স্টাফ রিপোর্টার: রাজস্ব ঘাটতি, জ্বালানি খাতে বাড়তি ব্যয় এবং রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের চাপে সরকার উচ্চ সুদে বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়াচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে মোট ১ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারের পাঁচটি ঋণ প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারই অনমনীয় বা নন-কনসেশনাল ঋণ।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত নন-কনসেশনাল ঋণসংক্রান্ত স্থায়ী কমিটির সভায় এসব ঋণ অনুমোদন দেওয়া হয়। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে জানানো হয়, অনুমোদিত ঋণের বড় অংশ বাজেট সহায়তা হিসেবে ব্যবহৃত হবে।
সরকারি সূত্রগুলো বলছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ, রাজস্ব আয়ে ঘাটতি এবং অর্থনৈতিক স্থবিরতা সামাল দিতে সরকারকে একদিকে অভ্যন্তরীণ ঋণ নিতে হচ্ছে, অন্যদিকে বিদেশি ঋণের দিকেও ঝুঁকতে হচ্ছে। তবে এসব ঋণের সুদের হার তুলনামূলক বেশি এবং পরিশোধের শর্তও কঠোর হওয়ায় ভবিষ্যতে ঋণচাপ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অনুমোদিত বাজেট সহায়তার মধ্যে রয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) থেকে ৪৫০ মিলিয়ন ডলার, জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) থেকে ৫০০ মিলিয়ন ডলার, এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) থেকে ২৫০ মিলিয়ন ডলার এবং ওপেক ফান্ড ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট (ওএফআইডি) থেকে ১০০ মিলিয়ন ডলার ঋণ। এসব ঋণের সুদের হার ৩ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে।
এডিবির ‘স্ট্রেংদেনিং ইকোনমিক ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড গভর্ন্যান্স’ কর্মসূচির আওতায় নেওয়া ঋণের সুদের হার প্রায় ৪ দশমিক ১৩ শতাংশ। অন্যদিকে এআইআইবির ঋণের সুদের হার প্রায় ৫ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ, যা তুলনামূলকভাবে ব্যয়বহুল।
এ ছাড়া ঢাকা-সিলেট করিডর উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য এডিবির আরও ৩০০ মিলিয়ন ডলার ঋণ অনুমোদন করা হয়েছে। প্রায় ১৬ হাজার ৯১৮ কোটি টাকার এই প্রকল্পে মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ ও সার্ভিস লেন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ রেকর্ড ৩ দশমিক ৪১ বিলিয়ন ডলার বাজেট সহায়তা নিয়েছে। বর্তমানে দেশের মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৪ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ৮ শতাংশ বেশি। গত পাঁচ বছরে বৈদেশিক ঋণ বেড়েছে প্রায় ৪৬ শতাংশ।
ইআরডির হিসাব বলছে, ২০২৫-২৬ থেকে ২০২৯-৩০ অর্থবছরের মধ্যে বাংলাদেশকে প্রায় ২৫ দশমিক ৯৯ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করতে হবে। এর মধ্যে ১৮ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার আসল এবং ৭ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার সুদ।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, বাণিজ্যিক সুদে নেওয়া এসব ঋণ ব্যয়বহুল। প্রকল্প থেকে কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক সুফল না এলে ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. মাসরুর রিয়াজ বলেন, রিজার্ভ ও ব্যালান্স অব পেমেন্ট স্থিতিশীল রাখতে সরকার বাজেট সহায়তা নিচ্ছে। তবে আগামী বছরগুলোতে ঋণ পরিশোধের চাপ আরও বাড়বে। তাই এখন থেকেই ঋণ ব্যবস্থাপনায় সতর্ক হতে হবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় রপ্তানি আয় ও প্রবাসী আয় বাড়ানো, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন এবং রাজস্ব আহরণ জোরদার করা জরুরি। অন্যথায় উচ্চ সুদে নেওয়া বৈদেশিক ঋণ ভবিষ্যতে অর্থনীতির জন্য বড় চাপ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
রিপোর্টার্স২৪/বাবি