আর আই রফিক
সত্যেন চ্যাটার্জী এলাকার বেশ প্রভাবশালী মানুষ। শিক্ষা ততটা না থাকলেও ধনের প্রাচুর্য ঠিকই আছে। একবার তাঁর বড় মেয়ের প্রসবে সমস্যা। তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হলো। পরীক্ষা নীরিক্ষা করে ডাক্তার বললেন -- শীগ্রই এবি নেগেটিভ গ্রুপের রক্ত সংগ্রহ করুন। সিজার করতে হবে। সময় কিন্তু বেশি নেই। ৮ ঘন্টার মধ্যে সীজার করা না হলে মা শিশু দুজনের জীবনই হুমকিতে।
শুনে সত্যেন বাবু প্রমাদ গুনতে লাগলেন। এবি নেগেটিভ রক্তের সন্ধানে চারদিকে লোক লাগিয়ে দিলেন। নিজেও বসে রইলেন না। ফোন করে আত্মীয়, বন্ধু বান্ধব সবার কাছেই খোঁজ করা হচ্ছে। কিন্তু এই গ্রুপের রক্ত নাকি খুবই বিরল। কদাচিৎ মিলে। তাই কেউ কোথাও মিলাতে পারছে না। সত্যেন বাবু পড়লেন ভীষণ চিন্তায়। কি করা যায় ?
একসময় তিনি স্থানীয় বাজারে চলে গেলেন। সেখানে পরিচিত অনেককেই পাওয়া যাবে। কারো না কারো কাছ থেকে এই গ্রুপের রক্তের সন্ধান মিলতে পারে।
বাজারে একটা চা স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে দূর সম্পর্কের এক আত্মীয়ের সাথে তিনি বিষয়টা নিয়ে কথা বলছিলেন। পাশেই ছিল এক মুচীর জুতা মেরামতের দোকান। মুচী জুতা মেরামত করছিল। সত্যেন বাবুদের আলোচনা তার কানেও যাচ্ছিল। এতে সে নিজেই উৎসাহী হয়ে বলে উঠলো -- বাবু, আমার রক্তের গুরুপ এবি নেগেটিভ। কিছুদিন আগে ডাক্তার দেখাইছিলাম। তহন আমার রক্ত পরীক্ষা কইরা ডাক্তার ছাহেব কইছিলো। আপনার মেয়ের জীবন বাঁচাইবার জন্য রক্ত লাগলে আমি দিতে রাজী আছি।
মুচীর কথা শুনে সত্যেন বাবুর মুখে বিরক্তি ছাপ ফোটে উঠলো। মুচীর কথা যেন তিনি শুনতেই পাননি, এমন ভাব করে
ওদিকে চলে গেলেন। হয়ত ভাবলেন, ওরা জাতে মুচী। মুচীর রক্ত তাঁর মেয়ের দেহে প্রবাহিত হবে, এটা কি করে সম্ভব ?
এদিকে তিন/চার ঘন্টা কেটে গেছে। বহু খুঁজাখুঁজি করেও রক্ত যোগাড় করতে না পেয়ে তিনি আবার ডাক্তারের কাছে গেলেন এবং হাসপাতালের ব্লাড ব্যাংক থেকে রক্ত দিতে অনুরোধ করলেন। ডাক্তার বিরক্তি প্রকাশ করে বললেন -- ব্লাড ব্যাংকে এই গ্রুপের রক্ত থাকলে তো আপনাকে সংগ্রহ করতে বলতাম না। আগেই আমরা সেটা ব্যবহার করতাম। আজকাল ফেসবুক এবং আরো অনেক সহজ যোগাযোগ মাধ্যম আছে। একটু প্রচার করে দেখতে পারেন। সময় তো অনেক চলে গেছে। আপনারা তো দেখছি মেয়ের জীবনকে মূল্যায়নই করছেন না।
সত্যেন বাবু অস্থির হয়ে পড়লেন। এসময় মুচীর কথাটা তাঁর মনে পড়লো। তিনি ডাক্তারকে বললেন -- রক্তের গ্রুপ এবি নেগেটিভ এমন একজন আছে। কিন্তু জাতে সে যে মুচী। তার রক্তে কি চলবে ?
এ কথায় ডাক্তার বিস্মিত হয়ে সত্যেন বাবুর দিকে তাকালেন। বললেন-- মানুষ হলে চলবে।
সত্যেন বাবু বললেন -- আপনার কথাটা কিন্তু আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।
ডাক্তার বললেন -- আহারে ! বলছি, মুচী যদি মানুষ হয়ে থাকে, তাহলে চলবে। অন্য প্রাণী হলে চলবে না।
সত্যেন বাবু বললেন-- মুচী কি মানুষ না ?
ডাক্তার-- আপনার কথায় তো তেমনটাই বুঝা যাচ্ছিলো। আচ্ছা যাহোক্, সে কি রক্ত দিতে রাজী হবে ?
সত্যেন বাবু-- হ্যা। রক্তের প্রয়োজনের কথা শুনে সে নিজেই দিতে চাইছে।
ডাক্তার -- বাহ্ ! যান, যান। তাড়াতাড়ি তাকে নিয়ে আসুনগে। ওর রক্ত আপনার রক্তের চেয়েও বেশী মূল্যবান। ওর রক্তে মিশ্রণ নেই। সবটুকুই মানুষের। তবে আপনার রক্ত পরীক্ষা করলে বুঝা যাবে মিশ্রণ আছে কি নাই।
সত্যেন বাবু বিরক্তির সাথে বললেন -- এ আপনি কি বললেন ?
ডাক্তারও বিরক্তি প্রকাশ করলেন-- আহ্, মেয়েকে বাঁচাতে চাইলে আগে ঐ মানুষটাকে নিয়ে আসুনগে, যান। আর সময় নষট করবেন না।
অগত্যা কথা না বাড়িয়ে সত্যেন বাবু মুচীকে আনতে ছুটলেন।
কবি ও উপন্যাসিক
রিপোর্টার্স২৪/সোহাগ