| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

এয়ার ইন্ডিয়া এআই ১৭১ : উড়ানের পরই ইঞ্জিন বন্ধ, প্রাথমিক রিপোর্টে চাঞ্চল্যকর তথ্য

reporter
  • আপডেট টাইম: Jul ১২, ২০২৫ ইং | ০৯:১৭:২৯:পূর্বাহ্ন  |  ১৭১৭৬৯৭ বার পঠিত
এয়ার ইন্ডিয়া এআই ১৭১ : উড়ানের পরই ইঞ্জিন বন্ধ, প্রাথমিক রিপোর্টে চাঞ্চল্যকর তথ্য
ছবির ক্যাপশন: এয়ার ইন্ডিয়া এআই ১৭১ : উড়ানের পরই ইঞ্জিন বন্ধ, প্রাথমিক রিপোর্টে চাঞ্চল্যকর তথ্য

আশিস গুপ্ত, নতুন দিল্লি : গত ১২ই জুন এয়ার ইন্ডিয়া ফ্লাইট এআই ১৭১-এর মর্মান্তিক দুর্ঘটনার প্রাথমিক তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ করেছে এয়ারক্রাফট অ্যাকসিডেন্ট ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো (এএআইবি)। 

১৫ পৃষ্ঠার এই প্রাথমিক প্রতিবেদনে দুর্ঘটনার কারণ এবং প্রাথমিক অনুসন্ধানের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। আহমেদাবাদের সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে উড়ানের কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বোয়িং ৭৮৭-৮ ড্রিমলাইনার বিমানটির উভয় ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে গিয়েছিল বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।দুর্ঘটনাটি ঘটেছিল ১২ জুন। বিমানটি, যার নিবন্ধন নম্বর অজানা, আহমেদাবাদ বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়নের পরপরই বিধ্বস্ত হয়। 

এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় মোট ২৬০ জন প্রাণ হারিয়েছেন, যার মধ্যে বিমানে থাকা ২৪২ জনের মধ্যে ২৪১ জন যাত্রী ও ক্রু সদস্য অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। অলৌকিকভাবে একজন ব্রিটিশ নাগরিক এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে গেছেন। বিমানটি সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে গেছে এবং এর ধ্বংসাবশেষ পাঁচটি ভবনে আঘাত হেনেছে, যার ফলে ভবনগুলিতে ব্যাপক কাঠামোগত ক্ষতি এবং অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে।

প্রাথমিক রিপোর্টে ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনাটির বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বিমানটি ০৮:০৮:৪২ ইউটিসি (সমন্বিত সার্বজনীন সময়)-এ সর্বোচ্চ ১৮০ নটস আইএএস (ইন্ডিকেটেড এয়ারস্পিড) গতি অর্জন করে। এর ঠিক পরপরই, ইঞ্জিন ১ এবং ইঞ্জিন ২-এর ফুয়েল কাট অফ সুইচগুলি এক সেকেন্ডের ব্যবধানে 'রান' অবস্থান থেকে 'কাট অফ' অবস্থানে চলে যায়। এর ফলে ইঞ্জিনগুলিতে জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায় এবং ইঞ্জিন এন ১  ও এন ২ তাদের টেক-অফ মান থেকে কমতে শুরু করে। এই ঘটনাটি বিমান উড্ডয়নের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ঘটেছিল, যা দুর্ঘটনার একটি প্রধান কারণ বলে প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে।

রিপোর্টে ককপিট ভয়েস রেকর্ডিং-এর তথ্যের উল্লেখ করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, ০৮:০৯:০৫ ইউটিসি-তে একটি 'মেডে' কল করা হয়েছিল, যা বিমানের জরুরি অবস্থার ইঙ্গিত দেয়। ককপিট ভয়েস রেকর্ডিংয়ে একজন পাইলটকে অন্য পাইলটকে জিজ্ঞাসা করতে শোনা গেছে যে কেন তিনি জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছেন, যার উত্তরে অন্য পাইলট বলেছেন যে তিনি তা করেননি। এই কথোপকথনটি নির্দেশ করে যে পাইলটরা ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনায় বিস্মিত হয়েছিলেন এবং এটি তাদের ইচ্ছাকৃত পদক্ষেপ ছিল না।

বিমানবন্দর থেকে প্রাপ্ত সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে যে, বিমানটি উড্ডয়নের পরপরই প্রাথমিক আরোহণের সময় রাম এয়ার টারবাইন স্থাপন করা হয়েছিল। রাম এয়ার টারবাইন (আরএটি)  হলো একটি ছোট টারবাইন যা বিমানের জরুরি অবস্থায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করার জন্য ব্যবহার করা হয়, যখন বিমানের প্রধান ইঞ্জিনগুলি কাজ করে না। আরএটি -এর স্থাপন নির্দেশ করে যে বিমানটি উড্ডয়নের পরপরই বিদ্যুৎ সংকটে পড়েছিল। 

রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে যে, বিমানের ইঞ্জিনগুলিতে জ্বালানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রণকারী ফুয়েল কন্ট্রোল সুইচগুলির নড়াচড়া একটি ইচ্ছাকৃত পদক্ষেপের ফল হওয়া উচিত এবং দুর্ঘটনাক্রমে এই সুইচগুলির নড়াচড়া প্রায় অসম্ভব। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ, যা নির্দেশ করে যে ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যাওয়া কোনো যান্ত্রিক ত্রুটির চেয়ে বরং অন্য কোনো কারণে ঘটে থাকতে পারে।

প্রাথমিক তদন্তে আরও দেখা গেছে যে, বিমানের ফ্ল্যাপের অবস্থান ৫ ডিগ্রিতে ছিল, যা টেক-অফ ফ্ল্যাপ সেটিংসের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। অর্থাৎ, উড্ডয়নের জন্য ফ্ল্যাপগুলি সঠিকভাবে সেট করা হয়েছিল। আবহাওয়া সংক্রান্ত কোনো সমস্যা ছিল না এবং বিমানের টেক-অফ ওজন "প্রদত্ত অবস্থার জন্য অনুমোদিত সীমার মধ্যে" ছিল। বিমানে কোনো 'বিপজ্জনক পণ্য' ছিল না, যা দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। এই সমস্ত তথ্যগুলি অন্যান্য সম্ভাব্য কারণগুলিকে বাতিল করে দেয়।

দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে পাখি সংক্রান্ত কার্যকলাপের সম্ভাবনাও বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, "ফ্লাইট পাথের আশেপাশে উল্লেখযোগ্য কোনো পাখি সংক্রান্ত কার্যকলাপ দেখা যায়নি। বিমানটি বিমানবন্দরের সীমানা প্রাচীর অতিক্রম করার আগেই উচ্চতা হারাতে শুরু করে।" এটি নিশ্চিত করে যে কোনো পাখির আঘাত বা কার্যকলাপ দুর্ঘটনার কারণ ছিল না।

তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে রিপোর্টে বলা হয়েছে যে, ধ্বংসাবশেষের সাইটে ড্রোন ফটোগ্রাফি/ভিডিওগ্রাফি সহ সমস্ত কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। ধ্বংসাবশেষ বিমানবন্দরের কাছাকাছি একটি সুরক্ষিত স্থানে সরানো হয়েছে। বিমানের উভয় ইঞ্জিনও ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। ফরওয়ার্ড ইএএফআর (ইঞ্জিন অ্যাকসিডেন্ট ফ্লাইট রেকর্ডার) থেকে ডাউনলোড করা ডেটা বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। ক্রু এবং যাত্রীদের ময়নাতদন্তের রিপোর্টের সম্পূর্ণ বিশ্লেষণ করা হচ্ছে, যাতে এয়ার মেডিক্যাল ফাইন্ডিংস ইঞ্জিনিয়ারিং মূল্যায়নের সাথে যাচাই করা যায়।

এটি উল্লেখ করা জরুরি যে, প্রাথমিক রিপোর্টগুলি সাধারণত অসম্পূর্ণ হতে পারে এবং কেবল প্রাথমিক তথ্য উপস্থাপন করে। এই পর্যায়ে তদন্ত সম্পূর্ণ হয়নি এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য আরও বিস্তারিত বিশ্লেষণ প্রয়োজন। রিপোর্টে উপসংহারে বলা হয়েছে যে, তদন্তের এই পর্যায়ে বোয়িং ৭৮৭-৮ (বোয়িং) এবং/অথবা জিই জেনএক্স-১বি (জিই অ্যারোস্পেস) ইঞ্জিন অপারেটর এবং প্রস্তুতকারকদের জন্য কোনো সুপারিশকৃত পদক্ষেপ নেই।

রিপোর্ট প্রকাশের কয়েক ঘন্টা পরেই বিমান প্রস্তুতকারক বোয়িং একটি বিবৃতি প্রকাশ করেছে। বোয়িং-এর প্রেসিডেন্ট এবং সিইও কেলি অর্টবার্গ বলেছেন, এয়ার ইন্ডিয়া ফ্লাইট ১৭১-এর যাত্রী ও ক্রুদের প্রিয়জনদের প্রতি আমাদের গভীর সমবেদনা, এবং আহমেদাবাদে ক্ষতিগ্রস্ত সকলের প্রতিও। আমি এয়ার ইন্ডিয়ার চেয়ারম্যান এন. চন্দ্রশেখরণের সাথে কথা বলেছি এবং আমাদের পূর্ণ সমর্থনের প্রস্তাব দিয়েছি। ভারতের এয়ারক্রাফট অ্যাকসিডেন্ট ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো দ্বারা পরিচালিত তদন্তকে সমর্থন করার জন্য বোয়িং-এর একটি দল প্রস্তুত রয়েছে।

 বিবৃতিতে আরও যোগ করা হয়েছে, জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার প্রোটোকল মেনে বোয়িং এয়ার ইন্ডিয়া ফ্লাইট ১৭১ সম্পর্কে তথ্য প্রদানের জন্য ভারতের এয়ারক্রাফট অ্যাকসিডেন্ট ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো -এর উপর নির্ভর করবে।

এয়ার ইন্ডিয়াও প্রাথমিক রিপোর্টটি স্বীকার করেছে এবং বলেছে যে তারা "নিয়ন্ত্রক সহ স্টেকহোল্ডারদের সাথে নিবিড়ভাবে কাজ করছে। এয়ার ইন্ডিয়া বলেছে, এয়ার ইন্ডিয়া এআই  ১৭১ দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার এবং সকলের পাশে আছে। আমরা ক্ষতির জন্য শোক প্রকাশ করছি এবং এই কঠিন সময়ে সহায়তা প্রদানের জন্য সম্পূর্ণরূপে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

প্রাথমিক তদন্ত রিপোর্টে যে তথ্যগুলি উঠে এসেছে, বিশেষ করে উড্ডয়নের পরপরই উভয় ইঞ্জিনের আকস্মিক বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং ককপিট ভয়েস রেকর্ডিংয়ের তথ্য, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদিও প্রাথমিক রিপোর্টটি কেবল কিছু প্রাথমিক তথ্য দিয়েছে এবং কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি, এটি ভবিষ্যতের তদন্তের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি স্থাপন করেছে। পূর্ণাঙ্গ তদন্তের মাধ্যমে এই দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটন করা সম্ভব হবে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা এড়াতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া যাবে। তদন্তকারী সংস্থাগুলি তাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে এবং আশা করা যায় যে খুব শীঘ্রই এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার সম্পূর্ণ চিত্র স্পষ্ট হবে। 



রিপোর্টার্স২৪/ ঝুম 

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪