আশিস গুপ্ত, নতুন দিল্লি : ভারতের রাজধানী দিল্লি ফের একবার চরম বায়ু দূষণের কবলে। শহরের গড় এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (AQI) 'খুব খারাপ' (Very Poor - ৩০১-৪০০) বিভাগের উচ্চ স্তরে পৌঁছেছে, যা চলতি বছরের সবচেয়ে দূষিত দিনগুলির মধ্যে অন্যতম। কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ বোর্ড -এর তথ্য অনুযায়ী, এদিন দিল্লির সার্বিক AQI ছিল ৩৫২। তবে, কিছু কিছু এলাকা, যেমন বিবেক বিহার (AQI ৪১৫) এবং আনন্দ বিহার (AQI ৪০৯)-এ দূষণ 'ভয়াবহ' (Severe) বা বিপজ্জনক স্তরে পৌঁছে গেছে। ঘন ধোঁয়াশা ও ধূলিকণার কারণে রাজধানীর দৃশ্যমানতা মারাত্মকভাবে কমে এসেছে।
বায়ু দূষণের মাত্রা বাড়ার ফলে দিল্লি-এনসিআর অঞ্চলে গত ১০ দিন ধরে শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে আসা রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।পিএসআরআই ইনস্টিটিউট অফ পালমোনারি, ক্রিটিক্যাল কেয়ার এবং স্লিপ মেডিসিনের চেয়ারম্যান, ড. গোপী চাঁদ খিলনানি এই পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি সতর্ক করেছেন যে এই মারাত্মক বায়ু দূষণ ভয়াবহ ভাইরাল বা ব্যাকটেরিয়াজনিত নিউমোনিয়া-র কারণ হতে পারে, যার ফলে মৃত্যুর হারও বেশি।
একটি সর্বভারতীয় ইংরেজি দৈনিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ড. খিলনানি পরামর্শ দিয়েছেন, যাদের দীর্ঘস্থায়ী রোগ আছে তাদের জন্য আমার পরামর্শ, যদি সম্ভব হয়, তবে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি বা শেষ পর্যন্ত দিল্লি ছেড়ে দূরে কোথাও চলে যান। নিজের পরিবারের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, আমার ছেলে-মেয়ে ও নাতি-নাতনিদের স্থানান্তরিত হওয়ার সুযোগ আছে, এবং আমি তাদের কখনো দিল্লি-এনসিআর-এ আসতে পরামর্শ দিইনা। তিনি মনে করিয়ে দেন, এয়ার পিউরিফায়ার কার্যকর হতে হলে, সেগুলিকে সর্বদা চালিয়ে রাখতে হবে এবং ঘর সব সময় বন্ধ রাখতে হবে।
দিল্লির এই বাৎসরিক দূষণ সংকটের প্রধান কারণগুলি হলো, অক্টোবর-নভেম্বর মাসে পাঞ্জাব, হরিয়ানা এবং উত্তর প্রদেশের কৃষকরা ধান কাটার পর জমিতে পড়ে থাকা নাড়া বা খড়ের অবশিষ্টাংশ পুড়িয়ে দেন। এই ধোঁয়া উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে বায়ুর স্রোতে ভেসে এসে দিল্লিতে জমা হয়, যা দূষণের একটি বড় উৎস।রাজধানী এবং এনসিআর-এ লক্ষ লক্ষ যানবাহন থেকে নির্গত ধোঁয়া দূষণের আরেকটি প্রধান কারণ। বড় নির্মাণ কাজ এবং রাস্তার কাজের কারণে বাতাসে ধূলিকণার পরিমাণ বেড়ে যায়।ঠান্ডা আবহাওয়ায় বাতাস ভারী হয়ে যায় এবং এই দূষিত কণাগুলোকে মাটির কাছাকাছি আটকে রাখে, ফলে ধোঁয়াশা সহজে অপসারিত হতে পারে না।
দূষণ কমাতে দিল্লি সরকার আইআইটি কানপুরের সহায়তায় 'ক্লাউড সিডিং' বা কৃত্রিম বৃষ্টিপাতের উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু মেঘে পর্যাপ্ত আর্দ্রতার অভাবে এই কোটি টাকা খরচের প্রচেষ্টাটি সফল হয়নি। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বৃষ্টির মতো শর্টকাট পদ্ধতির বদলে দূষণের মূল উৎস নিয়ন্ত্রণে আনাই আসল সমাধান।পরিস্থিতি 'খুব খারাপ' পর্যায়ে থাকায় দিল্লি-এনসিআর অঞ্চলে কঠোর বিধিনিষেধ বা কঠিন নিয়মাবলী কার্যকর করা হতে পারে।
এই বিধিনিষেধগুলির মধ্যে রয়েছে জরুরি নয় এমন নির্মাণ কাজ বন্ধ রাখা, ডিজেল জেনারেটর ব্যবহার সীমিত করা এবং নির্দিষ্ট কিছু যানবাহনের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা। ভবিষ্যতে দিল্লি ও এনসিআর অঞ্চলে ধাপে ধাপে পেট্রল ও ডিজেলচালিত গাড়ির ব্যবহার নিষিদ্ধ করে ইলেকট্রিক এবং সিএনজি (CNG) চালিত যানবাহনের ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনাও সরকারের বিবেচনাধীন রয়েছে।
চিকিৎসকরা সাধারণ মানুষকে যতটা সম্ভব বাইরের কার্যকলাপ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিচ্ছেন। বিশেষ করে সকালের দিকে দূষণ যখন সর্বোচ্চ থাকে, তখন বাইরে বের হওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। অপরিহার্য কারণে বাইরে বের হলে N95 বা অনুরূপ মানের মাস্ক ব্যবহার করা এবং শরীরে পানির অভাব যাতে না হয়, সেদিকে মনোযোগ দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
রিপোর্টার্স২৪/ঝুম