শ্যামনগর (সাতক্ষীরা) প্রতিনিধি : সঙ্ঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে সুন্দরবন থেকে পাচার হয়ে যাচ্ছে হাজার হাজার টন শামুক ঝিনুক। মূলত এই ঝিনুক দেশের বিভিন্ন মার্কেটে চোরাইপথে বিক্রি হচ্ছে এবং দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও পাঠানো হচ্ছে। শামুক-ঝিনুক সংগ্রহের এ ধারা শুধু বনসম্পদ নয়, দেশের সামগ্রিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্যও গুরুতর হুমকির সৃষ্টি করছে।
সংঘবদ্ধ এই চক্রের সাথে যারা জড়িত তারা রাতারাাত আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে যাচ্ছে। উপকূলের অধিকাংশ মানুষই জানে না শামুক ঝিনুক পরিবেশের জন্য খুবই উপকারী একটি প্রাণী। সুন্দরবনে ২৬০ প্রজাতির প্রাণী আছে তার মধ্যে শামুক ঝিনুক অন্যতম। প্রতিনিয়ত অবৈধ ভাবে আহরণের কারণে অনেক প্রাণী সুন্দরবন থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে।
শামুক ঝিনুক সুন্দরবনের নদীর তলদেশের মাটির ভারসাম্য রক্ষায় সহযোগিতা করে। পরিবেশবিদ অধ্যক্ষ আশেক এলাহী জানান, শামুক ঝিনুক পরিবেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রাণী। শামুকের চলাফেরার কারণে মাটির গুণগত মান বজায় থাকে। মাটির উর্বরতা ঠিক থাকে।পাশাপাশি সুন্দরবনের নদীতে বসবাসরত মাছের খাদ্য তৈরি কাজে সহায়তা করে। সুন্দরবনে পটাশিয়ামের যোগান দিয়ে থাকে। সুন্দরবনের ভিতরে যা কিছু আছে সব কিছু নিয়েই সুন্দরবন সুতরাং সুন্দরবনকে রক্ষিত রাখতে কোন প্রাণী ধরা ঠিক না। এটা সম্পূর্ণ বেআইনি।
লেখক গবেষক গৌরাঙ্গ নন্দী বলেন শামুক ঝিনুক এরা পানির গুণগত মান বজায় রাখতে সহায়ক এবং নদীর তলদেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে।কিন্তু ব্যাপক হারে এদের নিধন নদী জীববৈচিত্র্যের ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলতে পারে। দেশের বিদ্যমান আইন অনুযায়ী নদী, খাল ও প্রাকৃতিক জলাশয় থেকে শামুক ও ঝিনুক কুড়িয়ে নেওয়া বা পরিবহন করা নিষিদ্ধ। এসব প্রাণী পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০) ও জলজ সম্পদ সংরক্ষণ আইন ১৯৫০ এর আওতায় দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে বিবেচিত।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে সাতক্ষীরার রেন্জ পচ্শিম সুন্দরবনে পশুরতলা খাল, কৈখালীর মাদার নদী ও জয়াখালীর খাল, বিভিন্ন জায়গা থেকে সংগ্রহ করে অবৈধ শামুক ও ঝিনুক। এলাকার কিছু ব্যাবস্যায়ী এগুলো ১৫ টাকা দরে কিনে ৮০ টাকা দরে পদ্মা হ্যাচারিতে বিক্রি করে। গোপন তথ্যের ভিত্তিতে জানা গেছে নদী সীমান্ত পথে এসব জলজ প্রাণী ভারতে পাচার করা হয়ে থাকে।
এই শামুক ঝিনুক চক্রকে ঠেকাতে বন বিভাগের অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে জানা যায়। আগস্ট মাসের শুরু দিকে পার্ক সংলগ্ন মালঞ্চ নদী থেকে শামুক ও ঝিনুক ভর্তি নৌকা জব্দ করেছে মুন্সিগঞ্জ ফরেস্ট টহল ফাঁড়ির সদস্য ও নৌ পুলিশ। এর কিছুদিন পরে বন বিভাগের কদমতলা স্টেশন থেকে দশ বস্তা সামুক ঝিনুক উদ্ধার করে নদীতে ছেড়ে দেন।
শ্যামনগর উপজেলার পরিবেশকর্মী কামরুল ইসলাম বলেন, ‘শুধু অভিযান চালিয়ে নৌকা জব্দ করলেই হবে না। এ চক্রের মূলব হোতারা কোথা থেকে পরিচালনা করছে তা খুঁজে বের করতে হবে। সুন্দরবন ও উপকূল রক্ষা করতে হলে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি জনসচেতনতাও বাড়াতে হবে। সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক এ কে এম ফজলুল হক বলেন, বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখছি । শামুক ও ঝিনুক সংগ্রহ ও পাচার সরাসরি নদী সংরক্ষণ আইন ও পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের লঙ্ঘন। অভিযুক্তদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এছাড়া এ ধরণের অপরাধ দমন করতে স্থানীয়দের সহযোগিতাও প্রয়োজন। পাচার চক্রকে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বন বিভাগ কাজ করছে।
রিপোর্টার্স‘২৪/এসএন