| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

চট্টগ্রামে অপরাধজগৎ নিয়ন্ত্রণ নিতেই চলছে গ্যাংওয়ার এবং হত্যাকাণ্ড !

reporter
  • আপডেট টাইম: নভেম্বর ০৮, ২০২৫ ইং | ০০:২৯:২০:পূর্বাহ্ন  |  ২০০১১৫৫ বার পঠিত
চট্টগ্রামে অপরাধজগৎ নিয়ন্ত্রণ নিতেই চলছে গ্যাংওয়ার এবং হত্যাকাণ্ড !

রাজু চৌধুরী,চট্টগ্রাম : দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর চট্টগ্রামে আধিপত্য বিস্তার ও পুরোনো শত্রুতার জেরে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের দ্বন্দ্ব আবারও চরমে পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা রক্তক্ষয়ী সংঘাতে রূপ নিয়েছে। এমনকি নির্বাচনী প্রচারণার মতো প্রকাশ্য জনসমাগমেও অস্ত্রধারীরা গুলি চালাচ্ছে নির্দ্বিধায়। 

চট্টগ্রামে অপরাধ জগতের নিয়ন্ত্রণ এবং অবৈধ ব্যবসা একতরফা কর্তৃত্ব নিতেই ঘটছে একের পর হত্যাকাণ্ড। এই সব অপরাধ কর্মকাণ্ড ও হত্যাকা বিদেশে পালিয়ে থাকা সন্ত্রাসী শিবিরের ক্যাডার এইট মার্ডার মামলার পলাতক আসামি সাজ্জাদ আলী ও তাঁর অনুসারীদের নাম উঠে আসছে বার বার। 

পলাতক বড় সাজ্জাদ আলীর অনুসারী আরেক সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদ প্রকাশ বুড়ির নাতি। গত ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর অপরাধজগতের নিয়ন্ত্রণ নিতে মরিয়া হয়ে উঠে ছোট সাজ্জাদ। 

কিছুদিন আগে বাকলিয়া এক্সেস রোডে জোড়া খুনের ঘটনায় বুড়ির নাতি সাজ্জাদ পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যাওয়ায় এখন বড় সাজ্জাদের দলের হাল ধরেছেন আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী রায়হান। 

এইদিকে এক দশক আগে একই সন্ত্রাসী গ্রুপ থেকে বেরিয়ে যাওয়া সরওয়ার হোসেন বাবলা ও আকবর আলী প্রকাশ ঢাকাইয়া আকবর এই দুইজনের হত্যার ঘটনায় রায়হানের সম্পৃক্ততা আছে বলে পুলিশ ও নিহতদের পরিবারের লোক-স্বজনেরা দাবি করেছেন। 

গত বুধবার (৫ নভেম্বর) সন্ধ্যায় নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানার চালিতাতলী এলাকায় বিএনপি প্রার্থীর গণসংযোগকালে সন্ত্রাসীদের অতর্কিত ব্রাশফায়ারে নিহত হয়েছেন একসময়ের শিবির ক্যাডার ও সম্প্রতি বিএনপির সঙ্গে যুক্ত হওয়া আলোচিত শীর্ষ সন্ত্রাসী সরোয়ার হোসেন বাবলা (৪৫)। এই হামলায় চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী-চান্দগাঁও) আসনের বিএনপি প্রার্থী এরশাদ উল্লাহসহ আরও দুজন আহত হয়েছেন।

বুধবার (৫ নভেম্বর) সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক ও চট্টগ্রাম-৮ আসনের প্রার্থী এরশাদ উল্লাহ হাজীপাড়া এলাকায় দলীয় নেতা-কর্মীদের নিয়ে নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছিলেন। এই সময় তার সঙ্গে সরোয়ার হোসেন বাবলাও উপস্থিত ছিলেন। এরশাদ উল্লাহ দোকানপাটে লিফলেট বিলি করার সময় হঠাৎ একদল অস্ত্রধারী তাদের ওপর গুলি চালায়। অজ্ঞাতনামা অস্ত্রধারীদের ব্রাশফায়ারে প্রথমে সরোয়ার হোসেন বাবলার মাথায় গুলি লাগে। এ সময় পেটে ছররা গুলি লেগে এরশাদ উল্লাহ ও শান্ত নামের আরেক ব্যক্তি আহত হন।


রক্তাক্ত অবস্থায় তিনজনকে দ্রুত নগরের অক্সিজেন এলাকার বেসরকারি এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে রাত পৌনে ৯টার দিকে চিকিৎসক বাবলাকে মৃত ঘোষণা করেন। তবে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, পেটে ছররা গুলি লাগা এরশাদ উল্লাহ আশঙ্কামুক্ত।

সরোয়ার হোসেন বাবলাকে হত্যার জন্য তার সহযোগীরা চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী ছোট সাজ্জাদ ওরফে ‘বুড়ির নাতি’র অনুগত সন্ত্রাসীদের দায়ী করছেন। তাদের দাবি, ব্রাশফায়ারে মূল হামলা বাবলাকে লক্ষ্য করেই হয়েছিল। 

জানা যায়, চট্টগ্রামে ছোট সাজ্জাদের সঙ্গে সরোয়ার হোসেন বাবলার পুরোনো দ্বন্দ্ব চলছিল। চলতি বছরের ১৫ মার্চ সাজ্জাদ ঢাকার একটি শপিং মল থেকে গ্রেপ্তার হন। সাজ্জাদের অনুসারীদের ধারণা ছোট সাজ্জাদকে পুলিশে ধরিয়ে দেওয়ার পেছনে সরোয়ারের হাত ছিল। তাছাড়া চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ-অক্সিজেন এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি ও বালুমহাল নিয়ন্ত্রণের পুরোনো বিরোধ রয়েছে।

গত কয়েক মাসে একাধিক সাক্ষাৎকারে সরোয়ার হোসেন বাবলা নিজেও দাবি করেছিলেন, ছোট সাজ্জাদ ও তার দলের ছেলেরা সরোয়ারকে খুন করার চেষ্টা করছে।  

সেই সময় সরোয়ার ফেসবুকে ছোট সাজ্জাদের স্ত্রী তামান্নার হুমকির কথা উল্লেখ করে বলেছিলেন, ‘চন্দনপুরায় আমাকে মারতে গিয়ে জোড়া খুন করেছে ওরা।

উল্লেখ্য যে, চলতি বছরের ২৯ মার্চ গভীর রাতে নগরের চন্দনপুরা এলাকায় সরোয়ার ও তার অনুসারীদের প্রাইভেটকার লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি চালায় ছোট সাজ্জাদের অনুসারীরা। ওই হামলার মূল লক্ষ্য ছিলেন সরোয়ার হোসেন বাবলা। কিন্তু তিনি সে দফায় প্রাণে রক্ষা পেলেও ব্রাশফায়ারে নিহত হন সরোয়ারের দুই অনুসারী কক্সবাজারের মোহাম্মদ আবদুল্লাহ এবং রাঙ্গুনিয়ার বখতেয়ার উদ্দিন মানিক। এর দুই মাসের মাথায় নগরের পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এলাকায় খুন হন সরোয়ার হোসেন বাবলার সহযোগী আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী আলী আকবর ওরফে ঢাকাইয়া আকবর (৪৪)। আকবর সাজ্জাদের প্রতিপক্ষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং ওই ঘটনার জন্যও ছোট সাজ্জাদের অনুসারীদের দায়ী করা হয়।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, পাঁচটি খুনসহ অন্তত ১৫ টি মামলার আসামি ছিলেন সরোয়ার হোসেন বাবলা। চট্টগ্রামের আলোচিত এই সন্ত্রাসীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, অস্ত্র, হত্যাসহ বিভিন্ন অভিযোগে মামলা।

একসময় সরোয়ার বাবলা শিবির ক্যাডার হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং বিদেশে পলাতক বড় সাজ্জাদের অন্যতম সহযোগী ছিলেন। পরে তাদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হলে সরোয়ার নিজেই একটি সন্ত্রাসী দল গড়ে তোলেন। ২০১১ সালে গ্রেপ্তারের পর দীর্ঘদিন কারাগারে ছিলেন। ২০১৭ সালে জামিন পেয়ে কাতারে পালিয়ে যান। সেখান থেকে ফিরলে ২০২০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকার বিমানবন্দর থেকে আবার গ্রেপ্তার হন।

প্রায় চার বছর পর কারাগার থেকে জামিনে বের হওয়ার পর বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চলাকালে ২০২৪ সালের ২৭ জুলাই সরোয়ার হোসেন বাবলা আবার গ্রেপ্তার হন। কিন্তু গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পান সরোয়ার বাবলা।

সাম্প্রতিক সময়ের সংঘাত ও দ্বন্দ্বের নেপথ্যে ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ। বিদেশে বসে চট্টগ্রাম নগরের অপরাধজগৎ নিয়ন্ত্রণ করতেন সাজ্জাদ আলী খান। তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন নুরুন্নবী ম্যাক্সন, সারোয়ার হোসেন বাবলা ও ঢাকাইয়া আকবর। ২০১৭ সালে জামিনে বেরিয়ে বিদেশে চলে যান ম্যাক্সন। ২০২২ সালে ভারতে মারা যান ম্যাক্সন। ২০২০ সালে কাতার থেকে ফেরার পথে গ্রেপ্তার হন সরোয়ার বাবলা। জামিনে বেরিয়ে বড় সাজ্জাদ বাহিনী ছাড়েন। একাধিকবার গ্রেপ্তারের পর দলছুট হন ঢাকাইয়া আকবরও। এইদিকে ছোট সাজ্জাদকে ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে গড়ে তোলেন বিদেশে পলাতক বড় সাজ্জাদ। ২০১৫ সাল থেকে বড় সাজ্জাদের অপরাধের সাম্রাজ্য দেখভাল করতেন ছোট সাজ্জাদ। বিদেশ থেকে ফোন দিয়ে চাঁদা দাবি করতেন বড় সাজ্জাদ।

নগরের পাঁচলাইশ, চান্দগাঁও, খুলশী ও হাটহাজারীর এলাকায় এখন শহর সম্প্রসারণ হচ্ছে। উঠছে নতুন নতুন দালান। আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ দিকে জামিনে বেরিয়ে স্থানীয় নেতাকর্মীর সঙ্গে মিলে এসব এলাকায় নির্মাণাধীন ভবনে ইট-বালু সরবরাহ ও খালি প্লট ভরানোর কাজ করতেন বাবলা। গত বছর ৫ আগস্টের পর এসবের পুরো নিয়ন্ত্রণ নেন সরোয়ার বাবলা। এই ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বাবলার সাথে বড় সাজ্জাদ ও ছোট সাজ্জাদের সঙ্গে দীর্ঘদিন দ্বন্দ্ব চলছিল।

বিভিন্ন তথ্যে জানা গেছে, কারাগারে থাকাকালে বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরীর সঙ্গে বাবলার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। মুক্তির পর আসলাম চৌধুরী ছাড়াও চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহ ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক আবু সুফিয়ানের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। বাবলাকে অনেক বিএনপি নেতাদের সঙ্গে বিভিন্ন সভা-সমাবেশেও দেখা গেছে।

এইদিকে বাবলার বাবা আবদুল কাদের বলেন, আমার ছেলে ওয়াজেদিয়া এলাকায় অন্তত দুইশ প্লট ভরাট করেছে। ইট-বালুও সরবরাহ করত। এগুলো কেড়ে নিতে চাচ্ছিল ছোট সাজ্জাদ। এই ব্যবসা কেড়ে নিতে না পেরে তাকে হত্যা করা হয়েছে।    

গত বছর ২৯ আগস্ট রাতে কুয়াইশ-অক্সিজেন সড়কে মো. আনিস (৩৮) ও মাসুদ কায়ছারকে (৩২) গুলি করে হত্যা করা হয়। দুজনই যুবলীগের কর্মী ছিলেন। তারা বাবলার সঙ্গে ব্যবসা করতেন। একই বছরের ২১ অক্টোবর চান্দগাঁও থানার অদুরপাড়া এলাকায় গুলি করে আফতাব উদ্দিন তাহসীন (২৬) নামে এক যুবককে হত্যা করা হয়। তিনিও বাবলার সঙ্গে এলাকায় ইট-বালুর ব্যবসা করতেন।

গত ২৯ মার্চ রাতে নগরের বাকলিয়া এক্সেস রোডে বাবলাকে টার্গেট করে হত্যার চেষ্টা করা হয়। এতে বাবলার দুই সহযোগী বখতেয়ার হোসেন মানিক ও আব্দুল্লাহ আল রিফাত খুন হন। গত ২৩ মে রাতে নগরের পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে প্রকাশ্য গুলি করে হত্যা করা হয় ঢাকাইয়া আকবরকে। গত ২৫ অক্টোবর রাউজানে যুবদল কর্মী মো. আলমগীর আলমকে গুলি করে হত্যা ও এর আগে ১১ এপ্রিল রাউজানে যুবদল কর্মী ইব্রাহিম হত্যায়ও জড়িত রায়হান-ইমন জুটি। এসব হত্যা মামলার প্রায় সবকটির আসামি রায়হান, ইমন, বোরহান ও খোরশেদ।

এরশাদ উল্লাহর জনসংযোগে বাবলা হত্যার ঘটনায় মামলা দায়ের হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। 

নগরীর বায়েজিদ থানার চালিতাতলী এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে সরোয়ার হোসেন বাবলাকে হত্যা, প্রতিবন্ধী অটোরিকশা চালক মো. ইদ্রিসকে গুলি এবং রাউজানে প্রকাশ্যে গুলি ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনায় মূলহোতা ইশতিয়াক চৌধুরী অভিসহ ৬ জনকে গ্রেপ্তার করেছে র‍্যাব।

বৃহস্পতিবার (৬ নভেম্বর) থেকে  শুক্রবার সকাল পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।শুক্রবার সকালে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন র‍্যাব-৭ এর সহকারী পরিচালক ( মিডিয়া) এ.আর. এম মোজাফ্ফর হোসেন।

রিপোর্টারর্স২৪/এসসি

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪