আশিস গুপ্ত, নতুন দিল্লি :
রোহিঙ্গারা আদৌ ‘শরণার্থী’ হিসেবে বিবেচিত হবেন, না কি তাঁরা অবৈধ অনুপ্রবেশকারী— এই গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে এবার তিন দিনের বিশদ শুনানির পথে হাঁটল ভারতের সুপ্রিম কোর্ট।বৃহস্পতিবার বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত এবং বিচারপতি এন. কোটিশ্বর সিং-এর একটি বেঞ্চ জানিয়েছে, তারা এই মামলায় বিস্তারিত শুনানি করবে। কারণ, একবার প্রশ্নের ‘অথরেটেটিভ’ ব্যাখ্যা পাওয়া গেলে, এরপর আইনি ও নীতিগত সিদ্ধান্ত স্বাভাবিক নিয়মেই আসবে।রোহিঙ্গাদের পক্ষে পিটিশনকারী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ ও কলিন গনসালভেস। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, দিল্লি সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে বসবাসকারী মানুষেরা যদি শরণার্থী হিসেবে স্বীকৃতি পান, তাহলে ভারতের সংবিধান এবং আন্তর্জাতিক আইনের কিছু নির্দিষ্ট সুরক্ষা তাঁদের প্রাপ্য।অন্যদিকে, যদি তাদের অবৈধ অনুপ্রবেশকারী বলা হয়, তাহলে তাদের ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত কতটা ন্যায্য, সেই প্রশ্নও আদালতের পর্যালোচনার আওতায় আসবে।
মামলার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, বহু রোহিঙ্গা ও অনুপ্রবেশকারীকে ‘বিদেশি’ বলে ঘোষিত করার পর, বছরের পর বছর বিভিন্ন রাজ্যে, বিশেষত অসমে, অন্যায়ভাবে আটক রাখা হয়েছে। এ বিষয়েও শুনানি হবে বলে জানিয়েছে শীর্ষ আদালত।শুধু আইনি নয়, রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে বাসযোগ্যতা, স্বাস্থ্য ও মৌলিক পরিষেবা সংক্রান্ত বিষয়ও শুনানির আওতায় আনা হবে। কারণ, মানবাধিকার ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকেও এই বিতর্ক গুরুত্বপূর্ণ।
যে বিষয়গুলি বেঞ্চ বিবেচনার জন্য তালিকাভুক্ত করেছে তা হলো, (ক) রোহিঙ্গারা কি শরণার্থী হিসাবে ঘোষিত হওয়ার অধিকারী; যদি তাই হয়, তবে তারা যে অধিকারের অধিকারী তা থেকে কী সুরক্ষা আসে? (খ) যদি রোহিঙ্গারা অবৈধ প্রবেশকারী হয়, তবে ভারত সরকার এবং রাজ্যগুলি কি আইন অনুযায়ী তাদের নির্বাসিত করতে বাধ্য? (গ) রোহিঙ্গারা অবৈধ প্রবেশকারী হিসাবে বিবেচিত হলেও, তাদের কি অনির্দিষ্টকালের জন্য আটক রাখা যাবে নাকি শর্ত সাপেক্ষে জামিনে মুক্তি পাওয়ার অধিকারী? এবং (ঘ) যে রোহিঙ্গারা আটক নেই কিন্তু শরণার্থী শিবিরে বসবাস করছে, তাদের কি স্যানিটেশন, পানীয় জল, শিক্ষা ইত্যাদির মতো মৌলিক সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা হয়েছে (অনুচ্ছেদ ২১ অনুযায়ী)?
চলতি বছরের মে মাসে একটি শুনানিতে সুপ্রিম কোর্ট বলেছিল, যদি রোহিঙ্গারা ‘বিদেশি’ হিসেবে ধরা পড়েন, তবে ফরেনার্স অ্যাক্ট অনুযায়ী তাদের নিয়ে কেন্দ্র সরকার ব্যবস্থা নিতে পারবে।কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে সলিসিটার জেনারেল তুষার মেহতা বলেন, ভারত জাতিসংঘের শরণার্থী সনদে স্বাক্ষরকারী নয়। ফলে ইউএনএইচসিআর-এর শরণার্থী হিসেবে চিহ্নিত করার বিষয়টি বাধ্যতামূলক ধরা যায় না।তিনি উল্লেখ করেন, ফরেনার্স অ্যাক্ট-এর ধারা ৩ অনুসারে, কেন্দ্রীয় সরকার বিদেশিদের প্রবেশ ও প্রস্থানের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে, বিশেষ করে যদি জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন উঠে। তাঁর মতে, ভারতীয় সংবিধানের ৫১(সি) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আন্তর্জাতিক আইনকে সম্মান দেখাতে হয় ঠিকই, কিন্তু তা ভারতীয় আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলে তবেই তা গ্রহণযোগ্য। পিটিশনকারীদের মতে, রোহিঙ্গারা ইউএনএইচসিআর কর্তৃক স্বীকৃত শরণার্থী এবং তাদের মায়ানমারে ফেরত পাঠালে নন-রিফাউলমেন্ট নীতির লঙ্ঘন হবে। কারণ মায়ানমার সরকার নিজেই রোহিঙ্গাদের ‘রাষ্ট্রহীন’ ঘোষণা করেছে এবং সেখানে তাঁদের উপর নির্যাতন ও হত্যার আশঙ্কা রয়েছে।