নিজ বাসা থেকে সেলিনা হায়াৎ আইভীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় সংঘটিত হত্যা ও হত্যাচেষ্টাসহ মোট ১২টি মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। কয়েকটি মামলায় জামিন পাওয়ার পরও নতুন মামলায় তাকে পুনরায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছিল।
সর্বশেষ গত ৩০ এপ্রিল সিদ্ধিরগঞ্জ থানার দুটি হত্যা মামলায় হাইকোর্ট থেকে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন লাভ করেন তিনি। এরপর সব আইনি জটিলতা কাটিয়ে মুক্তির পথ সুগম হয়।
কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর নারায়ণগঞ্জে ফেরার পথে মাসদাইর কেন্দ্রীয় কবরস্থানে গিয়ে বাবা-মা ও ভাইয়ের কবর জিয়ারত করেন আইভী।
বর্তমানে তিনি চুনকা কুটিরে অবস্থান করছেন। তার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড নিয়ে নানা আলোচনা থাকলেও এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য দেননি তিনি।
সেলিনা হায়াৎ আইভী ২০০৩ সালে প্রথমবারের মতো নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার চেয়ারম্যান (মেয়র) নির্বাচিত হন। ২০১১ সালে পৌরসভা সিটি করপোরেশনে উন্নীত হওয়ার পর তিনি প্রথম মেয়র হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে ২০১৬ ও ২০২২ সালের নির্বাচনেও বিজয়ী হয়ে টানা তিন মেয়াদে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়রের দায়িত্ব পালন করেন।
তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর ১৮ আগস্ট অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশের অন্যান্য সিটি করপোরেশনের মেয়রদের সঙ্গে তাকেও দায়িত্ব থেকে অপসারণ করে।
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব