আর আই রফিক :
সিদ্ধেশ্বরী কলেজের চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী ছোঁয়া। ফেসবুকের প্রতি আসক্তিটা ইদানীং তার বড্ড বেড়েছে। দিনরাত যেন ওখানেই পড়ে থাকা।
ক'দিন আগে একটা আইডি থেকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট। এর পোস্টগুলো দেখে তার ভালো লাগে। প্রতিটা পোস্টই সুন্দর সুন্দর কথায় সাজানো। মাঝে মধ্যে দু'একটা পোস্ট শুদ্ধ ইংরেজিতে লেখা। যদিও আইডির নাম আর ছবি দুটোই অচেনা, তবু পোস্টগুলোর খাতিরেই এক্সেপ্ট করে নিয়েছে।
আইডির নাম "ছিন্নমূল" এবং প্রোফাইল ছবি হিসেবে গাছের একটা উপড়ানো চারা।
একরাতে আইডিটার একটা পোস্ট ছোঁয়ার হৃদয়কে শুধু ছুঁয়েই দিলো না, নাড়িয়ে একবারে তছনছও করে ছাড়লো। ছন্দে লেখা পোস্টটা এরকম--
"শিকড় বিহীন বৃক্ষ সম
জলে ভেসে চলি,
আকাশ সমান মনের ব্যথা
জলের কানে বলি।
আপন বলতে নেই তো কেহ
প্রভু তুমি বিনে,
তুমিও দেখি পরই ভাবো
চুপ থাকো সব জেনে।"
লেখার নীচে ঝরে ভাঙা একটা গাছের ছবি। পোস্টটা পড়ে কি যেন মনে করে ছোঁয়া ঐ প্রোফাইলের ভিতরে ঢুকে আবার ভালো করে দেখে নিলো। পরে মেসেঞ্জারে একটা মেসেজ লেখলো -- কে আপনি ? ঠিকানা জানালে কৃতজ্ঞ থাকবো।
কিছুক্ষণেই ছিন্নমূলের উত্তর এলো। শুরু হলো মেসেঞ্জার চ্যাটিং।
ছিন্নমূল লিখেছে -- হাসালেন আপনি। ছিন্নমূলদের ঠিকানা থাকে না কি ?
-- তারাও নিশ্চয়ই কোথাও না কোথাও থাকে।
-- এই তো কচুরিপানার মত জলে ভেসে থাকা। আমার ঠিকানা দিয়ে আপনি কি করবেন ?
-- না মানে, আপনার মনের কষ্টগুলো জানতে ইচ্ছে করে।
ছিন্নমূল -- শুনে ভালো লাগলো। তবে ওসব জেনে আপনার কষ্ট পাওয়ার দরকার নেই।
-- আপনি ছেলে না মেয়ে ?
-- আইডিতে লেখা আছে তো।
-- লেখা তো পুরুষ।
-- তাহলে আর জিজ্ঞেস করছেন কেন ?
-- কনফার্ম হওয়ার জন্য।
ছিন্নমূল -- আমি মিথ্যা পছন্দ করি না। তাই কোন ভুয়া তথ্য উল্লেখ করিনি।
-- জন্ম তারিখ দেখে মনে হলো আপনি আমার দু'তিন বছরের বড় হবেন।
-- অসম্ভব কিছু না। ভালো থাকবেন। শুভরাত্রি।
ছোঁয়ার ইচ্ছে থাকা সত্বেও আরো কিছুক্ষণ চ্যাট করা হয়ে উঠেনি।
দু'দিন পর আইডিটাতে ইংরেজিতে একটা পোস্ট।
" Every life in the world is very selfish. Everyone knows only himself but does not get time to know others ".
যার অনুবাদ হয়-- পৃথিবীর প্রতিটা জীবই স্বার্থপর। প্রত্যেকেই কেবল নিজেকে চিনে কিন্তু অন্যকে জানার সময় পায় না।
এর কমেন্টে ছোঁয়া লিখলো -- Yes, as like as you. ( হ্যা, ঠিক আপনার মত)।
উত্তরে ছিন্নমূল লেখেছে-- Thanks a lot.
এবারেও গল্প জমানোর ইচ্ছেটা ছোঁয়াকে দমনই করতে হলো। এই উত্তরের পরে তো আর কথা চলে না। ফলে ছিন্নমূল সম্পর্কে কৌতুহলটা মনে চেপেই থামতে হলো।
ছোঁয়ার বাবা আজিম সাহেব বাংলাদেশ ব্যাংকের বড় অফিসার। ঢাকা শহরেই লালবাগ এলাকায় নিজস্ব চারতলা ভবন থাকা সত্বেও অভিজাত গুলশান এলাকায় একটা ছিমছাম বাড়িতে ভাড়ায় থাকেন। দুই মেয়ে আর স্ত্রীসহ তাঁর চারজনের সংসার। এছাড়া একজন ড্রাইভার, একজন দারোয়ান কাম কেয়ার টেকার আর একজন বুয়া -- এরা কর্মচারী। ড্রাইভার হাসিম চল্লিশের কাছাকাছি। দারোয়ান শুভ ২৪/২৫ বছর বয়সী এক সুদর্শন, সুঠাম যুবক। চেহারা দেখে অনেকেই পরিবারের লোক ভেবে বসে। গেটে বসা ছাড়াও বাজার করার দায়িত্ব শুভর। তাছাড়া মাস শেষে আজিম সাহেবের নিজস্ব বাড়ীটার ভাড়া উঠানোর দায়িত্বেও সে-ই।
সেদিন আজিম সাহেবের শরীরটা ভালো বোধ হচ্ছিলো না। তাই অফিসের কাজে তেমন মনযোগী হতে পারছিলেন না। অথচ কিছুদিন আগে প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি অনুসরণে দাখিলকৃত পাঁচ শতাধিক দরখাস্তের স্কুটিংয়ের দায়িত্ব তাঁর। বাসাতেই কাজটা করার জন্য দরখাস্তগুলো নিয়ে এসেছেন। উদ্দেশ্য, বড় মেয়ে ছোঁয়ার সহযোগিতা নেবেন।
সন্ধ্যায় তিনি ছোঁয়াকে নিয়ে বাছাইয়ের কাজ শুরু করলেন। রাতে এশার নামাজের জন্য তিনি মসজিদে চলে গেলে ছোঁয়া একাই কাজটা করছে। এরই মাঝে একটা দরখাস্ত হাতে নিয়েই সে চমকে উঠলো। সংযুক্ত ছবিটা দারোয়ান শুভর। অনেকক্ষণ ভালো করে দেখেও এর কোনো কিনারা সে পাচ্ছে না। তাই ছোটবোন পিয়াকে ডেকে ছবিটা দেখিয়ে বললো -- দেখ্ তো, এটা কে ?
পিয়া একবার দেখেই বলে উঠলো -- এটা শুভ।
ছোঁয়া এবার দরখাস্তটা দেখিয়ে বললো -- এটা বাংলাদেশ ব্যাংকে "একাউন্টস্ অফিসার" পদে চাকরির দরখাস্ত। এখানে শুভর ছবি থাকবে কেন ?
দেখেশুনে পিয়াও হতবাক। সে তার মাকে ডেকে আনলো। তাদের মা নাসরিন জাহানও এসে দেখলেন এবং দরখাস্তে উল্লেখিত নাম ঠিকানা পড়ে নিলেন। তবে নামের সাথে শুভর কোনো সঙ্গতি পাননি। দরখাস্তকারীর নাম মোঃ আসাদুজ্জামান ফরাজি। ঠিকানা শেরপুর জেলার একটা গ্রামে। বর্তমান ঠিকানা ঢাকা শহরে হলেও অচেনা। শিক্ষাগত যোগ্যতার কলাম দেখে বুঝতে পারলেন, দরখাস্তকারী আনন্দমোহন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে অনার্স, মাস্টার্স। তিনি চলে যেতে যেতে বললেন -- অনেক সময় একজনের চেহারা আরেকজনের সাথে মিলে যায়। রেখে দে।
মায়ের হাত থেকে দরখাস্তটা নিয়ে পিয়া খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে। ছোঁয়া আরেকটা দরখাস্ত নিয়ে কাজ করছে। তবে তার অন্তর কিন্তু শুভর বিভিন্ন কাজকর্ম আর চাল-চলনের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণে ব্যস্ত। যদিও শুভর সাথে পরিবারের সবাই চাকর মনিবের সম্পর্কই পুরোপুরি মেনে চলে।
ছোঁয়া লক্ষ্য করেছে, ছবির ছেলেটার জামা আর শুভর জামার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। আরেকটা বিষয়, শুভ যে প্রতিদিন সকালে আগের দিনের বাসী পত্রিকাগুলো তার কক্ষে নিয়ে যায়, এ-ও সে দেখেছে। তাছাড়া ওর কথাবার্তা আর চাল-চলনেও উচ্চ শিক্ষার ছাপ স্পষ্ট। এ সবকিছু যে ইঙ্গিত দেয়, তাতে দরখাস্তকারী শুভ ছাড়া আর কেউ নয়।
পাশাপাশি যে বিষয়টা তার ধারণাকে নাকচ দিচ্ছিল, তা হলো-- শুভ দেড় বছর ধরে এখানে চাকরি করছে। এতটা শিক্ষিত হয়েও সে এমন চাকরি করবে কেন ? কোনো সমস্যায় পরে করলেও নিজের যোগ্যতাকে গোপন করার কি থাকতে পারে ?
দ্বন্দ্বের কোনটাকেই সে স্থির বিশ্বাস করতে পারছে না। এমন সময় পিয়া বলে উঠলো -- আপু, এটা শুভই। এই জামাটা আজকেও আমি ওর গায়ে দেখেছি।
ছোটবোনের কথা শুনে ছোঁয়া কতক্ষণ শুধু ওর দিকে তাকিয়েই রইলো। কিছু বলতে পারেনি।
এসময় আজিম সাহেব মসজিদ থেকে ফিরে এলেন। পিয়া বাবার দিকে দরখাস্তটা বাড়িয়ে দিয়ে বললো -- দেখতো বাবা, এটা আমাদের শুভ না ?
ছবিটা দেখে আজিম সাহেবও প্রথমেই নাকচ করে দিতে পারেননি। হাতে নিয়ে দেখতে দেখতে বললেন -- তাই তো ! শুভই তো মনে হচ্ছে।
এরপর দরখাস্তের বায়োডাটা দেখে নিয়ে বললেন -- ওর বাড়ি তো শেরপুরের কথাই বলেছিলো। কিন্তু নাম-ধামের তো মিল দেখছি না।
আরেকটু কি যেন চিন্তা করে বললেন -- যে-ই থাকগে, আমাদের ভাবনার কিছু নেই। দরখাস্ত পূর্ণাঙ্গ হয়েছে তো, না কি ?
ছোঁয়ার হ্যাঁ-সূচক উত্তর পেয়ে একে বাছাইকৃত গুলোর স্তুপে রেখে দিয়ে বললেন-- মানুষের মত মানুষ হতে পারে।
এবার পিয়াও তার পড়ার টেবিলে চলে গেলে ছোঁয়াকে নিয়ে আজিম সাহেব কাজে মনযোগ দিলেন।
আজিম সাহেবের পরিবারে চাকরি করা সত্বেও কখনো নিজের অধিকার ডিঙিয়ে কারো সাথে প্রয়োজনের অধিক কথাবার্তা শুভর হয় না। তাই মনিব কোথায় চাকরি করেন, সেটাও তার অজানা। সে তার কর্তব্য পালন করে। বাকি সময়ের বেশীর ভাগই নিজের কক্ষে কাটায়। তার সম্পর্কে বাসার ভিতরে কি কি আলোচনা হয় না হয়, এ নিয়ে তার ভাবনা নেই।
তার কক্ষটাও বাসার ভিতরে নয়। গেটের সংলগ্ন একজন থাকার মত একটা ছোট কক্ষ। এতেই তার শুয়া, বসা। কাজ বা খাওয়ার ডাকে ভিতরে আসে এবং কাজ শেষে বেরিয়ে যায়।
সেদিন সকালে ডাক পেয়ে শুভ ভিতরে এলে আজিম সাহেব টাকা দিয়ে বাজারে যেতে বললেন। শুভও প্রতিদিনের মতই ব্যাগ হাতে বেরিয়ে প্রায় গেটের কাছাকাছি চলে গিয়েছিলো। এসময় আজিম সাহেব (পরীক্ষা করার জন্য) পিছন থেকে ডেকে উঠলেন -- আসাদুজ্জামান, শোন।
ডাক শুনে শুভ থমকে দাঁড়িয়ে পিছন ফিরলো। আজিম সাহেব লক্ষ্য করলেও তার প্রতি দৃষ্টি দিলেন না। বরং ভাব দেখালেন, যেন অন্য কারো সাথে কথা বলছেন। এতে সম্বিত ফিরে পেয়ে শুভ আবার হেটে চলে গেলো। বিষয়টা আজিম সাহেবকে একটা স্পষ্ট ধারণা দিয়ে গেলো যে এ-ই শুভই দরখাস্তকারী আসাদুজ্জামান। তবে এ ব্যাপারে তিনি আর মুখ খুলেননি।
ওদিকে শুভর প্রতি ছোঁয়ার মনোভাবেও পরিবর্তন। তার সন্দেহের বিষয়টা না পারছে কারো কাছে প্রকাশ করতে, না পারছে মন থেকে মুছে ফেলতে।
এরই মাঝে একরাতের কথা। বাসার ওয়াইফাই এর বিভ্রাট। বাইরের সাথে নেট কানেকশন একেবারেই ক্ষীণ হয়ে গেছে। ছোঁয়া আশপাশের বান্ধবীদের কাছে ফোন করে জেনেছে, ওদের কোন সমস্যা নেই। তখন নিশ্চিত হলো যে সমস্যাটা তাদের বাসায় এবং মেস্ত্রী ডেকে ঠিক না করা পর্যন্ত দূর হবে না।
ফেসবুকের গতি এতটাই স্লো হয়ে গেছে যে একটা পোস্ট দেখার পর আরেকটা পোস্ট আসতে অনেকক্ষণ সময় নিচ্ছে। মন্তব্য করলেও সেটা পোস্ট হতে চাচ্ছে না। কিন্তু বিস্ময়ের বিষয়, এই সময়েও "ছিন্নমূল" আইডির সাথে সংযোগ সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। এর পোস্টগুলো বিলম্ব করছে না। বিষয়টা ছোঁয়ার হৃদয়কে আরো উদ্বেলিত করে তুললো যে আইডিটা খুব কাছে থেকে কেউ চালাচ্ছে। সে ছিন্নমুলের মেসেঞ্জারে লিখলো -- হাই, কেমন আছেন ?
ছিন্নমূল লিখেছে -- ভালো। তবে নেটের অবস্থা ভালো না।
-- কেন, নেটের আবার কি হলো ?
-- একবারেই কাজ করতে চাইছে না। আপনার এখানে কি অবস্থা ?
ছোঁয়া অপর প্রান্তের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বিস্ময়ের সাথে জানতে চাইলো -- আপনি এখন কোথায় আছেন ?
-- এটা জিজ্ঞেস করছেন কেন ?
-- নেটের সমস্যা তো আমাদের বাসায়। অন্য সবখানে তো নেট ঠিক আছে।
-- ও, তাহলে আমার সেটটাই হয়ত সমস্যা করছে।
কতক্ষণ নীরব থেকে ছোঁয়া আবার লিখলো -- আপনি মানুষটা খুবই কঞ্জুস। নইলে ঠিকানা জানালে নিশ্চয়ই আপনার কোনো ক্ষতি হয়ে যেতো না।
-- বুঝতে পারছি, আপনি আমাকে বিশ্বাস করতে পারছেন না। যার কোন বাড়িই নেই, তার ঠিকানা কি হতে পারে, বলুন ?
-- এখন আপনি আছেন কোথায় ?
-- আমি কর্মস্থলেই থাকি।
-- আপনার কর্মস্থল কোথায় ?
-- ঢাকায়।
-- ঢাকার কোন জায়গায় ?
বেশ দেরীতে ছিন্নমূলের উত্তর এলো-- গুলশানে।
-- গুলশান কত নম্বর বাসা ?
-- আমি এতকিছু জানি না। বাসার নম্বর কোনোদিন খুঁজতে যাইনি।
ছোঁয়া কিছু লিখতে চাইছিল। কিন্তু এর মাঝেই ছিন্নমুল আবার লিখলো -- আমার ঘুমের সময় যাচ্ছে। ভালো থাকবেন। শুভরাত্রি।
এবারেও ওর ঠিকানাটা ছোঁয়ার জানা হলো না। আরো প্রায় এক মাস কেটে গেছে। ঈদুল আযহার কেনাকাটা চলছে। ট্রেন, লঞ্চ আর গাড়ীর স্টেশনে বাড়িফেরা লোকেদের উপচে পড়া ভীড়। রাতে ছিন্নমূলের আইডিতে একটা পোস্ট এলো--
ঈদানন্দে মেতে সবাই
যাচ্ছে নিজের ঘরে,
ট্রেন, বাস আর ইস্টীমারে
যাত্রী নাহি ধরে।
আমারও খুব ইচ্ছে করে
যেতে নিজের বাড়ি,
ঠিকানা যে ভুলে গেছি
কেমনে যেতে পারি ?
সান্ত্বনা মোর এইটুকু যে
পথচেয়ে কেউ নেই,
ফাঁকা রাস্তা দেখবো ঘুরে
ঢাকা শহরেই।
নিতান্ত সাদামাটা একটা পোস্ট হলেও ছোঁয়ার হৃদয়ে বড় আঁচড় কেটে গেলো। মন্তব্যে সে লিখলো --
কষ্টের কথায় খুব কষ্ট লাগলো।
ছিন্নমূল "ধন্যবাদ" লিখেই মন্তব্যের জবাব দিলো।
ছোঁয়া কিন্তু নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। সে মেসেঞ্জারে লিখলো -- ঈদে বাড়ি যাবেন না ?
উত্তর আসতে দেরি দেখে সে আগ্রহ নিয়েই অপেক্ষা করতে লাগলো।
(চলবে)
লেখক : আর আই রফিক, কবি, গল্পকার ও উপন্যাসিক।