রিপোর্টার্স২৪ ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের দীর্ঘমেয়াদি বন্ডে তারল্য সহায়তা বাড়ানোর ঘোষণার পর দুই মাসের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছিল স্বর্ণের দাম। তবে একদিনের বড় ধরনের দরবৃদ্ধির পর বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) বিনিয়োগকারীদের মুনাফা তুলে নেওয়ার প্রবণতায় আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবান এই ধাতুর দাম কিছুটা কমেছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বুধবার ৪ শতাংশের বেশি বাড়ার পর বৃহস্পতিবার স্পট স্বর্ণের দাম ০ দশমিক ৭ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ৪৮৮ দশমিক ১৯ ডলারে নেমে এসেছে। এর আগে দিনের লেনদেনে স্বর্ণের দাম বেড়ে ৪ হাজার ৫২৫ দশমিক ৭৯ ডলারে উঠেছিল। এটি গত ২ জুনের পর স্বর্ণের সর্বোচ্চ দাম।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের স্বর্ণের ভবিষ্যৎ চুক্তির দাম সামান্য পরিবর্তিত হয়ে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ৫৪৬ দশমিক ৩০ ডলারে অবস্থান করছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, স্বর্ণের দামে সাম্প্রতিক বড় উত্থানের পর বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ মুনাফা তুলে নেওয়ায় বৃহস্পতিবার দর কিছুটা কমেছে। তবে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা, যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ঋণ বৃদ্ধি, ডলারের দুর্বলতা এবং সুদের হার নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে স্বর্ণের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ এখনো শক্তিশালী রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ জানিয়েছে, দীর্ঘমেয়াদি নোট ও বন্ডের জন্য পরিচালিত তারল্য সহায়তা কার্যক্রমের আওতায় বন্ড পুনঃক্রয়ের পরিমাণ দ্বিগুণ করা হবে। এর আগে দেশটির বন্ড বাজারে বড় ধরনের বিক্রির চাপ তৈরি হয়েছিল। ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল যুদ্ধের কারণে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীরা বন্ডে বেশি মুনাফা দাবি করায় বাজারে চাপ তৈরি হয়।
এদিকে মার্কিন ডলার তিন মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন স্তরের কাছাকাছি অবস্থান করছে। সাধারণত ডলারের দর দুর্বল হলে ডলারে মূল্য নির্ধারিত স্বর্ণ বিদেশি ক্রেতাদের কাছে তুলনামূলক সস্তা হয়ে ওঠে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের চাহিদা ও দাম বাড়ার জন্য এটি সহায়ক ভূমিকা রাখে।
টেস্টাইলাইভের বৈশ্বিক সামষ্টিক অর্থনীতিবিষয়ক প্রধান ইলিয়া স্পিভাক বলেন, স্বর্ণের বাজারে স্পষ্টতই বড় ধরনের উত্থান হয়েছে। এ ধরনের বড় দরবৃদ্ধির পর বাজারে কিছুটা মূল্য সমন্বয় হওয়া স্বাভাবিক।
তিনি বলেন, স্বর্ণের দাম ৪ হাজার ৪০০ থেকে ৪ হাজার ৫০০ ডলারের মূল্যসীমা পার হয়েছে। এখন দাম যদি এই সীমার ওপরে অবস্থান ধরে রাখতে পারে, তাহলে স্বর্ণের ঊর্ধ্বমুখী গতি আরও অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
এরই মধ্যে প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের মোট সরকারি ঋণের পরিমাণ ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। দেশটির সরকারি ঋণের এই রেকর্ড পরিমাণ বৃদ্ধি আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ পরিস্থিতি ও সরকারি ব্যয়ের সক্ষমতা নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ায় নিরাপদ সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের আকর্ষণও বাড়ছে।
মারেক্সের বিশ্লেষক এডওয়ার্ড মেয়ার বলেন, ঋণ ও সরকারি ঋণ নেওয়া অব্যাহত থাকা এবং সরকারি ব্যয় কমাতে না পারার কারণে বাজারের আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। তার মতে, এ পরিস্থিতি স্বর্ণের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক।
এদিকে গত মাসে অনুষ্ঠিত ফেডারেল রিজার্ভের বৈঠকের কার্যবিবরণীতেও মূল্যস্ফীতি নিয়ে নীতিনির্ধারকদের উদ্বেগের বিষয়টি উঠে এসেছে। বুধবার প্রকাশিত ওই কার্যবিবরণী অনুযায়ী, ফেডের কয়েকজন নীতিনির্ধারক প্রয়োজন হলে সুদের হার বাড়ানোর পক্ষেও প্রস্তুত ছিলেন।
সিএমই ফেডওয়াচ টুলের তথ্য অনুযায়ী, বাজারে বর্তমানে সেপ্টেম্বরে ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার অপরিবর্তিত রাখার সম্ভাবনা ৬৯ শতাংশ এবং সুদের হার বাড়ানোর সম্ভাবনা ৩১ শতাংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
স্বর্ণকে সাধারণত মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে সুরক্ষার মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে সুদের হার বাড়লে কোনো সুদ বা নিয়মিত আয় দেয় না এমন স্বর্ণের আকর্ষণ কমে যায়। ফলে ফেডের ভবিষ্যৎ সুদের হার সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত স্বর্ণের বাজারে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর দামও বৃহস্পতিবার কমেছে। স্পট রুপার দাম ০ দশমিক ৫ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৬৬ দশমিক ৬০ ডলারে দাঁড়িয়েছে। প্লাটিনামের দাম ১ দশমিক ৬ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ১ হাজার ৭৯৪ দশমিক ৯১ ডলারে নেমেছে। একই সময়ে প্যালাডিয়ামের দাম ০ দশমিক ৫ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ১ হাজার ৩২৫ দশমিক ৯৪ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
সব মিলিয়ে একদিনের বড় উত্থানের পর স্বর্ণের বাজারে সাময়িক মূল্য সংশোধন দেখা দিলেও যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ পরিস্থিতি, দুর্বল ডলার, মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা এবং বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে স্বর্ণের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা এখনো বাজারের নজরে রয়েছে।
রিপোর্টার্স২৪/ঝুম