সিনিয়র রিপোর্টার: গুম সংক্রান্ত চূড়ান্ত প্রতিবেদন তুলে ধরেছে গুম সংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারি। সোমবার (৫ জানুয়ারি) গুলশানে কমিশনের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদনের সার্বিক দিক তুলে ধরেন কমিশনের সভাপতি অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মাইনুল ইসলাম চৌধুরী।
তিনি জানান, কমিশন অব ইনকোয়ারি অ্যাক্ট, ১৯৫৬-এর ধারা ৩ অনুযায়ী ২০২৪ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর জারি করা প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে কমিশনটি গঠিত হয়। কমিশনের ম্যান্ডেট ছিল ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত সময়ে সংঘটিত বলপূর্বক গুমের ঘটনা অনুসন্ধান, গুম হওয়া ব্যক্তিদের সন্ধান ও শনাক্তকরণ এবং এসব ঘটনার পটভূমি নির্ধারণ করা।
লিখিত বক্তব্যে কমিশন সভাপতি বলেন, অনুসন্ধান কার্যক্রমের অংশ হিসেবে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার নথি ও তথ্য পর্যালোচনা, যাচাই-বাছাই এবং স্বীকৃত ও গোপন উভয় ধরনের আটক কেন্দ্র পরিদর্শন করা হয়েছে। এর মধ্যে ছিল ডিজিএফআই ও র্যাব পরিচালিত জেআইসি (আয়নাঘর), টিএফআইসি, র্যাব সদর দপ্তর ও ব্যাটালিয়ন, এনএসআই, ডিবি, সিটিটিসি, পুলিশ লাইন্সসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর স্থাপনা। গোপন বন্দিশালার সন্ধান পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সেগুলো পরিদর্শন করে আলামত অপরিবর্তিত রাখতে নির্দেশনা দেওয়া হয়।
কমিশন গঠনের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ডিজিএফআইয়ের জেআইসি ও র্যাব সদর দপ্তরের টিএফআইসি পরিদর্শন করে আলামত ধ্বংসের প্রক্রিয়া তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করা হয়। পরে ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ভুক্তভোগীদের উপস্থিতিতে প্রধান উপদেষ্টা ও উপদেষ্টা পরিষদের কয়েকজন সদস্য এসব গোপন বন্দিশালা পরিদর্শন করেন।
কমিশনে মোট ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগ জমা পড়ে। এর মধ্যে একাধিকবার দায়ের করা ২৩১টি অভিযোগ এবং যাচাই-বাছাই শেষে গুমের সংজ্ঞার বাইরে বিবেচনায় ১১৩টি অভিযোগ বাতিল করা হয়। ফলে ১ হাজার ৫৬৯টি অভিযোগ কমিশনের সক্রিয় বিবেচনায় ছিল। এসব অভিযোগের মধ্যে ২৫১ জন এখনো নিখোঁজ, আর ৩৬ জনের গুম–পরবর্তী লাশ উদ্ধার হয়েছে।
নিখোঁজদের অবস্থান নির্ধারণে কমিশন বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তা, সন্দেহভাজন ব্যক্তি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ও বেসামরিক সাক্ষীসহ মোট ২২২ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। পাশাপাশি ৭৬৫ জন ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের একাধিকবার সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ভারত থেকে বাংলাদেশে পুশইন হওয়া ব্যক্তিদের তথ্য সংগ্রহ করা হলেও তাতে গুমের শিকার কারও নাম পাওয়া যায়নি। তবে ২০২৪ সালের ২২ ডিসেম্বর ঢাকার ধামরাইয়ের বাসিন্দা মোহাম্মদ রহমত উল্লাহকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর সীমান্ত দিয়ে পুশইন করার একটি নির্দিষ্ট ঘটনা কমিশনের অনুসন্ধানে উঠে আসে।
কমিশনের অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রায় ২৫ শতাংশ গুমের ঘটনায় র্যাব এবং ২৩ শতাংশ ঘটনায় পুলিশ জড়িত। এছাড়া ডিবি, সিটিটিসি, ডিজিএফআই ও এনএসআইয়ের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেছে। বহু ক্ষেত্রে সাদা পোশাকধারী বা ‘প্রশাসনের লোক’ পরিচয়ে অপহরণ করা হয়েছে। অভিযোগের ধরন বিশ্লেষণে কমিশনের মতে, গুম ছিল প্রাতিষ্ঠানিক ও পদ্ধতিগত চর্চা, যা রাষ্ট্রীয় সমন্বিত কার্যক্রমের ইঙ্গিত দেয়।
নিখোঁজদের ভাগ্য নির্ধারণে সারা দেশে সম্ভাব্য ক্রাইম সিন, আয়নাঘর ও ডাম্পিং প্লেস পরিদর্শন করা হয়। মুন্সিগঞ্জে একটি বেওয়ারিশ লাশ দাফনের কবরস্থানের সন্ধান পাওয়া গেছে, যেখানে গুমের শিকার ব্যক্তিদের দাফন করা হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। বরিশাল ও বরগুনাতেও ডাম্পিং প্লেসের তথ্য পাওয়া গেছে এবং ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে মরদেহ শনাক্তকরণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
কমিশন বলপূর্বক গুম প্রতিরোধে র্যাব বিলুপ্তকরণ, অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব থেকে সশস্ত্র বাহিনী প্রত্যাহার, কঠোর আইনি জবাবদিহি, ভুক্তভোগী-কেন্দ্রিক ন্যায়বিচার ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিতসহ ব্যাপক আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের সুপারিশ করেছে। পাশাপাশি সত্য ও স্মৃতির প্রতীক হিসেবে ‘আয়নাঘর’গুলোকে জাদুঘরে রূপান্তরের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে কমিশনের অন্যান্য সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন।
রিপোর্টার্স২৪/এসসি