আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে সন্ত্রাসী হামলা কেন্দ্র করে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধাবস্থা তৈরি হয়েছে। সম্ভাব্য পরিস্থিতি ও পরিণতি নিয়ে ডয়চে ভেলের সঙ্গে কথা কথা বলেছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ। রিপোর্টার্স২৪ এর পাঠকদের জন্য সেই সাক্ষাৎকারটি হুবুহু তুলে ধরা হলো।
ডয়চে ভেলে: কাশ্মীরে পর্যটকদের ওপর সন্ত্রাসী হামলার পর তো নিয়ন্ত্রণ রেখায় প্রতিদিনই ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে গোলাগুলি হচ্ছে। এই সংঘাতের যৌক্তিকতা কতটুকু? আর এটা কি আরও বড় ধরনের সংঘাতের দিকে যাচ্ছে?
ড. ইমতিয়াজ আহমেদ: ভারত হয়ত ধরে নিয়েছিল স্পেশাল স্ট্যাটাস (কাশ্মীরের) রিমুভ করার পর একধরনের উন্নয়ন হবে। সেখানে পর্যটকদের আকর্ষণ করা এবং আরও উন্নয়ন হবে বলে ভারত ধরে নিয়েছিল। ভারত মনে করেছিল বড় কোনো ধরনের ঘটনা ঘটবে না। এরকমই একটি অবস্থারই কিন্তু সুযোগ টেররিস্টরা নেয়। শুধু এই হামলাই যে হয়েছে তা নয়। আমরা যদি গত ১০ বছরের হিসাব দেখি, তাদেরই হিসেবে দেখি দুই হাজার ৫০০ টেররিস্ট অ্যাটাক হয়েছে। অ্যাটাকে মোট দুই হাজার মারা গেছে। কার্গিল যুদ্ধ তো আমরা আগেই জানি। ২০০৮-এর মুম্বাইর পরেও কিন্তু ২০১৯-এ পলওয়ানা অ্যাটাক হলো। ৪০ জন ভারতীয় সেনা মারা গিয়েছিলেন। মূল সমস্যা যদি থেকেই যায়, তাহলে কিন্তু এটা ঠিক ঢেকে রাখা যায় না। ওই সুযোগ টেররিস্টরা নেবেই।
ডয়চে ভেলে: মূল সমস্যাটা কী?
ড. ইমতিয়াজ আহমেদ: মূল সমস্যা হলো একটা সময়ে তো স্পেশাল স্ট্যাটাস ছিল। সেটা রিমুভ করা হলো। সেটা যদি পুরো কাশ্মীরে একটি গণভোট করে করা হতো, তাহলেও বুঝতাম। ফলে মূল সমস্যার সমাধান হয়েছে বলে মনে হচ্ছে না। অনেকেই মনে করেছিলেন বড় কিছু হবে না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বড় হামলা তো হলো। ওখানে ভারতীয় সৈন্যের সংখ্যাও অনেক সেটা মনে রাখতে হবে। তারপরও সেখানে এত বড় আকারের ইন্টেলিজেন্স ফেইলিওর হলো। সেটা কীভাবে হলো দেখা দরকার।
ডয়চে ভেলে: এখন তো নিয়ন্ত্রণ রেখায় প্রতিদিনই গোলাগুলি হচ্ছে। হুমকি-পাল্টা হুমকি। প্রস্তুতি পাল্টা প্রস্তুতির খবর পাওয়া যাচ্ছে। ওই উত্তেজনা কি শেষ পর্যন্ত যুদ্ধে গড়াতে পারে?
ড. ইমতিয়াজ আহমেদ: বড় ধরনের যুদ্ধ হওয়ার জন্য যে মানসিক প্রস্তুতি এবং জনগণের যে প্রস্তুতি থাকা দরকার সেটা দুই দেশেরই নেই। পাকিস্তানের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো নেই। তার নিজের দেশেও কম-বেশি সন্ত্রাসী হামলা হয়ে থাকে, বিশেষ করে বেলুচিস্তানে। ভারতীয় জনগণের মধ্যেও যুদ্ধ করার যে মানসিক প্রস্তুতি দরকার, সেটা তাদের আছে বলে মনে করি না। তবে যেহেতু মিডিয়ায় বিশাল হাইপ হচ্ছে। রাজনীতিবিদদের মধ্যেও বিশাল হাইপ হচ্ছে। সরকারকেও কিছু একটা দেখাতে হবে। নাহলে সরকার কীভাবে ফেস করবে, তা থেকে গেল। ফলে সার্জিক্যাল অ্যাটাক একটা-দুইটা হতেও পারে। এখন যা হচ্ছে, তার চেয়ে আরও কিছুটা বেড়ে যেতে পারে। তবে দুই দেশে বড় আকারের যে যুদ্ধ হয়, সেটা হওয়ার আপাতত কোনো লক্ষণ আমি দেখছি না।
ডয়চে ভেলে: দুই দেশই ব্যবস্থা -পাল্টা ব্যবস্থা নিচ্ছে। এটা কি দুই দেশের মধ্যে ইতিবাচক পরিস্থিতি তৈরিতে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে?
ড. ইমতিয়াজ আহমেদ: এটাও নতুন না। যখনই হামলা হয়েছে কী কাশ্মীরে, কী বেলুচিস্তানে- তখনই আমরা দেখেছি খুব তাড়াতাড়ি কোনো এভিডেন্স বা বড় আকারের গবেষণা ছাড়া অন্যকে দায়ী করা৷ এবারও তাই হয়েছে। ভারত বলছে, পাকিস্তান জড়িত, পাকিস্তান বলছে, না আমরা জড়িত নই। ব্লেম গেমের মধ্যে চলে যাচ্ছে। তবে যারা হামলা করেছে, তারা কিন্তু কম-বেশি পার পেয়ে যায়। সেই জায়গাটাও দেখা দরকার। সেটা ধরে যে কনফ্লিক্ট, সেটা আর কিছুদিন পর শত বছরের কনফ্লিক্টে পরিণত হবে। আমার মনে হয়, এর সমাধান দুই দেশের জনগণকেই করতে হবে। অন্য কোনো উপায়ে সম্ভব নয়৷ কিন্তু ভারত বা পাকিস্তানে যারা ক্ষমতায় থাকেন, তারা বিষয়টাকে এমনভাবে রাজনীতিকরণ করেন যে, তাতে সমস্যার তো সমাধানও হয় না, দুই দেশের যে সম্পর্ক তাতেও কোনো পরিবর্তন হয় না৷
ডয়চে ভেলে: যুদ্ধ বাধলে ভূ-রাজনীতি এবং দক্ষিণ এশিয়ায় এর কী প্রভাব পড়তে পারে?
ড. ইমতিয়াজ আহমেদ: যদি দুই দেশের মধ্যে বড় যুদ্ধ বেধে যায় দুই দেশের সব ফোর্স যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে আমি তো মনে করি, বড় প্রভাব পড়বে। সাপ্লাই চেইনের বিষয় আছে, নানা ধরনের সম্পর্কের বিষয় আছে। এমনকি বাংলাদেশ থেকে এয়ার রুটস, সি রুটস সবগুলোই বিঘ্নিত হবে। সেখানে বড় সমস্যা তৈরি হবে। তবে এর প্রভাব যে শুধু দক্ষিণ এশিয়ায় হবে, তা নয়। এইরকম বড় দুইটি দেশ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে দক্ষিণ এশিয়ার বাইরেও বড় একটা প্রভাব পড়বে। এই কারণেই আমরা দেখছি, বেশ কিছু দেশ এগিয়ে এসেছে পরিস্থিতি সামাল দিতে। একটা-দুইটা দেশ আবার মধ্যস্থতা করতে রাজি আছে। নোগোসিয়েশনে তারা পার্টনার হতে চাচ্ছে। আমি ইরানের কথা শুনেছি। সৌদি আরবের কথা শুনেছি। ওদিকে যুক্তরাষ্ট্র, চীন তারাও দুই দেশকেই ঠান্ডা হতে বলছে। ফলে বড় যুদ্ধ না হওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একটা প্রেসার থাকবে। তবে ছোটখাটো যে একেবারেই কিছু হবে না তা এখই বলা মুশকিল।
ডয়চে ভেলে: এখানে তাহলে কি ভূ-রাজনীতির কোনো উসকানি নাই, না অন্য ধরনের খেলা থাকতে পারে?
ড. ইমতিয়াজ আহমেদ: অন্য অ্যাক্টররা জড়িত কি-না সেটা এভিডেন্স ছাড়া বলা মুশকিল। কোনো ধরনের এভিডেন্স ভারত বা পাকিস্তান কেউ সামনে নিয়ে আসতে পারেনি। তবে মনে রাখতে হবে, যুদ্ধ হলে যে সবার ক্ষতি হয়, তা নয়। যদি যুদ্ধ পরিস্থিতিও তৈরি হয়, তাহলেও কিন্তু কেউ কেউ লাভ করে। কারণ, অস্ত্র বিক্রি করার একটা বিষয় চলে আসে৷ আমরা দেখলাম ভারত ফ্রান্সের সঙ্গে একটা চুক্তি করেছে। এয়ারফোর্সের সঙ্গে একটা চুক্তি করেছে। তাই সবার যে ক্ষতি হয়, তা নয়। তবে জনগণের একটা বড় ভূমিকা থাকে। কিন্তু বড় যে হাইপ তৈরি হয়েছে গণমাধ্যমে এবং স্যোসাল মিডিয়ায়, সেটা দুই দেশের জনগণ কীভাবে নেবে দেখার বিষয়।
ডয়চে ভেলে: হাইপ তো উঠে গেছে। সেটা শুধু দুই দেশের সংবাদমাধ্যম কেন, সারা দুনিয়ার সংবাদমাধ্যমেই চলছে। দুই দেশের সামরিক শক্তির হিসেব প্রকাশ করা হচ্ছে সংবাদমাধ্যমে। যুদ্ধে কে হারতে পারে, কে জিততে পারে- তার হিসেবও হচ্ছে। এটাকে কতটা হিসাবের মধ্যে আনা যাবে?
ড. ইমতিয়াজ আহমেদ: এটা নতুন না। প্রতিবারই, যতবার হয়েছে এই হিসেব হয়েছে। কার্গিল যুদ্ধে তো সামরিক শক্তির বড় ধরনের মবিলাইজেশন হয়েছিল। দুই পাশেই অনেকের হিসেবে এক মিলিয়ন ফোর্স দাঁড়িয়েছিল। এবার তবে এখনো বড় ধরনের ফোর্স মবিলাইজেশন দেখা যাচ্ছে না এখানে। সেই জন্যই বলছি, আপাতত বড় ধরনের যুদ্ধের আশঙ্কা করছি না।
ডয়চে ভেলে: পানি চুক্তি স্থগিত হয়েছে, আকাশ সীমা বন্ধ করা হয়েছে, ভিসা বাতিল করা হয়েছে। আবার গুজরাটে বাংলাদেশিদের গ্রেপ্তারের খবর পাওয়া যাচ্ছে। এখন আবার শোনা যাচ্ছে তাদের অধিকাংশই ভারতীয় মুসলমান। সব মিলিয়ে এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে?
ড. ইমতিয়াজ আহমেদ: বড় আকারেরই ক্ষতি হবে সাধারণ মানুষের। কারণ, দুইটি দেশই নিরাপত্তা রাষ্ট্র হিসেবে তাদের সিকিউরিটি আরও শক্তিশালী করবে। সেই নিরাপত্তা রাষ্ট্র যখন হয়, সাধারণ মানুষের কিন্তু তখন বিশাল একটা ভোগান্তি হয়। এটা থেকে কোনোভাবেই পার পাওয়া যাবে না। শেষ পর্যন্ত এটা দুই দেশের জনগণের ওপরই ছেড়ে দিতে হবে। বছরের পর বছর এই অবস্থা চলছে। আন্তর্জাকিভাবে এটার সমাধান হবে না। দুই দেশের মধ্যে এই যে যুদ্ধ পরিস্থিতি তা তো এক সময় শেষ হতে হবে।
ডয়চে ভেলে: বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেছেন তারা চাইলে বাংলাদেশও সমঝোতায় অংশ নিতে পারে৷ বাংলাদেশের কি সেই ভূমিকা নেওয়ার নেয়ার সুযোগ আছে? আর এই সংঘাতে বাংলাদেশের অবস্থান, ভূমিকা কী হবে?
ড. ইমতিয়াজ আহমেদ: না, বাংলাদেশ সেই পেশাদারিত্ব তৈরি করতে পারেনি। আমার দেখেছি, বাংলাদেশের সরকার হয় দিল্লিকেন্দ্রিক, অথবা পাকিস্তানকেন্দ্রিক। না দিল্লি বিশ্বাস রাখবে, না ইসলামাবাদ বিশ্বাস রাখবে। বাংলাদেশকেন্দ্রিক যে পররাষ্ট্র নীতি, সেটা কিন্তু আমরা করতে পারিনি এখনো। যে পেশাদারিত্বটা দরকার, একেবারে বাংলাদেশিদের নিয়ে, সেটা কিন্তু আমরা করতে পারিনি। সেই জায়গায় আমার মনে হয় না বাংলাদেশ কোনো ভূমিকা রাখতে পারবে। এখানে কাতার বড় নেগোশিয়েটর হয়ে দাঁড়িয়েছেঅ। সৌদি আরব ইউক্রেনের ব্যাপারে নতুন নেগোশিয়েটর হিসেবে দাঁড়াচ্ছে। সেটা দেখার বিষয়। আমরা তুরস্ককে দেখেছি ইউক্রেন রাশিয়ার মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দাঁড়িয়েছে। এই ধরনের দেশ একটা সুনামও অর্জন করেছে। বাংলাদেশ সেই পর্যায়ে যায়নি এখনো।
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব