| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

চীন-আমেরিকা শুল্ক যুদ্ধ : সয়াবিনে ব্রাজিলের অপ্রত্যাশিত লাভ, কিন্তু পরিবেশের ক্ষতি

reporter
  • আপডেট টাইম: মে ১০, ২০২৫ ইং | ০০:০০:০০:পূর্বাহ্ন  |  ১৭৭৯৩৪৬ বার পঠিত
চীন-আমেরিকা শুল্ক যুদ্ধ : সয়াবিনে ব্রাজিলের অপ্রত্যাশিত লাভ, কিন্তু পরিবেশের ক্ষতি
ছবির ক্যাপশন: ড. দেবাশিস মিথিয়া

ড. দেবাশিস মিথিয়া:

দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চীনের বাজারে এক গুরুত্বপূর্ণ সয়াবিন রপ্তানিকারক হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছিল। মার্কিন কৃষি বিভাগের (ইউ এস ডি এ) তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত আমেরিকা তাদের মোট সয়াবিন রপ্তানির প্রায় ৬২% চীনে রপ্তানি করত। আমেরিকান সয়াবিন অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান অর্থনীতিবিদ স্কট গার্ল্টের বক্তব্য থেকেও এটি স্পষ্ট। তিনি উল্লেখ করেন, মার্কিন কৃষকরা তাদের উৎপাদিত সয়াবিনের প্রায় ২৫% থেকে ৩৩% (প্রতি ৩ বা ৪ সারির মধ্যে ১টি) সাধারণত চীনে বিক্রি করতেন। চীন বিশ্বের বৃহত্তম সয়াবিনের বাজার এবং তাদের বিশাল শুকর খামারগুলোকে টিকিয়ে রাখার জন্য প্রতি বছর তারা ১০ কোটি টনেরও বেশি সয়াবিন আমদানি করে। বছরের পর বছর ধরে এটি ব্রাজিলিয়ান এবং আমেরিকান উভয় দেশের কৃষকদের জন্যই লাভজনক ছিল। এই দুই দেশ যৌথভাবে চীনের সয়াবিনের চাহিদার সিংহভাগ সরবরাহ করত।


২০১৮ সালে ট্রাম্প এবং চীনের মধ্যে প্রথম বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু হয়। সেই সময় থেকেই চীনে আমেরিকান রপ্তানি কমতে থাকে। মার্কিন কৃষি বিভাগের অর্থনৈতিক গবেষণা পরিষেবা (ই আর এস)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ সালে চীনে মার্কিন সয়াবিন রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। এই পরিস্থিতিতে, ২০২৫ সালে, মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকার বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর উদ্দেশ্যে চীনের বিভিন্ন পণ্যের উপর দফায় দফায় শুল্ক আরোপ করেন, যা কিছু ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১৪৫ % - এ পৌঁছায়। এর প্রতিক্রিয়ায়, চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ও মার্কিন পণ্যের উপর পাল্টা শুল্ক আরোপ করে। প্রতিশোধ হিসেবে তারা কিছু মার্কিন পণ্যের উপর ১২৫ % পর্যন্ত শুল্ক ধার্য করে।  চীন ২০২৫ সালের মার্চ মাসে মার্কিন সয়াবিনের উপর ১০ % শুল্ক আরোপ করে এবং বাণিজ্য যুদ্ধের তীব্রতায় এপ্রিল মাসে সেই শুল্ক আরও বাড়িয়ে ৪৪ % করে। এই বিপুল পরিমাণ শুল্কের কারণে, চীনা আমদানিকারকদের কাছে মার্কিন সয়াবিন কেনা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে। এর ফলে মার্কিন কৃষকদের কাছে চীনা বাজারে সয়াবিন বিক্রি প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। এতে ফলে মার্কিন কৃষকরা তাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি বাজার থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন হতে চলেছে।   আমেরিকান সয়াবিন অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান অর্থনীতিবিদ স্কট গার্ল্ট উল্লেখ করেছেন যে, হঠাৎ করে তাদের পণ্যের চাহিদা ৩০ % কমে যাওয়ায় এবং চীনের মতো একটি বড় বাজার হারানোর কারণে মার্কিন কৃষকরা বিলিয়ন ডলার ক্ষতির সম্মুখীন হবেন। এই পরিস্থিতিতে মার্কিন কৃষকরা চরম আর্থিক সংকটে  পড়েছেন। তাঁরা দীর্ঘদিনের একটি স্থিতিশীল বাজার হারানোর ফলে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। এমনকি, অনেকে তাদের উৎপাদন চালিয়ে যেতে পারবেন কিনা, সেই বিষয়েও সন্দিহান।


অন্যদিকে, এই শুল্ক যুদ্ধ ব্রাজিলের সয়াবিন চাষীদের জন্য একটি অপ্রত্যাশিত সুযোগ এনে দিয়েছে। চীনের বাজারে মার্কিন সয়াবিনের চাহিদা কমে যাওয়ায়, ব্রাজিল দ্রুত সেই শূন্যস্থান পূরণ করতে শুরু করেছে। ব্রাজিলের প্রভাবশালী ব্যবসায়িক ম্যাগাজিন ‘EXAME' তাদের বিশ্লেষণে উল্লেখ করেছে যে চীন-আমেরিকা শুল্ক যুদ্ধের ফলে ব্রাজিলের সয়াবিন শিল্প অতিরিক্ত ৭ বিলিয়ন ডলার আয় করতে সক্ষম হবে, কারণ চীন বর্তমানে তাদের বিশাল সয়াবিনের চাহিদা মেটানোর জন্য ব্রাজিলের উপরই বেশি নির্ভরশীল। ব্রাজিলিয়ান এগ্রিকালচারাল রিসার্চ কর্পোরেশন -এর তথ্য অনুযায়ী, উন্নত কৃষি প্রযুক্তি ও সয়াবিন চাষের অনুকূল আবহাওয়ার কারণে ব্রাজিল বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ উৎপাদক দেশ। এই পরিস্থিতিতে, চীনের সয়াবিনের প্রয়োজন মেটানোর সুযোগটি ব্রাজিলের জন্য সহজ হবে। ব্রাজিলিয়ান সয়া কৃষক সমিতির সভাপতি মাউরিসিও বুফনও ‘EXAME’-এর এই বিশ্লেষণকে সমর্থন করে বলেছেন যে চীনের বাজারে সয়াবিনের চাহিদা ক্রমশ বাড়ছে এবং তা পূরণের পর্যাপ্ত ক্ষমতা ব্রাজিলের রয়েছে। ব্রাজিলের সয়াবিন চাষীরা ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক বাজারে অত্যন্ত দক্ষ এবং নির্ভরযোগ্য সরবরাহকারী হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করেছেন যা ব্রাজিলকে  শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে গেছে।


আমেরিকা ও চীনের মধ্যেকার শুল্ক যুদ্ধে ব্রাজিলের সয়াবিন চাষীরা যে বড় ধরনের আর্থিক সুবিধা পেতে চলেছেন, তা স্পষ্ট। তবে, নতুন এক আশঙ্কা তৈরি হয়েছে,  ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক চাহিদা মেটাতে সয়াবিনের চাষের এলাকা বাড়াতে গিয়ে জঙ্গল কাটার হার বাড়তে পারে। ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ডলাইফ ফান্ড এবং গ্রিনপিসের মতো বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংস্থা, স্যাটেলাইট চিত্র ও মাঠ পর্যায়ের গবেষণার  যে তথ্য দিয়েছে তাতে দেখা গেছে, ব্রাজিলে সয়াবিন চাষের সম্প্রসারণের সাথে বন উজাড়ের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। ব্রাজিলের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্পেস রিসার্চ -এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, আমাজনের জঙ্গল কমে যাওয়ার হার গত কয়েক বছরে উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। এই বনভূমি কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে তারাও কৃষি জমির বিস্তারকে চিহ্নিত করেছে।  সেখানে সয়াবিন চাষের ভূমিকা যথেষ্ট।  আমাজন হলো পৃথিবীর ফুসফুস এবং জীববৈচিত্র্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।  এই জঙ্গল বিপুল পরিমাণে কার্বন শোষণ করে জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। তাই  নির্বিচারে আমাজনের ধ্বংস কেবল স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রকেই বিপন্ন করবে না, এটি বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার প্রচেষ্টাকেও ব্যাহত করবে। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, ব্যাপক বন উজাড়ের ফলে আমাজন "কার্বন সিঙ্ক" থেকে "কার্বন নিঃসরণকারী অঞ্চলে" রূপান্তরিত হতে চলেছে। অর্থাৎ, জঙ্গল আর কার্বন শোষণ করবে না, বরং তার মধ্যে জমে থাকা কার্বন ডাই অক্সাইড বাতাসে ছেড়ে দেবে।এর ফলে বাতাসে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ আরও বাড়বে এবং পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাবে। জলবায়ু পরিবর্তনের গতি আরও দ্রুত হবে। সুতরাং, ব্রাজিলের সয়াবিনের এই অপ্রত্যাশিত আর্থিক সুবিধা লাভের পাশাপাশি পরিবেশগত ঝুঁকিও বাড়ছে। ব্রাজিলকে মনে রাখতে হবে,  অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি যেন পরিবেশগত বিপর্যয়ের কারণ না হয়। সেই জন্য টেকসই কৃষি পদ্ধতির অনুসরণ এবং আমাজনের বনভূমি রক্ষার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা অপরিহার্য।

( লেখক কৃষি অর্থনীতির গবেষক)

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪