রিপোর্টার্স ডেস্ক: বাংলাদেশে মরণব্যাধি ক্যানসারের প্রকোপ ক্রমেই এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে ক্যানসার আক্রান্তের হার এবং এর কারণে মৃত্যু উভয়ই আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় এক লাখ ১৬ হাজার পাঁচশ’র বেশি মানুষ বিভিন্ন ধরনের ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারাচ্ছেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য উল্লেখ করে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, প্রতিবছর নতুন করে প্রায় এক লাখ ৬৭ হাজার মানুষ এই ঘাতক ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছেন, যদিও চিকিৎসকদের মতে প্রকৃত সংখ্যাটি আরও অনেক বেশি হতে পারে। ২০১৮ সালের তুলনায় বর্তমানে দেশে ক্যানসার রোগীর সংখ্যা প্রায় ১১ শতাংশ এবং মৃত্যুহার প্রায় আট শতাংশ বেড়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের মানুষ বর্তমানে প্রধানত পাঁচটি নির্দিষ্ট ধরনের ক্যানসারে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। নিচে এই ৫ ধরনের ক্যানসার ও তা বাড়ার কারণগুলো বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:
১. খাদ্যনালির ক্যানসার
দেশের মানুষ বর্তমানে সবচেয়ে বেশি যে ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছে, তা হলো খাদ্যনালির ক্যানসার। পরিসংখ্যান বলছে, বর্তমানে প্রায় ৪২ হাজার মানুষ এই রোগে আক্রান্ত এবং প্রতিবছর নতুন করে ২৫ হাজারেরও বেশি রোগী শনাক্ত হচ্ছে। ক্যানসারে মোট মৃত্যুর প্রায় ২০.৯ শতাংশই ঘটে এই খাদ্যনালির ক্যানসারের কারণে। নারীদের তুলনায় পুরুষদের মধ্যে এই ক্যানসারের প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে।
২. মুখ ও ঠোঁটের ক্যানসার
আক্রান্তের সংখ্যার বিচারে এটি দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। বর্তমানে দেশে ৪০ হাজারের বেশি মানুষ মুখ ও ঠোঁটের ক্যানসারে ভুগছেন এবং প্রতিবছর ১৬ হাজার নতুন রোগী যুক্ত হচ্ছে। বিশেষ করে পুরুষদের মধ্যে এই ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার হার অনেক বেশি।
৩. ফুসফুসের ক্যানসার
মৃত্যুহারের দিক থেকে খাদ্যনালির ক্যানসারের পরেই রয়েছে ফুসফুসের ক্যানসার। দেশে বর্তমানে ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা প্রায় ১৭ হাজার এবং প্রতিবছর নতুন করে ১৩ হাজার মানুষ এতে আক্রান্ত হচ্ছে। প্রতিবছর প্রায় ১২ হাজার মানুষ এই রোগে মারা যান। চিকিৎসকদের মতে, মাত্রাতিরিক্ত বায়ু দূষণ এই ক্যানসার বাড়ার অন্যতম প্রধান কারণ।
৪. স্তন ক্যানসার (নারীদের শীর্ষে)
বাংলাদেশের নারীদের মধ্যে স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি এখন সবচেয়ে বেশি। দেশে ক্যানসার আক্রান্ত নারীদের মধ্যে প্রায় ৩৬.৪ শতাংশই এই মরণব্যাধিতে ভুগছেন। প্রতিবছর প্রায় ১৩ হাজার নারী নতুন করে আক্রান্ত হচ্ছেন এবং ছয় হাজারেরও বেশি নারী মারা যাচ্ছেন। উদ্বেগের বিষয় হলো, উন্নত বিশ্বের তুলনায় বাংলাদেশে অনেক কম বয়সেই (৩০ থেকে ৪০ বছর) নারীরা স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছেন।
৫. জরায়ুমুখের ক্যানসার
নারীদের মধ্যে মৃত্যুহারের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে আছে জরায়ুমুখের ক্যানসার। বর্তমানে দেশে প্রায় সাড়ে ২৬ হাজার নারী এই রোগে ভুগছেন এবং প্রতিবছর নতুন করে সাড়ে নয় হাজার রোগী শনাক্ত হচ্ছে। প্রজনন স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সচেতনতার অভাবে এই সংখ্যা কমছে না।
কেন বাড়ছে এই মরণব্যাধি?
ক্যানসার বিশেষজ্ঞ এবং জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক ডা. মোস্তফা আজিজ সুমনের মতে, মূলত তিনটি বড় কারণে দেশে ক্যানসারের প্রকোপ বাড়ছে—
পরিবেশ ও বায়ু দূষণ: বাতাসের বিষাক্ত মান সরাসরি ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও খাদ্যাভ্যাস: খাদ্যে ভেজাল, অস্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ এবং তামাক ও ধূমপানের কারণে ক্যানসারের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে গেছে।
সচেতনতার অভাব: অনেকেই সঠিক সময়ে চিকিৎসকের কাছে যান না, ফলে রোগ শনাক্ত হতে অনেক দেরি হয়ে যায়।
বাঁচার পথ কী?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সঠিক সময়ে টিকা গ্রহণ (বিশেষ করে জরায়ুমুখের ক্যানসারের জন্য) এবং সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে পারলে ক্যানসার আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার অনেক কমিয়ে আনা সম্ভব। একইসাথে বায়ু দূষণ রোধ এবং তামাকজাত দ্রব্য বর্জনই হতে পারে এই মরণব্যাধি থেকে বাঁচার অন্যতম উপায়। তথ্যসূত্র: বিবিসি
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব