বগুড়া প্রতিনিধি : বগুড়ায় অধিক মুনাফার লোভ দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে মল্লিকা সঞ্চয় সমিতি নামের একটি প্রতিষ্ঠান। এদের খপ্পরে পড়ে প্রায় কয়েকশ পরিবার সর্বস্বান্ত হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক হেলাল উদ্দিন, তার স্ত্রী আনোয়ারা, কন্যা মরিয়ম এবং পুত্র আল আমিন সবাই এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত।
তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় থাকলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে তেমন কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। একটি মামলায় হেলাল জেলে থাকলেও বাকি অভিযুক্তরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
২০১০ সালে তারা ব্যবসা শুরু করে। অধিক মুনাফার লোভ দেখিয়ে গ্রামের সরল লোকদের থেকে টাকা হাতিয়ে নেয়। সমিতিতে ১ লাখ টাকা রাখলে মাসে ১ হাজার ৮শত টাকা লাভ দেওয়ার প্রলোভন দেওয়া হতো। কয়েক বছর এভাবে টাকা প্রদানের কারণে প্রায় ১ হাজার গ্রাহক তার সমিতিতে টাকা রাখেন।
এরপর ২০১৮ সালে মল্লিকা সমাজ উন্নয়ন সংস্থা নামে আরেকটি সংগঠনের অনুমোদন নেয় সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে। দুই সংস্থার মাধ্যমে মাঠ থেকে দেদারভাবে টাকা তোলা শুরু করেন হেলাল। দুই সংস্থার মাধ্যমে জোগাড় করা সঞ্চয়ের পরিমাণ ৩০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। ঠিক তখন থেকেই গ্রাহকদের সাথে চুক্তিবদ্ধভাবে টাকা প্রদানে গরমি দেখা দিতে শুরু করে।
গ্রাহকদের লাভের টাকা প্রদান এক পর্যায়ে বন্ধ করে দেন। আস্তে আস্তে হেলালের প্রতারণার চিত্র প্রকাশ পেতে থাকলে গ্রাহকরা তাকে টাকা প্রদানের জন্য চাপ দেন। কিন্তু হেলাল তৎকালীন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে গ্রাহকদের দমিয়ে রাখতেন। অনেকেই ভয়ে টাকা চাইতেও পারতেন না।
৫ আগস্টের পর গ্রাহকরা আবারও তার কাছে টাকার চাপ দিতে শুরু করেন। কেউ কেউ তার নামে মামলা করেছেন। সেই মামলায় হেলাল কয়েক মাস ধরে জেলে আছেন। উল্লেখ্য, তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের নামেও বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ রয়েছে। থানার পুলিশ এসব অভিযোগের তেমন কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না, ফলে গ্রাহকরা হতাশায় ভুগছেন।
সরজমিনে নামুজা এলাকায় গিয়ে দেখা যায় সমিতির অফিস বন্ধ। পাশের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় বাড়ির প্রবেশ দ্বারে তালা ঝুলছে।
এলাকাবাসী জানান, মাঝেমধ্যে হেলালের স্ত্রী আনোয়ারা বাড়িতে আসলেও বেশিক্ষণ থাকেন না এবং কোথায় থাকেন কেউ জানে না।
স্থানীয় অবসরপ্রাপ্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিলুফা খাতুন তার জীবনের সমস্ত আয় ২৮ লাখ ৬০ হাজার টাকা হেলালের সমিতিতে রাখেন। দীর্ঘদিন ধরে টাকা তোলার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু হেলাল বারবার “দেবো দেবো” বলে কোনো টাকা দেননি।
তিনি আরও বলেন, “আমাদের পরিবারের কয়েকজন সদস্য মিলে তার সমিতিতে প্রায় দেড় কোটি টাকা রেখেছি, কেউ সেখান থেকে একটাও টাকা তুলতে পারিনি।” একই পরিবারের আরেক সদস্য, গৃহিনী মোছাঃ মঞ্জুয়ারা বেগম বলেন, তিনি মল্লিকাতে ৩ লাখ ৮৭ হাজার টাকা রেখেছেন, কিন্তু সেই টাকার কোনো সন্ধান মেলেনি।
সামান্তা মারিয়াম সিঁথি মল্লিকাতে ৭ লাখ ৬১ হাজার টাকা রেখেছিলেন। অনেক দিন পরেও টাকার কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, “হেলাল আমাদের সাথে প্রতারণা করেছে, আমরা এখন পথে বসার উপক্রম।”
রিনা খাতুন এবং তার স্বামী মিজানুর রহমান জানান, “আমাদের ১০ লাখ টাকা মল্লিকাতে ছিল। হেলাল এবং তার পরিবারের লোকজন সেই টাকা আত্মসাৎ করেছে। তারা সেই অর্থ দিয়ে নিজের নামে সম্পত্তি ক্রয় করেছে। হেলাল নামুজা, শিবগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় ২৫ বিঘার বেশি জমি কিনেছেন। উপশহরে একটি বহুতল বাড়িও আছে।”
ওই দম্পতি আরও অভিযোগ করেন, “হেলালের মেয়ে মরিয়ম, তার জামাই এবং অন্যান্য পরিবার সদস্যদের নামে বিভিন্ন সম্পত্তি লিখে দেওয়া হয়েছে।”
দুদু মিয়া, পেশায় গাড়ী চালক, জানান, তিনি মল্লিকাতে তার মেয়ে মারিয়ার নামে ৪ লাখ টাকা রেখেছিলেন। মেয়ের বিয়ের সময় সেই টাকা কাজে লাগানোর পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু হেলাল টাকা দেয়নি।
রাজমিন্ত্রী আরিফুল ইসলাম বলেন, “আমি ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা রেখেছিলাম। সেই টাকার কোনো হদিস নেই। দীর্ঘদিন ঘুরেও টাকা তুলতে পারিনি। কোথায় বিচার পাব, কার কাছে যাব, কুল কিনারা পাচ্ছি না।”
হেলালের গ্রামের বাড়িতে গেলে দেখা যায় মূল প্রবেশ দ্বারে তালা লাগানো। আশেপাশের লোকজন জানান, হেলাল এবং তার স্ত্রী আনোয়ারা মাঝে মাঝে বাড়িতে আসলেও অধিকাংশ সময় বাড়ি খালি থাকে। হেলালের পরিবারের মুঠোফোন নম্বরে ফোন দিলে অনেকেই বন্ধ পাওয়া যায়। তবে তার মেয়ে জামাই জিহাদ ফোন রিসিভ করেন। তিনি বলেন, “স্ত্রীর নামে কোনো সম্পত্তি শ্বশুরের নামে নেই। সব সম্পত্তি আমার শ্বশুরের নামেই আছে। আমি এসব ঘটনার অনেক পরে বিয়ে করেছি, এসব বিষয় সম্পর্কে তেমন কিছু জানি না।”
বগুড়া জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে সহকারি পরিচালক আতাউর রহমান বলেন, “মল্লিকা নামের সংস্থাটি আইন ভঙ্গ করেছে। তাদের লাইসেন্স বাতিলের জন্য আমরা উদ্যোগ নেব। সাধারণ মানুষকে লোভ দেখিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া আইন বিরুদ্ধ। অপরাধীদের শাস্তির জন্য যা করা সম্ভব সব করা হবে।”
বগুড়া জেলা পুলিশ সুপার জিদান আল মুসা বলেন, “আমাদের কাছেও অভিযোগ আছে। বিষয়টি নিয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
বগুড়া জেলা প্রশাসক হোসনা আফরোজ মানবজমিনকে বলেন, “মল্লিকা নামের সংস্থার প্রতারণার অভিযোগ আমরা পেয়েছি। দ্রুত বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য তদন্ত টিম গঠন করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
রিপোর্টার্স২৪/এসএন